ভুল স্বীকার করে মাওলানা সা’দের ঢাকা ত্যাগ | daily-sun.com

ভুল স্বীকার করে মাওলানা সা’দের ঢাকা ত্যাগ

ডেইলি সান অনলাইন     ১৩ জানুয়ারী, ২০১৮ ১৩:৩৮ টাprinter

ভুল স্বীকার করে মাওলানা সা’দের ঢাকা ত্যাগ

 

তাবলিগ জামাতের একাংশের প্রতিবাদের মুখে অবশেষে বিশ্ব তাবলিগ জামাতের আমির ও দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের জিম্মাদার মাওলানা সা’দ কান্ধলভী ভুল স্বীকার করে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তিনি আজ শনিবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জেড এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে দিল্লির উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। বিমানবন্দর থানার ওসি নূরে আজম সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।  


তিনি জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাওলানা সা’দ জেড এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন।


আর রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল ইসলাম বলেন, মাওলানা মোহাম্মদ সাদকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়ে আমরা বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়েছি।


এর আগে গতকাল শুক্রবার (১২ জানুয়ারি) কাকরাইল মসজিদে মাওলানা সা’দ জুমার বয়ান দেন এবং নামাজ পড়ান। বয়ানে তিনি হযরত মুসা (আ.)-কে নিয়ে তার অতীতে দেওয়া বক্তব্যের জন্য ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চান।


উর্দুতে দেওয়া বয়ানে মাওলানা সা’দ বলেন, ‘ওলামায়ে-কেরাম যদি কোনো কারণে ভুল ধরেন, আমরা মনে করব- ওনারা আমাদের ওপর এহসান করেছেন। তারা যে কথা বলবেন, তাতে আমাদের সংশোধন হবে ইনশাআল্লাহ। ’


তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কাজ হলো বয়ান করা। বয়ানে অনেক সময় ভুল হয়ে যায়।

আমি সবার সামনে রুজু করেছি। কোনো কথায় যদি দোষ হয়, এটা থেকে আমি রুজু করতেছি, আগেও করেছি, এখনো করছি। ’


এর আগে, ঢাকায় এসে বিক্ষোভের মুখে পড়েন মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভি। তিনি যাতে বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে না পারেন সেজন্য তাবলিগ জামাতের একটি অংশ বুধবার (১০ জানুয়ারি) সকাল থেকে বিমানবন্দরের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে এবং বিমানবন্দর থেকে সিভিল এভিয়েশন হেড কোয়াটার্স গেট দিয়ে বের হওয়া সকল যানবাহনে তারা তল্লাশি চালান। এমনকি তল্লাশি চালানো হয় অ্যাম্বুলেন্সও। পরে কঠোর নিরাপত্তায় সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে বিকেলে মাওলানা সাদকে কাকরাইল মসজিদের তাবলিগ জামাতের মারকাজে (অফিস) নেয়া হয়। ওই দিন থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।


পরের দিন সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামানের বরাত দিয়ে জানানো হয়, বিশ্ব ইজতেমা সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশায় মাওলানা সাদ ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন না।  


অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘মাওলানা সাদ বিশ্ব ইজতেমায় যাবেন কি যাবেন না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন ইজতেমার শীর্ষস্থানীয় নেতারা ও তাবলিগ জামাতের মুরব্বিরা। সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশ্ব ইজতেমায় মুসল্লিদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবে। আমরা লক্ষ্য রাখছি যাতে বিশ্ব ইজতেমায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। ’


ওই দিন বিকেলেই মাওলানা সা’দ এর ইস্যুতে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতের বিবাদমান দুই পক্ষের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠক শেষে তিনি জানান, ভারতের তাবলিগ জামাতের মুরব্বি মাওলানা সাদ বিশ্ব ইজতেমার মাঠে যাবেন না। তিনি সুবিধামতো সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাবেন।


এর পরের দিন শুক্রবার (১২ জানুয়ারি) বাদ ফজর তাঁর অনউপস্থিতেই গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ তীরে শুরু হয় ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। জর্ডানের তাবলীগ জামাতের মুরব্বি ওমর হোতিবের আ’মবয়ানের মধ্যদিয়ে শুরু হয় এবারের ইজতেমার কার্যক্রম। মাওলানা আবদুল মতিন তার বয়ান অনুবাদ করে দেন।   


