ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা: জাল দলিল তৈরি করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা | daily-sun.com

ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা: জাল দলিল তৈরি করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা

ডেইলি সান অনলাইন     ৪ জানুয়ারী, ২০১৮ ১২:৪৯ টাprinter

ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা: জাল দলিল তৈরি করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা

 

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরি করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ। আর এই জাল নথির সপক্ষে হারুন-অর-রশিদসহ পাঁচজন সাক্ষী আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চেয়ারপারসনের আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী।


বুধবার (৩ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে হাজির হন খালেদা জিয়া। এ দুর্নীতি মামলায় ষষ্ঠ দিনের যুক্তিতর্ক শুনানিতে তিনি এ কথা বলেন।


মামলার এজাহারের তারিখ, অনুসন্ধানের তারিখ ও অভিযোগপত্র দেওয়ার সময় উল্লেখ করে মোহাম্মদ আলী বলেন, আইনের বিধান অনুযায়ী ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করার কথা। অথচ ৩৯৫ কার্যদিবস সময় নেওয়া হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে জাল দলিল তৈরি করা হয়।


এ ছাড়া রুলস অব বিজনেস, সচিবালয় নির্দেশমালা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কার্যবিবরণীর বিভিন্ন ধারা তুলে ধরে সাবেক এই অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আলী বলেন, আইনের বিধান অনুযায়ী যেভাবে অতিরিক্ত নথি তৈরির কথা তা সেভাবে করা হয়নি। নথির গতিবিধি সংক্রান্ত বিধানও অনুসরণ করা হয়নি। এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী সাবেক মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত সচিব সৈয়দ জগলুল পাশার এতিম তহবিল সংক্রান্ত নথি দেখার কোনো এখতিয়ারই ছিল না।


এর আগে এই মামলায় খালেদা জিয়ার দুজন আইনজীবী তাঁদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। তৃতীয় আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন অব্যাহত রেখেছেন। 

 

এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার পক্ষে পঞ্চম দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। আদালতকে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার জন্য এ মামলাটি করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার এ মামলাটি রাজনৈতিক গন্ধ ও কালিমাযুক্ত। এ ধরনের মামলা রাজনৈতিক অশুভ ইঙ্গিত ছাড়া হতে পারে না। 


তিনি আরও বলেন, অ্যাকাউন্ট ফরম থেকে শুরু করে কোথাও খালেদার কোনো স্বাক্ষর নেই। আছে শুধু ঘষা মাজা। আর ঘষা মাজার উপর নির্ভর করে কোনো ক্রিমিনাল মামলায় সাজা দেওয়া যায় না।


তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান আরাফাত ময়দানে নিম গাছ লাগিয়েছেন। তার আত্মার মাগফেরাতের জন্য বিদেশ থেকে এ টাকা পাঠানো হয়েছে। আর এ টাকায় কোনো শর্ত ছিল না। বিদেশ থেকে যে টাকা পাঠিয়েছেন তার কোনো হদিস নেই।

 

এছাড়া ওই দিন আদালদ শেষে সাংবাদিকদের খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারকের প্রতি ‘ওহী’ নাজিল না হলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালাস পাবেন। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষ আদালতে যে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন, তাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের সম্পৃক্ততা তারা প্রমাণ করতে পারেননি। সবাই জানেন, এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। আদালতের বিচারকের ওপর ওহী নাজিল না হলে মামলা থেকে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন।

 

এর আগে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘আমরা ৩২ জন সাক্ষী ও তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পেরেছি। আশা করছি, আদালতে আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবেন।’


তিনি আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়া টাকা বণ্টন করে দিয়েছেন ট্রাস্টের নামে। তারা স্বীকার করেছেন ট্রাস্টের নামে টাকা জমা আছে। এতে করে এটাই প্রমাণ হয়, তারা আত্মসাৎ করেছেন।’

 

ওই দিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পরবর্তী শুনানি ৩ ও ৪ জানুয়ারি ধার্য করেন আদালত।

 

এর আগে ২৭ ডিসেম্বরও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। ওই দিন তিনি আদালতকে বলেন, এ মামলা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ মামলার সাক্ষ্য, তথ্য প্রমাণে যা আছে, আছে। তারপরও বলতে হয় ‘কেষ্ট বেটাই চোর’... এই বলে তিনি তার প্রথম দিনে যুক্তিতর্ক শেষে করেন।


