শেখ হাসিনা ও রোহিঙ্গা: শুভেচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই | daily-sun.com

শেখ হাসিনা ও রোহিঙ্গা: শুভেচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই

আফসান চৌধুরী     ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৪:১৬ টাprinter

শেখ হাসিনা ও রোহিঙ্গা: শুভেচ্ছা থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই

 

এই মুহূর্তে সু চি’র চেয়ে শেখ হাসিনা অনেক বেশি প্রশংসা লাভ করছেন। তবে, জাতিসংঘে দেয়া তার ভাষণের পর দেখা যাচ্ছে তিনি বহু শুভেচ্ছা জড় করতে সমর্থ হলেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন তা তিনি হাসিল করতে পারেননি। তার পাঁচ-দফা পরিকল্পনা অনেকটা ‘ন্যায়পরায়ণ’ বিশ্বের কাছে একধরনের আবেদনের মতো, বাস্তবিকপক্ষে বিশ্ব অত্যন্ত তাচ্ছিল্যপূর্ণ। তার জন্য দুঃখজনক বিষয় হলো বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না এবং সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারকে ‘মানবিক’ ধরনের কিছু করতে চাপ প্রয়োগের ব্যাপারে কেউ আগ্রহী নয়। মিয়ানমারে যারা এসব খেলা খেলছেন সেই কলুষিত আইকন ও সেনাবাহিনীর পুতুল সু চি এবং জেনারেলদের জন্য নি:সন্দেহে এটা প্রথম রাউন্ড।


শরণার্থী ইস্যুতে হাসিনা ও সু চির মধ্যে পার্থক্য হলো মিয়ানমার নেতার বাছবিচারের ক্ষমতা পুতুলের সমান, অন্যদিকে বাংলাদেশ নেতাও তা করতে বাধ্য হচ্ছেন। হাসিনার প্রস্তাবগুলোতে বৈশ্বিক ক্ষমতাহীন এক নেতার অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। তিনি যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছেন তার একটির সমাধানও তার হাতে নেই এবং এর সবগুলোর সমাধান সু চি ও তার জেনারেলদের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে। ফলে প্রস্তুাবগুলো দিয়ে হাসিনা তাদের ওপরেও নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।


এই পরিস্থিতি তার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হবে বলে বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনীতিক কখনো ভাবেননি। ১৯৭০’র দশকে এই সমস্যা সৃষ্টির পর থেকে একের পর এক সরকারের ব্যর্থতায় এখন তিনি এই পরিস্থিতি’কে কাজে লাগাচ্ছেন। আমলাতন্ত্র কখনো রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে এভাবে এগিয়ে যেতে দিতে সক্রিয় হওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ বোধ করেনি।

 
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পেশ করা পাঁচ-দফার শুধু একটিকে বাস্তব কর্ম বলা যায়, তা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি ‘নিরাপদ এলাকা’ সৃষ্টির  পরিকল্পনা গ্রহণ। মিয়ানমার সরকার এরই মধ্যে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্য প্রস্তাবগুলো আমলেই নেয়া হয়নি। বাকিগুলো বিবেচনার মানে হলো মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে ও নৃশংসতা চালাচ্ছে বলে স্বীকার করে নেয়া। চূড়ান্ত বিবেচনায় এসব প্রস্তাব অবাস্তব, কারণ এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক শুভেচ্ছা নয়। এই সদিচ্ছাই এখানে অনুপস্থিত।


বাংলাদেশের মধ্যেই অসঙ্গতি: নিজের অসঙ্গতির মধ্যেই আটকা পড়েছে বাংলাদেশ। অন্য শরণার্থী গ্রুপগুলোর মতো রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশীরা পছন্দ করে না। বর্তমান সহানুভুতি সৃষ্টির পেছনে দুটি উৎস কাজ করেছে। প্রথমত, রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা যে ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখিন তা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার। আর দ্বিতীয়টি, মুসলিম পরিচিতির একটি সাধারণ বোধ। এই পরিচিতির অংশটি তুচ্ছ হলেও জটিল। সরকার নয়, ইসলামপন্থী গ্রুপগুলোই একে তুলে ধরছে। ধর্মীয় পরিচিতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ব্যাপারে সরকার সতর্ক। কারণ, এর জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।


