রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান | daily-sun.com

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

ডেইলি সান অনলাইন     ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৩:৫৭ টাprinter

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি  প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

 

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা আমি বুঝি, ঘরবাড়ি হারিয়ে আপনারা যারা এখানে এসেছেন তারা সাময়িক আশ্রয় পাবেন। তবে আপনারা যাতে নিজে দেশে ফেরত যেতে পারেন সে ব্যাপারে মিয়ানমারকে বলব। মঙ্গলবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।


এর আগে সকাল সোয়া ১০টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে সড়ক পথে কুতুপালংয়ের উদ্দেশে রওনা হন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।


রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক বিবেচনায় আমারা আপনাদের আশ্রয় দিয়েছি। আমরা আপনাদের পাশে থাকব। তিনি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিকভাবে জনমত গড়ে তোলারও আহ্বান জানান।


শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন আমাদের ওপর হামলা করেছিল, সেসময় আমরা ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। হানাদার বাহিনীরা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল এবং গণহারে হত্যা করেছিল। ঠিক একইভাবে মিয়ানমার সরকার রাখাইন রাজ্যে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের ওপর দমন, নিপীড়ন শুরু করেছে। সেখানে তাদের বাড়িঘড় জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও আশ্রয় দেয়া হচ্ছে। আমি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের যা করার দরকার আমরা সেটি করবো।


এ সময় রোহিঙ্গাদের যেন কোনো কষ্ট না হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন ভালো থাকে সেজন্য প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন।


টানা দু’বারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার অষ্টমবারের মতো কক্সবাজার সফর এবং তিনিই দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন। নানা কারণে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। তাই প্রধানমন্ত্রীর আগমনে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে প্রশাসন।


তার সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ভূমি প্রতিমন্ত্রী জাবেদ, চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ, হুইপ ইকবালুর রহিম, কক্সবাজারের সাংসদ সাইমুম সরোয়ার কমল, সাতকানিয়ার সাংসদ আবু রেজা নদভী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, সিনিয়র সচিব সইরা বেগম ও এহসানুল করিম।


প্রসঙ্গত, বিগত কয়েক দশকে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধদের নির্যাতন বেড়ে গেছে। সর্বশেষ ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ৩০টি পুলিশ ফাঁড়ি ও একটি সেনা ছাউনিতে ‘রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের’ হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ সদস্যসহ অন্তত ৯৬ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ৮৪ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (২৫ আগস্ট) ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)’ নামে একটি গ্রুপ হামলার দায় স্বীকার করে। এর ১৫ দিনের মাথায় গত শনিবার (৯ সেপ্টেম্বর) একতরফাভাবেই রবিবার থেকে অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেয় আরসা। যদিও আরসা’র অস্ত্রবিরতির ওই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছে সু চি’র সরকার।


আরসা’র ওই হামলার পর রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হেলিকপ্টার গানশিপের ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে। অভিযানের নামে সাধারণ মানুষের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে আগুনসহ নানা নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এতে মিয়ানমার সরকারের হিসাবে ৪ শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম নিহত হয়েছেন। ২৭ হাজারেরও বেশি ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোটিয়ার ইয়াং লি শুক্রবার (৮ সেপ্টেম্বর) বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেছেন, রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে কমপক্ষে ১ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। এদের বেশিরভাগই রোহিঙ্গা মুসলিম।


এদিকে উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে প্রতিদিন পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। কক্সবাজারে জাতিসংঘের কর্মীরা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বলেছেন, গত ১৫ দিনে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশে করেছে; যাদের অধিকাংশই অসুস্থ অথবা আহত। রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা। তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, এই সংখ্যা আরও বেশি। এছাড়াও নাফ নদীর জলসীমানা থেকে শুরু করে স্থল সীমানা পার হয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নিয়েছে আরও হাজার হাজার রোহিঙ্গা।


এছাড়া পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম রবিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজের ফেরিফাইড ফেসবুকে এক পোস্টে জানান রাখাইনে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মুসলিম রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ৭ লাখ ছাড়িয়ে। এর মধ্যে বিগত ১৫ দিনে বাংলাদেশে ৩ লাখ রোহিঙ্গা এসেছে।

 


Top