এর আগে বুধবার (২৭ ডিসেম্বর) বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত বিশেষ আদালত-৫ এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামানের আদালতে খালেদা জিয়ার আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খানের যুক্তিতর্ক শেষ হয়। তিনি চার দিন যুক্তিতর্ক উপস্থান করেন। ওই দিন তিনি আদালতকে বলেন, সংবিধানের ৫৫ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো পাবলিক সার্ভেন্ট কোনো মামলার আসামি হতে পারে না। তিনি দাবি করেন, এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ আনতে।


রেজ্জাক খান বলেন, ‘আমি সম্মানের সাথে আদালতকে বলেছি, এই মামলায় খালেদা জিয়াকে খালাস দেয়া হোক।’


এর আগে মঙ্গলবার (২৬ ডিসেম্বর) যুক্তি উপস্থাপনের তৃতীয় দিনে আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান বলেন, ৩২ সাক্ষীর কেউ বলেননি যে খালেদা জিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। 

 

ওই দিন তিনি প্রথমেই দুদকের ১৩তম সাক্ষীর সাক্ষ্য খণ্ডানোর যুক্তি তুলে ধরেন। এ সময় তিনি সোনালী ব্যাংকের কোন ডকুমেন্ট আদালতে প্রদর্শিত হয়নি জানিয়ে কোনো সাক্ষী মূল ডকুমেন্টগুলো দেখেছেন এমন কোনো সাক্ষ্য দেয়নি মর্মে আদালতকে অবহিত করেন।


 তিনি বলেন, সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাসহ কেউ প্রমাণ করতে পারেননি যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতিতে খালেদা জিয়ার সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র কেউ আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি।

 

ওই দিন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি নেতাদের মধ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। আদালত শেষে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেয়া হয়েছে। এ মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পায়নি আদালত। তাই এ মামলা থেকে তিনি খালাস পাবেন।


এর জবাবে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ব্যারিস্টার মওদুদ এই মামলা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। খালেদা জিয়ার তালিকাভুক্ত আইনজীবী হলেও তিনি কোর্টে আসেন না। তিনি কোর্টে এলে সাক্ষীদের বক্তব্য শুনতেন।


দুদকের পক্ষে আদালতে আরও উপস্থিত ছিলেন মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু, অ্যাডভোকেট মীর আব্দুস সালাম, অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন মানিক প্রমুখ।


এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার অন্যতম আসামি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ওই দিন আব্দুর রেজ্জাক খান বলেন, এটা কোনো মুদি দোকান নয়। এটা চকবাজার বা পাটুয়াটুলীর কোনো পাইকারি দোকান নয়। এটা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মামলা। মামলাটি কোনো রকমভাবে শেষ করলে হবে না। মাননীয় আদালতকে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।


তিনি আরও বলেন, এটা সম্পূর্ণ রিপোর্ট না অসম্পূর্ণ রিপোর্ট এর তদন্ত মাননীয় আদালত আপনার ওপর। কোনো সাক্ষীর মুখ থেকে আসেনি প্রধানমন্ত্রী (তৎকালীন) বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এর কোনো দালিলিক প্রমাণও নেই। এমনকি কেউ মুখেও বলতে পারেননি যে, প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়ার কথায় একাউন্ট খোলা হয়েছে। তিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, তার একটি রাজনৈতিক জীবন আছে। যাতে এই মামলার মাধ্যমে কোলাহল সৃষ্টি করা হয়েছে। 

 

ওই দিন বিশেষ আদালত-৫ এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামান ২৬, ২৭ ও ২৮ ডিসেম্বর দুই দুর্নীতি মামলার কার্যক্রমের জন্য দিন ধার্য করেন।


এরা আগে বুধবার (২০ ডিসেম্বর) জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার নামে যে চার্জ গঠন করা হয়েছে তা বিধিসম্মত হয়নি মর্মে শুনানি করেন তার আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান।


এর আগের দিন মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। ওই দিন ষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল মামলার ৩২ সাক্ষীর জবাবনবন্দি উপস্থাপন করে তার যুক্তিতর্কে খালেদা জিয়ার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেন।

 

এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর আদালত এই মামলার যুক্তিতর্কের জন্য ১৯, ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন। ওই দিন আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনে শেষ দিনের বক্তব্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আনা অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিচারককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আমি এই মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি এবং আপনার আদালতে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি। ’ 

 

আদালতে তিনি আরও বলেন, ‘মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক হারুন অর রশীদ নিরপেক্ষতার বিধান লঙ্ঘন করে কোনো রুপ দালিলিক প্রমাণ ছাড়া ১৫ দিনের মাথায় আমার বিরুদ্ধে একটি হয়রানিমূলক ও মিথ্যা রিপোর্ট দাখিল করেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি নিরপেক্ষ থাকলে এ রূপ অনুমান নির্ভর সাক্ষ্য দেয়ার সুযোগ থাকতো না।