প্রসঙ্গত, ভারতের দিল্লির মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.) ১৯২০ সালের দিকে তাবলিগ জামাতের সূচনা করেন। এর মূল মারকাজ দিল্লিতে। মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ নেতৃত্বে আসেন। তার মৃত্যুর পর সম্প্রতি ইউসুফের ছেলে মাওলানা সা’দ কান্ধলভী আমির হন। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় আসা শুরু করলেও বয়ান শুরু করেন ১৯৯৬ সাল থেকে। আর গত দুই বছর তিনি আম বয়ানের পাশাপাশি আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন।  


তবে মাওলানা সা’দকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্ব ইজতেমায় বয়ান ও আখেরি মোনাজাত পরিচালনা কে করবেন এনিয়ে অনেকটা অনিশ্চিয়তা দেখা দেয়। যদিও শুক্রবার (১২ জানুয়ারি) রাতে তাবলিগ শীর্ষ জামাতের মুরব্বীদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এবার বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত ও হেদায়েতি বয়ান বাংলায় প্রদান করা হবে। এবার আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের মাওলানা হাফেজ মোহাম্মদ জোবায়ের। আর আখেরি মোনাজাতের আগে হেদায়তি বয়ান বাংলায় করবেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন।


প্রসঙ্গত, বিতর্কিত ও আপত্তিকর মন্তব্যের কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের অন্যতম আলেমগণ মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে তাবলিগ জামাতের ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমায় না আসার আহ্বান জানায়। শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে গত ৭ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ীতে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ায় অনুষ্ঠিত তাবলিগের শুরা সদস্য ও আলেমদের বৈঠকে এবারের ইজতেমায় মাওলানা সাদের না আসার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিবর্তে বৈঠকের ফয়সাল নিজামুদ্দিনের দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের আসার সিদ্ধান্ত দেন।


এদিকে গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ তাবলিগ জামাতকে লেখা এক চিঠিতে মালয়েশিয়া তাবলিগের শূরা কর্তৃপক্ষ বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে অনুষ্ঠেয় ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদকে ইজতেমার আমির ও ফয়সালের (সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী) পদ থেকে সরানো হলে এ পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে ওই চিঠিতে সতর্ক করা হয়।


এবারও দুই দফায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বইজতেমা। প্রথম দফা ১২জানুয়ারি থেকে ১৪জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফা ১৯ জানুয়ারি থেকে ২১জানুয়ারি চলবে। দুই দফারই শেষদিন অনুষ্ঠিত হবে তাবলীগ জামাতের প্রধান আকর্ষন আখেরী মোনাজাত।  


প্রথম দফায় ১৬ জেলার মুসুল্লীরা ২৮ খিত্তায়: বিশ্ব ইজতেমার মাঠে প্রতিজেলার মুসল্লিদের অবস্থানের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারিত থাকে। এ স্থানকে খিত্তা বলে।


প্রথম দফায় অংশগ্রহণকারী জেলাগুলোর মধ্যে হল- ঢাকা (১-৮নং, ১৬নং, ১৮নং, ২০নং ও ২১নং খিত্তা), নারায়ণগঞ্জ (১২নং ও ১৯নং খিত্তা), মাদারীপুর (১৫নং খিত্তা), গাইবান্ধা (১৩নং খিত্তা), শেরপুর (১১নং খিত্তা), লক্ষীপুর (২২-২৩নং খিত্তা), ভোলা (২৫-২৬নং খিত্তা), ঝালকাঠি (২৪নং খিত্তা), পটুয়াখালী (২৮নং খিত্তা) , নড়াইল (১৭নং খিত্তা), মাগুরা (২৭নং খিত্তা), পঞ্চগড় (৯নং খিত্তা), নীলফামারী (১০নং খিত্তা) ও নাটোর (১৪নং খিত্তা)।


এদিকে ইজতেমার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেয়া হয়েছে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আগামী ১৪ জানুয়ারি রবিবার আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে শেষ হবে ইজতেমার প্রথম পর্ব। ৪ দিন বিরতির পর ১৯ জানুয়ারি শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব।

 


Top