‘আমি অসুস্থ না ফিরে আসব’ | daily-sun.com

‘আমি অসুস্থ না ফিরে আসব’

ডেইলি সান অনলাইন     ১৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০৯:২১ টাprinter

‘আমি অসুস্থ না ফিরে আসব’

 

অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এক মাস ৯ দিনের ছুটিতে থাকা প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা চলে গেলেন অস্ট্রেলিয়ায়। গতকাল শুক্রবার রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের এসকিউ-৪৪৭ নম্বর ফ্লাইটে করে তিনি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন।


তবে যাওয়ার আগে বলে গেলেন অনেক কথা। রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগ মুহূর্তে নিজ বাসভবনের সামনে অপেক্ষমাণ গণমাধ্যমকর্মীদের প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমি অসুস্থ না। আমি চলে যাচ্ছি। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না।


প্রধান বিচারপতি আরো বলেন, ‘আমি একটু বিব্রত। আমি বিচার বিভাগের অভিভাবক। বিচার বিভাগ যাতে কলুষিত না হয় সে জন্যই সাময়িকভাবে যাচ্ছি। বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকুক এটাই আমি চাই। কারো প্রতি আমার বিরাগ নেই।


আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। আমি আর কিছু বলব না। আমি লিখিত বক্তব্য দিচ্ছি। ’


প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অস্ট্রেলিয়ায় বড় মেয়ে সুষমা সিনহার বাসায় উঠবেন। পরে তিনি কানাডায় যাবেন ছোট মেয়ের কাছে। এর পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যাবেন। এই চার দেশ সফর শেষে আগামী ১০ নভেম্বর তাঁর দেশে ফেরার কথা। প্রধান বিচারপতি দেশ ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কখন কোথায় যান, তাঁর বাসায় কখন কে আসা-যাওয়া করে তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের অবসান হলো।


গণমাধ্যমের কাছে লিখিত বক্তব্য প্রধান বিচারপতি গণমাধ্যমের কাছে একটি লিখিত বক্তব্য দেন। তাতে বলা হয়, ‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ আছি, কিন্তু ইদানীং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবী, বিশেষ করে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিয়ে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারের একটি মহল আমার রায়কে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে পরিবেশন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন। যা অচিরেই দূরীভূত হবে বলে আমার বিশ্বাস। সেই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমি একটু শঙ্কিতও বটে। কারণ গতকাল প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রবীণতম বিচারপতির উদ্ধৃতি দিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অচিরেই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনে পরিবর্তন আনবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার রেওয়াজ নেই। তিনি শুধু রুটিন মাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরো অবনতি হবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। ’


প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার উদ্দেশে গত রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে বাসা থেকে বের হন। তাঁর সঙ্গে ছিল একটি গাড়িবহর। প্রধান বিচারপতির প্রটোকল নিয়েই তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছান রাত সাড়ে ১০টায়। প্রধান বিচারপতির যাওয়ার সংবাদ পেয়ে বিমানবন্দরে আগে থেকেই সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বিমানবন্দর পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। জানা গেছে, প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে সিঙ্গাপুরে যাত্রাবিরতি করবেন।


প্রধান বিচারপতির বিদেশযাত্রা উপলক্ষে গতকাল তাঁর সঙ্গে ভাই-বোন, চাচাতো ভাইসহ বেশ কয়েকজন আত্মীয় দেখা করেন। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ছাড়াও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রধান বিচারপতির বাসায় যান। তাঁরা প্রধান বিচারপতির মালপত্র গুছিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতেই যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।


অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ৩ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাসের ছুটি নেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। পরে ছুটির মেয়াদ আরো ৯ দিন বাড়িয়েছেন। তিনি গত ৫ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার ভিসার জন্য আবেদন করেন। এরই মধ্যে তিনি ভিসা পেয়েও গেছেন। বিমানের টিকিটও সংগ্রহ করেছেন।


তাঁর বাসায় প্রতিদিনই যাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা, আত্মীয়স্বজন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইউরোলজি, কার্ডিওলজি এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চিকিৎসকরা। গত ৮ অক্টোবর সকালে মহাখালীতে আইসিডিডিবার,বির ডায়াগনস্টিক ল্যাবে রক্ত ও প্রস্রাবের কিছু নমুনা পরীক্ষা করান। ৯ অক্টোবর তিনি বনানী ১১ নম্বর সড়কে জনসন প্যালেস ক্লিনিকে ডা. সেন সরকারকে দিয়ে দাঁতের চিকিৎসা করান। গতকাল তাঁর ভাই এন কে সিনহা, তিন ভাতিজির স্বামী সুজিত সিনহা, রামকান্ত সিনহা ও রাজমন সিনহা, শ্যালিকা শিলা সিনহা প্রধান বিচারপতির বাসায় যান। এ ছাড়া তাঁর বোন, চাচাতো ভাই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেন। গত রাতে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করেন হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মো. সাব্বির ফয়েজ, প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত সহকারী মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁর বাসায় যান।


গত ১০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত সহকারীর বরাত দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. জাকির হোসেন আইন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি লেখেন। তাতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি বিশ্রামের জন্য ১৩ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশে থাকতে চান। তিনি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করতে চান। এ চিঠিসংবলিত নথিতে প্রধানমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর স্বাক্ষরের পর তা পাঠানো হয় রাষ্ট্রপতির দপ্তরে। ১১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ওই নথিতে সই করেন। পরদিন আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।


রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মধ্য দিয়ে প্রধান বিচারপতি যেমন বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পেলেন, তেমনি তিনি ছুটিও বাড়িয়ে নিলেন। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার দায়িত্ব পালনের মেয়াদও বেড়ে যায়। তাঁর দায়িত্ব পালনের বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘প্রধান বিচারপতি ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অথবা স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগে কর্মে প্রবীণ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ’


বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা দেশের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি শপথ নেন। আগামী বছর ৩১ জানুয়ারি তিনি অবসরে যাবেন।


উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে পুনর্বহালের বিধানসংবলিত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ বলে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখে গত ৩ জুলাই রায় দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে ওই রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায় গত ১ আগস্ট প্রকাশিত হয়। মূল রায়টি লিখেছেন প্রধান বিচারপতি নিজে। এ রায় নিয়ে সরকারি দলের সমালোচনার মুখে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি। রায় প্রকাশের পর থেকেই দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকও সংবাদ সম্মেলন করে রায়ের সমালোচনা করেন।


এসব কিছুর মধ্যেই গত ৮ সেপ্টেম্বর বিদেশ সফরে যান প্রধান বিচারপতি। প্রথমে তিনি কানাডা যান অসুস্থ মেয়েকে দেখতে। সেখান থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর জাপানে প্রধান বিচারপতিদের একটি সম্মেলনে যোগ দেন। ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। এর আগে ২৫ আগস্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে অবকাশ শুরু হয়। গত ২ অক্টোবর এ ছুটি শেষ হয়। ওই দিনই ছুটি নিয়ে তা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন প্রধান বিচারপতি। ৩ অক্টোবর ছুটি শুরু হয়।

-সূত্র: কালের কন্ঠ

 


Top