রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাশ, প্রস্তাবের পক্ষে ১৩৫ ভোট বিপক্ষে ১০ | daily-sun.com

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাশ, প্রস্তাবের পক্ষে ১৩৫ ভোট বিপক্ষে ১০

বিপক্ষে ভোট দিয়েছে চীন, রাশিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামসহ ১০টি দেশ; ভোটদানে বিরত ছিল ভারত ও জাপান; অনুপস্থিত ইরান

ডেইলি সান অনলাইন     ১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:২৩ টাprinter

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘে প্রস্তাব পাশ, প্রস্তাবের পক্ষে ১৩৫ ভোট বিপক্ষে ১০

 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ ও দেশত্যাগে বাধ্য করায় জাতিসংঘের সামাজিক, মানবিক ও মানবাধিকার বিষয়ক এজেন্ডা নির্ধারণী কমিটিতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি রেজ্যুলেশন (প্রস্তাব) গৃহীত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) নিউইর্য়ক সময় সকালে ভোটাভুটির পর রেজ্যুলেশনটি গৃহীত হয়।


গৃহীত প্রস্তাবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত ও রোহিঙ্গাদের ওপর যারা অত্যাচার-নিপীড়ন করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্যও দেশটির সরকারকে বলা হয়েছে।


জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন নিউইয়র্ক থেকে জানান প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৩৫টি দেশ। চীন, রাশিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামসহ ১০টি দেশ প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। ভারত ও জাপান সহ ২৬টি দেশ কোনো পক্ষেই ভোট দেয়নি। এছাড়া ইরানসহ অনুপস্থিত ছিল ২২টি দেশ।


প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর সহিংসতা বন্ধ ও মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পুনর্বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের 'পূর্ণ নাগরিকত্ব' দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।


বার্তা সংস্থা এপি জানায়, ৩১ অক্টোবর কমিটিতে 'মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি' শিরোনামে ওআইসি এ খসড়া প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। এর কো-স্পনসর ছিল ৯৭টি দেশ। ২ সপ্তাহের মাথায় সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটি ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবটি পাস করল। প্রায় ১৫ বছর ধরে এ কমিটি ‘মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে প্রতি বছর এ প্রস্তাব গ্রহণ করে।


প্রস্তাবটিতে বলা হয়, রাখাইনে সামরিক অভিযানের কারণে 'পদ্ধতিগতভাবে' রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এ অভিযান বন্ধ করাসহ রোহিঙ্গা নিধনের জন্য দোষীদের বিচারের আওতায় আনতেও মিয়ানমার সরকারকে বলা হয়।


এছাড়া বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে রাখাইনে ফেরত যেতে পারেন, রাখাইনে যেন জাতিসংঘসহ অন্যান্য সাহায্য সংস্থা কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে প্রস্তাবে উলে্লখ করা হয়।


প্রস্তাবে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেসকে 'মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত' নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনসহ সব ধরনের সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সহযোগিতাকে উত্সাহিত করা হয়েছে। 


যারা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, যেসব সামরিক, সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তি রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার করেছে- তাদের বিরুদ্ধে পূর্ণ, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদনে্তর আহ্বান জানানো হয়েছে এ প্রস্তাবটিতে।


উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযানের ঘোষণা দিয়ে আগে থেকেই রাখাইনের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো অবরুদ্ধ করে রাখে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে গত ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পরে প্রবেশের চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। ওইদিনের পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নিপীড়ন, ধর্ষণসহ নানা অমানবিক নির্যাতন। সেনা অভিযানে এখন পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন। জাতিগত নিধনের পাশাপাশি জ্বালিয়ে দেয়া হয় রোহিঙ্গাদের প্রতিটা গ্রাম। সেইসাথে সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শরণার্থী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এ অঞ্চলে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র হিসাবে, সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২৫ আগস্ট থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।


আর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক ধর্ষণের ঘটনায় সেনাবাহিনীকেই দায়ী করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। 


জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ অধিকাংশ শক্তিশালী রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংগঠনের চাপে পড়লেও মিয়ানমান এ হত্যাযজ্ঞ থেকে নিজেকে নিবৃত করেনি। আন্তর্জাতিক মহল বারবার দেশটির স্টেট কাউন্সিলর সু চিকে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর জাতিগত নিধন বন্ধ করার আহবান করলে তিনি তাকে গুরুত্ব দেননি। এমন কি কোন মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে এই অঞ্চলে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি মিয়ানমার সরকার।


এ ছাড়াও সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী এখনো প্রতি সপ্তাহে দেশটি থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে।
 

গত বছরের অক্টোবরে একই ধরনের ঘটনায় পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এভাবে কয়েক দশক ধরে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, এখন পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা শরণার্থী সংকট হচ্ছে রোহিঙ্গারা। সংস্থাটি মিয়ানমার সেনা বাহিনীর এই নির্মমতাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘জাতিগত নিধন’ বলে উল্লেখ করেছে।


এদিকে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান, জর্ডানের রানী রানিয়া আল আব্দুল্লাহ, মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি, জাতিসংঘ মহাসচিবের যৌন সহিংসতাবিষয়ক বিশেষ দূত প্রমীলা প্যাটেন ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন।

 


Top