 

খালেদা জিয়া বলেন, জিয়া অরফানেজের সঙ্গে আমি কোনোভাবে জড়িত নই। আমি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের তহবিল সংগ্রহ, বণ্টন এবং কোনো রকম ব্যাংকিং লেনদেনের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত ছিলাম না। কাজেই এর মাধ্যমে নিজের লাভবান হওয়া বা অন্য কাউকে লাভবান করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। 

 

তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিশেষ করে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য প্রায়ই আমাকে জড়িয়ে জনসম্মুখে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করেন। আমাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার অপপ্রয়াস হিসেবে অনুমান নির্ভর ও কাল্পনিক অভিযোগে এই মামলায় মিথ্যা বর্ণনায় আমাকে জড়ানো হয়েছে। আমাকে, জিয়া পরিবার ও বিএনপিকে হয়রানি করার প্রয়াস হিসাবে এ মামলাটি করা হয়েছে।

 

এর আগে ওই দিন বেলা সোয়া ১১টার দিকে জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত খালেদার জামিন এবং জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় যুক্তি উপস্থাপন উত্তোলনপূর্বক আত্মপক্ষ সমর্থনের আবেদন মঞ্জুর করেন।

 

তবে আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবীরা আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য দিতে আবেদন করলে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বিরোধিতা করেন। আদালতে তিনি আবেদন করেন, ‘সাত-সাতদিন তিনি (খালেদা জিয়া) বক্তব্য দিয়েছেন, আর কত? তার লিখিত বক্তব্য নেয়া হোক।’

 

আদালত তার আবেদন মঞ্জুর করে বলেন, ‘আজকেই তাকে (খালেদা জিয়া) শেষ সুযোগ দেয়া হচ্ছে। আজকেই (মঙ্গলবার) তাকে বক্তব্য শেষ করতে হবে। শেষ করতে না পারলে লিখিত আকারে দিতে হবে।’ পরে আদালতে খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দেয়া শুরু করেন।

 

এর আগে বৃহস্পতিবার (৩০ নভেম্বর) আদালতে হাজির না হওয়ায় দুই মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। ওই দিন আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের অসমাপ্ত বক্তব্য দেয়া এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার সাফাই সাক্ষীর দিন ধার্য ছিল। কিন্তু বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার ডাকে সকাল ৬টা থেকে ২টা পর্যন্ত অর্ধদিবস হরতালের কারণে বিএনপি নেত্রী আদালতে হাজির হননি। এ কারণে জামিন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এ ছাড়া ৫, ৬ ও ৭  ডিসেম্বর যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করেন আদালত।

 

এর আগে গত ২৩ নভেম্বর বিশেষ আদালতে হাজির হয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় স্থায়ী জামিন আবেদন করেছিলেন বিএনপি নেত্রী। তবে আদালত এ আবেদন নাকচ করে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ৩০ নভেম্বর দিন ধার্য করেছিলেন।

 

ওই দিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সষ্ঠ দিনের দেয়া বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আমার বিরুদ্ধে যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে তা মিথ্যা ও বানোয়াট। দুটি অভিন্ন তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হলেও তা অভিন্ন নয় বরং একই ধরনের রিপোর্ট।  


আদালতে খালেদা জিয়া বলেন, একটি মহল কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে পূর্বের রিপোর্টের মতো পরের রিপোর্টও দাখিল করা হয়েছে। প্রথম রিপোর্টে আমার নাম ছিল না, কিন্তু পরের রিপোর্টে শুধু আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করে দাখিল করা হয়েছে।


তিনি বলেন, তদন্তকারীদের মধ্যে হারুন-অর রশিদ নিরপেক্ষ তদন্ত না করে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে একটি অসত্য রিপোর্ট দাখিল করে আমার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

 

গত ১৬ নভেম্বর খালেদা জিয়া আদালতে পঞ্চম দিনের মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন। ওই তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে ৩৬ মামলার সবই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে করা। এসবের কোনোটিরই আইনি ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, আমি রাজনীতিতে সক্রিয়, যা ক্ষমতাসীনদের জন্য চ্যালেঞ্জ। 


