আদালতে অসমাপ্ত আত্মপক্ষ সমর্থনে অশ্রুসিক্ত খালেদা | daily-sun.com

আদালতে অসমাপ্ত আত্মপক্ষ সমর্থনে অশ্রুসিক্ত খালেদা

ডেইলি সান অনলাইন     ২৬ অক্টোবর, ২০১৭ ১৮:৩০ টাprinter

আদালতে অসমাপ্ত আত্মপক্ষ সমর্থনে অশ্রুসিক্ত খালেদা

 

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। নিজ বাসায় ‘অবরুদ্ধ’ থাকা অবস্থায় মামলার আসামি হওয়া ও সন্তানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার কথা উল্লেখ করে এক পর্যায়ে তিনি অশ্রুসিক্তও হয়ে পড়েন।

 


তিনি বলেন, চার দশকের স্মৃতি বিজড়িত বসত বাড়ি থেকে  আমাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। আমাকে বাসা ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে বালুর ট্রাক দিয়ে কয়েক দফায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। আমি অফিসে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়।   আমি অবরুদ্ধ অবস্থাতে বিদেশে চিকিৎসাধীন ছোট ছেলের মৃত্যুর সংবাদ...। ’ এ পর্যায়ে খালেদা জিয়া আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন।


নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আবারও বক্তব্য শুরু করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমি সেদিন ( ছোট ছেলে কোকোর মৃত্যুর দিন) এবং আমার সঙ্গে যারা অফিসে অবরুদ্ধ ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বানোয়াট একটি মামলা দায়ের করা হয়।   অভিযোগ করা হয়- রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো এবং বিস্ফোরক দিয়ে মানুষ হত্যার।   অফিসে অবরুদ্ধ থাকাকালীন অবস্থায় আমরা এসব করেছি।

এটা কি কোনও সভ্য মানসিকতার আচরণ হতে পারে?’


বৃহস্পতিবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর বকশিবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে দেওয়া বক্তব্যের তিনি এসব কথা বলেন। খালেদা জিয়া তার বক্তব্য শুরু করেন বেলা ১২টা ১৩ মিনিটে। বক্তব্য শেষ করেন ১টা ১৭ মিনিটে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তিনি। এসময় খালেদা জিয়া বলেন, ‘এ মামলা ভুয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ’


তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন সময়ে মামলা হয়েছে। কিন্তু, তিনি পরম সৌভাগ্যবান। তাকে আমার মতো কখনও এমন করে আদালতে হাজিরা দিতে হয়নি।


খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি আইন-আদালত ও বিচার বিভাগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই এই বয়সে নানা সমস্যার মধ্যেও যতদূর সম্ভব সশরীরে আদালতে হাজির থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার আইনজীবীরা আইনানুগভাবে মামলা মোকাবিলা করে যাচ্ছেন। কিন্তু, অনিবার্য কারণে আদালতে উপস্থিত হতে না পারলেই আমার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হচ্ছে। আমার পরিচয় দেশবাসী জানেন। আদালতেরও নিশ্চয় অজানা নয়। ’


তিনি আরো বলেছেন, ‘আমরা গণপ্রতিনিত্বশীল সরকার গঠন করতে চাই। দ্বন্দ্ব সংঘাতের বদলে শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চাই এ দেশে। আমাদের বিরুদ্ধে সব মামলাই ভুয়া মামলা। কী অপরাধ যে আমাকে এরকম আদালতে ঘুরতে হচ্ছে?’


পরে তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা সর্বমতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রর্বতন করেছিলাম। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সাংবিধানিক সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই সঙ্কট থেকে দেশকে আমরা মুক্ত করতে চাই। জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে চাই। ’


খালেদা দাবি করেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে ‘নির্বাচিত সরকার নয়’, কারণ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সিংহভাগ ভোটারই ভোট দেননি।


আদালতকে তিনি বলেন, ‘আমি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক। তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম সফল অধিনায়ক। তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বাংলাদেশের প্রাক্তণ সেনাপ্রধান। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক এবং জননির্বাচিত ও নন্দিত সফল রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাভাষী সৈনিকদের প্রতিরোধ যুদ্ধে উদ্ধুদ্ধ করার সুযোগ আমাকে ইতিহাস দিয়েছে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমি সে কর্তব্য পালন করেছি। ’


সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দুটি শিশু সন্তানসহ গ্রেপ্তার হয়ে এই রাজধানীতে আরও অনেকের সঙ্গে চরম অনিশ্চিত ও দুঃসহ বন্দিজীবন আমাকে কাটাতে হয়েছে। আমাদের বন্দি শিবিরের ওপর বোমা বর্ষণের সময়ে আল্লাহর অসীম রহমতে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছি। কেবল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নয়, এরপর আরও অনেকবারই চরম বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও আল্লাহ আমাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন। ’


তিনি বলেন, ‘প্রায় পৌনে নয় বছর স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথে জনগণের কাতারে থেকে গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে আপসহীন ভূমিকা রেখেছি। আমি এজন্য মানুষের অপরিসীম সমর্থন ও দোয়া পেয়েছি। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আসনে জনগণ আমাকে নির্বাচিত করেছেন। বাংলাদেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে আমি তিন-তিনবার তাদের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি। ’


খালেদা জিয়ার যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, সে সময় নথিতে তা লিখে রাখছিলেন বিচারক আখতারুজ্জামান।


বিএনপি নেত্রীর এসব বক্তব্য মামলার সঙ্গে ‘প্রাসঙ্গিক নয়’ মন্তব্য করে তা নথিতে যুক্ত না করার আবেদন করেন দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। কিন্তু বিচারক তাতে অসম্মতি জানান।


শুনানিতে কাজলের সঙ্গে ছিলেন খুরশিদ আলম খান। আর খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকার, আবদুর রেজাক খান, সানাউল্লাহ মিয়া ও নুরুজ্জামান তপন।


দ্বিতীয় দিনেও নিজের বক্তব্য শেষ না করে খালেদা জিয়া পরবর্তী সময়ে বাকি বক্তব্য উপস্থাপনের অনুমতি চাইলে বিচারক মো. আখতারুজ্জামান তা মঞ্জুর করে ২ নভেম্বর শুনানির পরবর্তী দিন ঠিক করে দেন। জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলাও একই দিনে এ আদালতে আসবে।


বহুবার তারিখ পেছানোর পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করেন গত ১৯ অক্টোবর। সেদিন তিনি দাবি করেন, জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টে এতিমদের জন্য আসা একটি টাকাও তছরুপ বা অপচয় করা হয়নি, তা ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে।


জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ওই ট্রাস্টে এতিমদের জন্য আসা একটি টাকাও তছরুপ বা অপচয় করা হয়নি, তা ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে।


এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় এ মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।


তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ অগাস্ট তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দেন। তার পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ অভিযোগ গঠন করে খালেদাসহ ছয় আসামির বিচার শুরু করেন।

 


Top