শুরুতেই হোঁচট তৃতীয় ধারার জোট গঠনে | daily-sun.com

শুরুতেই হোঁচট তৃতীয় ধারার জোট গঠনে

এনাম আবেদীন     ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৩:৪৯ টাprinter

শুরুতেই হোঁচট তৃতীয় ধারার জোট গঠনে

 

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে তৃতীয় ধারার নতুন জোট গঠনের উদ্যোগ শুরুতেই হোঁচট খেতে শুরু করেছে। কারণ জোটের নেতৃত্বে কে থাকবেন, তা নিয়ে টানাপড়েন চলার খবর পাওয়া গেছে।


সূত্র মতে, জোট গঠন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক বৈঠক ও বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা লাইমলাইটে এসেছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। আর সে কারণেই গত ২ আগস্ট রাতে অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু বিষয়টি পছন্দ হয়নি গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের। যে কারণে ২৪ আগস্ট আরেকটি উদ্যোগ নিয়ে এবং বি. চৌধুরীকে রাজি করিয়ে তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। আর এ ঘটনায় সম্ভাব্য জোটের দলগুলোর মধ্যে নানা গুঞ্জন শুরু হয়।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসংক্রান্ত যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষরের আগে বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের মধ্যে বৈঠক হয় বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের বাসায়। সেখানে খাওয়াদাওয়ার আগে যৌথ ঘোষণার একটি খসড়া বি. চৌধুরীর হাতে দেন ড. কামাল হোসেন। পরে অবশ্য ওই খসড়া সংশোধন করে আরো কিছু বাক্য যোগ করেন বি. চৌধুরী; যা তাঁরই প্রেসসচিব জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।


কিন্তু বর্ষীয়ান ওই দুই নেতার এ ধরনের ঘোষণায় বিস্মিত হন সম্ভাব্য জোটের বাকি দলগুলোর নেতারা।


কারণ যৌথ ঘোষণার ব্যাপারে তাঁরা অন্ধকারে ছিলেন। ফলে তাঁরা এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। পরে জানতে পারেন, মূলত ড. কামাল হোসেনের অনুরোধেই ঘোষণায় স্বাক্ষর করতে রাজি হন বি. চৌধুরী।
জানতে চাইলে বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক বি. চৌধুরী বলেন, ‘আসলে সিনিয়র দুই নাগরিক হিসেবে আমরা ওই যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছি। এতে কোনো অসুবিধা হবে বলে মনে করি না। আমরা যে যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি পালন করে যাব। ’ তিনি বলেন, ‘মান্না সমন্বয়ক আছেন, থাকবেন। যৌথ ঘোষণায়ও আমরা ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছি। এ নিয়ে ভুলবোঝাবুঝি ঠিক হবে না। ’


এদিকে কয়েকবার যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে। তবে তাঁর দল গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী দাবি করেন, মাহমুদুর রহমান মান্নাকে কোনো সমন্বয়ক করা হয়নি। তিনি বলেন, জোটই যেখানে গঠন হয়নি, সেখানে সমন্বয়ক কিভাবে এলো? তবে এটি ঠিক যে লেখালেখি বিষয়ে দেখভাল করার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে।


তিনি বলেন, বিষয়টা হলো, আমরা ভবিষ্যতে একটি জোট করব এবং জেলায় জেলায় যাব। এটুকু সমঝোতা হয়েছে যে আগে দুই নেতার একটি যৌথ বক্তব্য যাবে। সেটিকে কেন্দ্র করে দলগুলো সভা-সমাবেশ করবে।


পাঁচ-ছয়টি দলের সম্ভাব্য জোটের মধ্যে শুধু দুই নেতার ঐক্যের ডাক সংগত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাঁরা এই ডাক পছন্দ করবেন না, সেটি তাঁদের বিষয়। কেউ যদি মনে করেন আমিও বি. চৌধুরী বা ড. কামাল হোসেনের পজিশনে যাব, তাহলে সেটি তাঁর ব্যাপার।


মাহমুদুর রহমান মান্না এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাঁর দলের কেন্দ্রীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুই নেতার মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল— এটুকু ঠিক আছে। কিন্তু দুই নেতার ডাকের ওপর তৃতীয় ধারার জোট হবে, নাকি তৃতীয় জোটের পক্ষে ওই দুই নেতা ডাক দিলেন সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা ওই জাতীয় ঐক্যের অন্তর্গত; অথবা জাতীয় ঐক্যই আমাদের অন্তর্গত।’


জেএসডি সভাপতি আ স ম রব অবশ্য মনে করেন, বি. চৌধুরী ও কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়ায় জোটের মধ্যে কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ এ ব্যাপারে সম্ভাব্য জোটের দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছিল।


অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আ স ম রবের জেএসডি, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যসহ প্রগতিশীল আরো কয়েকটি দল নিয়ে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক জোট গঠনের চেষ্টা বহুদিন ধরে চলছে। কিন্তু রাজনৈতিক আদর্শ তথা অবস্থান; বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুই জোটের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। এ ছাড়া সম্ভাব্য ওই জোটের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে ভেতরে ভেতরে তা নিয়েও রয়েছে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ। কেননা, জোটের নেতৃত্ব যাঁর হাতে থাকবে, বড় দুই দলের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগটিও থাকবে তাঁর। আবার তৃতীয় ধারার জন্য ‘বিশেষ কোনো সুযোগ’ তৈরি হলে কিভাবে তার সুফল ঘরে তোলা যাবে তা নিয়েও দলগুলোর মধ্যে নানা আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেকের মতে, এসব কারণেই গত ছয় বছরে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও তৃতীয় ধারার ওই জোট আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।


বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবে ২০১২ সালের ২১ অক্টোবর এক মঞ্চে উঠে প্রথমবারের মতো জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেন। সে সময় আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকী ও মান্নাসহ প্রগতিশীল অনেকেই তা সমর্থনও করেছিলেন। এরপর ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই কাকরাইলের ঈশা খাঁ হোটেলে এক মতবিনিময় সভা ডেকে তৃতীয় ধারার পক্ষে সমমনা দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের একত্রিত করার চেষ্টা আবারও চালান ড. কামাল। ওই সময় প্রগতিশীল বলে পরিচিত পাঁচটি দল ছাড়াও সিপিবি-বাসদ, জাতীয় পার্টি ও সুধীসমাজের বেশ কিছু প্রতিনিধি ওই সভায় যোগ দেন। এরপর বেশ কিছুদিন এ নিয়ে নানা তৎপরতা চললেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ লাভ করেনি তৃতীয় ধারার জোট।


আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার তৃতীয়বারের মতো ওই প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।


- সূত্র: কালের কন্ঠ

 


Top