খালেদা জিয়া বলেন, আমি কোনো দুর্নীতি করিনি। কুয়েত শহীদ জিয়াউর রহমানের নামে এতিম খানা প্রতিষ্ঠার জন্য অনুদান দিয়েছিলো। এতে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিলো না। তিনি দাবি করেন কুয়েতের দেয়া অনুদানের অর্থ দুই ভাগ করে দু'টি ট্রাস্টকে দেয়া হয়। এতে আইনের কোনো লঙ্ঘন হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে আমি কিংবা অন্য কারোর লাভবান হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।


সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ট্রাস্ট দু'টির কোনো পদে আমি কখনো ছিলাম না বা এখনো নেই। প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও আমার কোন ধরনের সম্পৃক্ততা ছিলো না।


গত ৯ নভেম্বর খালেদা জিয়া চতুর্থ দিনের মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন। এদিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় খালেদা জিয়া স্থায়ী জামিনের জন্য আবেদন করলে তা খারিজ করে দেন আদালত। পরে বিচারক আজ এ মামলার পরবর্তী সময়ে শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করে দেন।


ওই দিন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে চতুর্থ দিনের বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশে বিচারের নামে নানা অবিচার হয়। আর অবিচার হয় বলেই এ দেশে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাদের জেলে যেতে হয়েছিল।


তিনি বলেন, শাসক মহলের ইচ্ছা অনুযায়ী আমাদের বিরুদ্ধে কোনো একটা রায় দেওয়া হবে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে চাই যে, আপনি (আদালত) সাহস ও সততার সঙ্গে আইন অনুযায়ী ন্যায় বিচার করবেন।


আওয়ামী লীগের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসুন, রাজনীতিতে সহিষ্ণু, সুন্দর সংস্কৃতি গড়ে তুলি। যা গণতন্ত্রের জন্য খুবই প্রয়োজন। যাতে আমাদের কাছ থেকে ভবিষ্যত প্রজন্ম ভালো কিছু শিখতে পারে। প্রতিহিংসামূলক বৈরী আচরণের পরও আমি তাকে (শেখ হাসিনা) ক্ষমা করে দিয়েছি।

 

দুর্নীতির এই মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ১৯ অক্টোবর আদালতে আত্মসমপর্ণ করে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান খালেদা জিয়া। ওই দিন (১৯ অক্টোবর), ২৬ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর খালেদা জিয়া আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন।


২ নভেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতে খালেদা জিয়া বলেন, কত মামলা ঝুলে আছে। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে মামলাগুলো রকেটগতিতে ছুটছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, এতে কি ন্যায়বিচার হবে? আগামী নির্বাচনে আমাকে অযোগ্য ঘোষণা করতেই ক্ষমতাসীনরা একটি নীলনকশা প্রণয় করেছে। 


এর আগে গত ২ নভেম্বর খালেদা জিয়া দুই মামলায় স্থায়ী জামিনের আবেদন করলে বিচারক তা নাকচ করে দেন। ফলে এখন প্রতি সপ্তাহেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদালতে হাজিরা দিতে যাচ্ছেন।


জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।


২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশিদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।


মামলার অন্য আসামিরা হলেন—খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী (পলাতক), হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।


এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক।


২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপপরিচালক হারুন আর রশিদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়।


মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন—মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান।

 

আরও পড়ুন:

 

বিচারকের প্রতি ‘ওহী’ নাজিল না হলে খালাস পাবেন খালেদা: খন্দকার মাহবুব হোসেন


খালেদার মামলাটি রাজনৈতিক গন্ধ ও কালিমা যুক্ত: যুক্তিতর্কে আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন


৩২ সাক্ষীর কেউ বলেননি খালেদা জিয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন: যুক্তিতর্কে আইনজীবী রেজ্জাক খান


এটা চকবাজারের কোনো পাইকারি দোকান নয়: যুক্তিতর্কে খালেদার আইনজীবী: রেজ্জাক খান


অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি রাষ্ট্রপক্ষের

 

আমার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন মিথ্যা-বানোয়াট: খালেদা জিয়া

 

আমার ৩৬ মামলার কোনোটিরই আইনগত ভিত্তি নেই: খালেদা জিয়া​

 

অবিচার হয় বলেই শেখ মুজিব-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীকে জেলে যেতে হয়েছিল: খালেদা জিয়া​

 

কত মামলা ঝুলে আছে, আমার মামলা এগোচ্ছে রকেটগতিতে: খালেদা জিয়া


আদালতে অসমাপ্ত আত্মপক্ষ সমর্থনে অশ্রুসিক্ত খালেদা


বকশীবাজার কোর্ট ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দীনের শাসনামলের কোর্টের মতো: খালেদা জিয়া

 

 


Top