বার্মিজ সেনাদের তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগ অস্বীকার | daily-sun.com

বার্মিজ সেনাদের তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগ অস্বীকার

ডেইলি সান অনলাইন     ১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ১০:৫৩ টাprinter

বার্মিজ সেনাদের তদন্ত প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা নিধনের অভিযোগ অস্বীকার

 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর জাতিগত নিধনের বিষয়ে একটি আভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। সেখানে রোহিঙ্গাদের হত্যা, তাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া, ধর্ষণ, ভয়াবহ লুটপাট ও সীমাহীন নির্যাতনের সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছে সেনারা। এ ইস্যুতে তারা নিজেদের ঘাড়ে কোনো দায় নেয়নি। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই প্রতিবেদন পরিকল্পিত ‘ধবলধোলাই’


ফেসবুকে পোস্টের একটি বিবৃতিতে  সামরিক  কর্তৃপক্ষ বলেছে যে, তারা কয়েক কয়েক হাজার গ্রামবাসীর সাক্ষাতকার নিয়েছেন যারা এ ধরণের কর্মকাণ্ডের কথা অস্বীকার করেছেন। একইসাথে তারা সেনাবাহিনীর সাথে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে-"নির্দোষ গ্রামবাসীদের" ওপর গুলি চালানো হয়নি, নারীদের ওপর কোন ধরণের "যৌন নির্যাতন এবং ধর্ষণ" করা হয়নি, কোন গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়নি, গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কোন রৌপ্য, স্বর্ণ, যানবাহন বা গবাদি পশু চুরি যায়নি, মসজিদে আগুন লাগানো হয়নি, কাউকে হুমকি ধামকি দিয়ে বের করে দেয়া হয়নি এবং কোন বাড়িঘরে ঢুকে অগ্নিসংযোগ করা হয়নি।


এ প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাঙ্গালি হিসেবে উল্লেখ করে তাদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে দাবী করা হয়। ঘরবাড়ি অগ্নিসংযোগের জন্য তাদেরকে দায়ী করা হয়। বলা হয়, এসব সন্ত্রাসীদের ভয়ে এসব হাজার হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে এবং তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে।

 

 

এদিকে জাতিসংঘ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধনের ধ্রুপদি উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিবিসির প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্যাতনের কিছু চিত্র পেয়েছেন। এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রতিবেদনের কোনো মিল নেই।

 

সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি সফরে রাখাইনে গিয়েছিলেন বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি জোনাথন হেড। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে পুলিশের সঙ্গে বৌদ্ধ পুরুষদেরও অবস্থান করতে দেখতে পান।


বিবিসি বলছে, তাদের প্রতিবেদকরা রাখাইনে যা দেখেছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই প্রতিবেদনের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাদের বর্বর অভিযানকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ। বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও অধিকার সংস্থা রোহিঙ্গা পরিস্থিরি জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে। কিন্তু এখন তারা সব দায় এড়িয়ে রোহিঙ্গাদের ঘাড়েই দোষ চাপাচ্ছে।


মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেনাবাহিনীর এই প্রতিবেদনকে বাহিনীটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ দূর করার চেষ্টা বলে মনে করছে। সংস্থাটি বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই প্রতিবেদন পরিকল্পিত ‘ধবলধোলাই’। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একজন মুখপাত্র বলেন,  ‘এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনী পরিষ্কার করে দিয়েছে যে জবাবদিহিতা নিশ্চতকরণের ব্যাপারের এতে কোনধরণের ইঙ্গিত নেই।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘এখন এ ধৃষ্টতাপূর্ণ নির্যাতনগুলির বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’


রাখাইনে জাতিসংঘের বিভিন্ন স্তরের পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত দলকে প্রবেশের অনুমতি দিতে মিয়ানমারের ওপর আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।

 


রাখাইনে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না বললেই চলে। যদি কোনো মিডিয়াকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়াও হয়, তবে তাদের হাতে কড়া নির্দেশিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়, স্থান ও লোকজন ছাড়া সাংবাদিকদের সেখানে যেতে দেওয়া হয় না।

 

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযানের ঘোষণা দিয়ে আগে থেকেই রাখাইনের রোহিঙ্গা গ্রামগুলো অবরুদ্ধ করে রাখে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে গত ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পরে প্রবেশের চেষ্টা করলে শুরু হয় সংঘর্ষ। ওইদিনের পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। সেনা অভিযানে এখন পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন।
জাতিগত নিধনের পাশাপাশি জ্বালিয়ে দেয়া হয় রোহিঙ্গাদের প্রতিটা গ্রাম। সেইসাথে সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন শরণার্থী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এ অঞ্চলে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র হিসাবে, সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে ২৫ আগস্ট থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।


জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ অধিকাংশ শক্তিশালী রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংগঠনের চাপে পড়লেও মিয়ানমান এ হত্যাযজ্ঞ থেকে নিজেকে নিবৃত করেনি। আন্তর্জাতিক মহল বারবার দেশটির স্টেট কাউন্সিলর সু চিকে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর জাতিগত নিধন বন্ধ করার আহবান করলে তিনি তাকে গুরুত্ব দেননি। এমন কি কোন মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে এই অঞ্চলে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি মিয়ানমার সরকার।


এ ছাড়াও সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী এখনো প্রতি সপ্তাহে দেশটি থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে।

 


গত বছরের অক্টোবরে একই ধরনের ঘটনায় পালিয়ে আসে প্রায় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এভাবে কয়েক দশক ধরে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, এখন পর্যন্ত বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠা শরণার্থী সংকট হচ্ছে রোহিঙ্গারা। সংস্থাটি মিয়ানমার সেনা বাহিনীর এই নির্মমতাকে ‘গণহত্যা’ ও ‘জাতিগত নিধন’ বলে উল্লেখ করেছে।


এদিকে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান, জর্ডানের রানী রানিয়া আল আব্দুল্লাহ, মালয়েশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদি, জাতিসংঘ মহাসচিবের যৌন সহিংসতাবিষয়ক বিশেষ দূত প্রমীলা প্যাটেন ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছেন।

 

 


Top