রাখাইনে নির্যাতনের শিকার ৪৯৫ হিন্দুর মানবেতর দিনযাপন | daily-sun.com

রাখাইনে নির্যাতনের শিকার ৪৯৫ হিন্দুর মানবেতর দিনযাপন

ডেইলি সান অনলাইন     ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৯:৩৩ টাprinter

রাখাইনে নির্যাতনের শিকার ৪৯৫ হিন্দুর মানবেতর দিনযাপন

 

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং এলাকার একটি ছোটখাট পরিত্যক্ত মুরগি খামারে আশ্রয় মিলেছে মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা ৪৯৫ জন হিন্দুর। এক সাথে এত বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ গাদাগাদি করেই মানবেতর দিনযাপন করছে মুরগি খামারটিতে। তারা এখানে পারছে না শুয়ে ঘুমাতে আর পারছে না রান্নাবান্না করে খেতেও। কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সাময়িক খাবারের ব্যবস্থা করলেও তাদের ঘুমানোর জায়গা মেলেনি।


কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বাবুল শর্মা জানান, পরিষদের পক্ষ থেকে তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে আশ্রয় নেয়া হিন্দুরা মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন এখানে। নেতবৃন্দ হিন্দুদের আশ্রয়স্থল পরিদর্শন  করে জানান, তাদের বসবাসের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় মানবেতর দিনযাপন করতে হচ্ছে। এছাড়া নি:স্ব হাতে সবাই আশ্রয় নেয়ায় তাদের কাপড়, থালাবাসনসহ জীবন ধারনের যা যা প্রয়োজন তার কিছু নেই।


উখিয়া কুতুপালং পশ্চিম হিন্দু পাড়ার পাশে মুরগীর খামারে আশ্রয় নেয়া মিন্টু রুদ্র জানান, মুরগীর খামারটিতে কোনরকমে ঠেসাঠেসি করে বসার জায়গা হয়েছে। টানা ৪ রাত কেউ ঘুমাতে পারেনি। এতে শিশুসহ অর্ধশত লোক অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে।


জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি এডভোকেট রনজিত দাশ  জানান, মিয়ানমার থেকে আসা হিন্দুদের জন্য পৃথক শরনার্থী শিবির করা প্রয়োজন। তাই তিনি একটি নির্ধারিত স্থানে আশ্রয় দিতে হিন্দুদের জন্য শিবির স্থাপন করার দাবি জানান।


মিয়ানমারের রাখাইনে চলমান সহিংসতায় নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনও। দেশটির সরকারি বাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন, জুলুম, নিপীড়ন, ঘর বাড়িতে আগুন, মানুষ হত্যা অব্যাহত রেখেছে।   চলমান সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছে ৮৬ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। যাদের অধিকাংশই রাখাইনের মংডুর ফকিরাবাজার গ্রামের বাসিন্দা।


গত ৩০ আগস্ট বুধবার রাতেই প্রাণ ভয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ৪১২ হিন্দু নারী-পুরুষ শিশু উখিয়ার কুতুপালং এলাকার পশ্চিম হিন্দু পাড়ায় আশ্রয়  নিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় আরো ৮৩ জন আশ্রয় নেয়। এছাড়া সীমান্তের জিরো পয়েন্ট অপেক্ষা করছে আরো শতশত হিন্দু। তারাও প্রবেশের অপেক্ষা করছে।


উখিয়ার কুতুপালং এর পশ্চিম হিন্দু পাড়া সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, ১৬০ পরিবারের ৪৯৫ জনের হিন্দু নারী-পুরুষ ও শিশু একটি পরিত্যক্ত মুরগির খামারে মানবেতর দিনযাপন করছেন। সহায় সম্বলহীন এ হিন্দু পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত খাদ্যের ব্যবস্থা পূজা উদযাপন পরিষদ থেকে করা হলেও তাদের বসবাসের কোন ব্যবস্থা না থাকায় করুণ অবস্থায় তাদের ঠেসাঠেসি করে বসে থাকতে হয়েছে। ঘুমানোর কোনও সুযোগ নেই, কোনও টয়লেট ও পানির ব্যবস্থা।


কুতুপালং ৩নং হলদিয়া পালং ইউনিয়নের  মেম্বার ও উখিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বপন শর্মা রনি জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে তারা কুতুপালং আশ্রয় নিয়েছে। তবে তাদের এখান থেকে সরিয়ে নিতে একটি গোষ্ঠী নানা ষড়যন্ত্র করছে।


আশ্রয় নেয়া হিন্দুরা জানিয়েছেন, মিয়ানমারে রাখাইনের মংডুর চিকনছড়ি,ফকিরাবাজার সহ কয়েকটি হিন্দু অধ্যূষিত গ্রামে  কিছু স্বশস্ত্র লোক তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাদের পুরো পাড়া ঘিরে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে অনেককে গুলি করে হত্যা করছে। শিশু ও নারীদেরকেও নির্যাতন করা হচ্ছে।


অনেকে পরিবার আতংকে পাহাড়, ধান ক্ষেতে ও বনজঙ্গলে পালিয়ে লুকিয়ে আছে। কিছু হিন্দু পরিবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। কিন্তু বাধা ও ভয়ের কারণে কেউ ঢুকতে পারছেনা। ক্ষুধার জ্বালায় তারা রাতের আধারে বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানান।


পালিয়ে আসা মিয়ানমারের মংডুর চিকনছড়ি গ্রামের কুলাল পাড়ার বকুল বালা জানান,  কিছু স্বশস্ত্র লোক তাদের গ্রামে ঢুকে তাদের ওপর অত্যাচার চালায়। এক পর্যায়ে তার স্বামী কালু রুদ্র,কন্যা সন্ধ্যাবালা ও নাতী বাপ্পুকে তুলে নিয়ে যায়। পরে খবর পেয়েছি  নির্যাতন চালিয়ে তাদের হত্যা করা হয়েছে। এখন এখানে মৃত স্বামীর জন্য কর্মক্রিয়া করতে সহযোগিতা পাবো কিনা তা নিয়ে চিন্তায় আছি।


উখিয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রবীন্দ্র দাশ রবি জানান, আশ্রয় নেয়া হিন্দুদের স্থায়ী শরনার্থী ক্যামপ খোলা না হলে তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত তাদের জন্য স্থায়ী সমাধান করা প্রয়োজন।

 

 


Top