কিন্তু, সীমান্তবর্তী জেলার যেসব এলাকায় শরণার্থীরা এসে ভীড় করছে সেখানে বসবাসরত মানুষের মধ্যে সহানুভুতি অনেক কম। সেখানে জনমনে ক্ষোভ তুঙ্গে। প্রথম দিকে তারা এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কথা বললেও এখন চুপ করে গেছেন। কারণ, তাদের বক্তব্যকে ‘অমানবিক’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হতে পারে। আর এটাই এখন সরকারের অবস্থান। কিন্তু শরণার্থী নিয়ে ক্লান্তি সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী এবং তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।


সরকারের বাস্তবতা হচ্ছে যে তারা সর্বশেষ এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমণ কখনো প্রত্যাশা করেনি এবং কোন প্রস্তুতি না থাকায় সহজে প্রভাবিত হয়ে পড়ছে। ১৯৭২ সালের পর থেকে মিয়ানমার এ নিয়ে তৃতীয় বা চতুর্থবারের মতো রোহিঙ্গা খেদাও অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিবারই আগত শরণার্থী সংখ্যা আগের তুলনায় বড় হয়েছে। যারা বলছে যে এমনটা তারা দেখেনি তারা আসলে অস্বীকার করছে। এভাবে উদ্বাস্তুদের আগমন কেন গত কয়েক দশক ধরে কর্তৃপক্ষের নজরে আসেনি তা একটি রহস্যজনক বিষয়। এমনকি এখনো, সরকার ও তার বন্ধুদের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে’। কিন্তু, কিভাবে নেবে সেই কথা কেউ বলছে না।


কর্তৃপক্ষগুলো একটি ‘মানবিক’ ভাবমূর্তি তুলে ধরা ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনার কার্যকর বাস্তবতা যাচাই যা খুব ভালো দেখায় না – এ দু’য়ের মাঝে আটকা পড়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর সাহসী বক্তব্য ‘আমরা যদি ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারি তাহলে ৭ লাখকেও খাওয়াতে পারবো’ অনেকের প্রশংসা কুঁড়িয়েছে, কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল পুষতে পারবে না এটাও বাস্তব সত্য।


বন্ধুত্ব সম্পর্কে বুঝের অভাব: রেকর্ড ঘাটলে দেখা যাবে, এই সংকট আন্তর্জাতিকভাবে মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশের যে পর্যায়ের কূটনৈতিক দক্ষতা দেখানোর প্রয়োজন ছিলো তা তারা দেখাতে পারেনি। বাংলাদেশের দুই প্রধান মিত্র ভারত ও চীনও তাকে এ ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যান করেছে। উভয় রাষ্ট্রের অবস্থানের ব্যাপারে সরকারি মহলের নীরবতা বোধগম্য হলেও বিষ্ময়কর। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ‘সমর্থন’ ব্যক্ত করে যে বিবৃতি দিয়েছেন তাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দফতর থেকে একটি বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু এতে ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতরে বাংলাদেশের অবস্থানটি যে কি তা ভালোভাবে বুঝা গেছে। মিয়ানমারের ব্যাপারে ভারতের অবস্থান নিয়ে সেখানকার পররাষ্ট্র দফতর থেকে কোন আভাস আদায় করতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ, বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার সবচেয়ে ঘনিষ্ট প্রতিবেশী সর্বক্ষেত্রে এই সুবিধা ভোগ করছে। অন্যদিকে চীন নীরব থেকে প্রমাণ করেছে বাংলাদেশীদের চোখে তার ‘বন্ধু’ হওয়ার আসলেই কোন প্রয়োজন নেই।


দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে তুচ্ছজ্ঞান করার কারণে বাংলাদেশ আসলেই সঠিক ভাষা খুঁজে পায়নি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব তৈরির নীতিও রক্ষা করা হয়নি। তার ওপর, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তিনি কিছু আশা করেন না। অথচ ট্রাম্প বাংলাদেশে সহায়তা পাঠাবেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র দফতর।


মোট কথা, এটা বাংলাদেশের কূটনীতির বড় কোন অধ্যায় নয়। তারা আমাদের সমস্যার ব্যাপারে বিশ^জনমত গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি নীতি-ভিত্তিক কর্মসূচি উপস্থাপন করতে পারেনি। যা খুবই প্রয়োজন ছিলো। তবে এপর্যন্ত অন্তবর্তীকালিন নীরিক্ষায় বলা যায়, সংকটের শুরু থেকে শেখ হাসিনার যে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে তা সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত এবং এই সংকট থেকে পাওয়া একমাত্র রাজনৈতিক দৈবধন বা অভাবনীয় লাভ।


-সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top