আলতা ভাইয়ের পথ চেয়ে বসে আছেন সফিরন | daily-sun.com

আলতা ভাইয়ের পথ চেয়ে বসে আছেন সফিরন

ডেইলি সান অনলাইন     ২৪ আগস্ট, ২০১৭ ২০:৪০ টাprinter

আলতা ভাইয়ের পথ চেয়ে বসে আছেন সফিরন

এই বুঝি তার আলতা ভাই বাসার দুয়ারে এসে ডাকবেন সফিরন কেমন আছিস? ছোটবেলায় কলকাতার টালিগঞ্জের ১৯ নাকতলা রোডের বাড়ি থেকে বিয়ের পর নরেন্দ্রপুর কারবালা রোডের কুসুম্বা মাঝেরপাড়ার শ্বশুরবাড়ি এসেছিলেন সফিরন। বয়স প্রায় ৭০।

চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ।  আলতা ভাইয়ের পথ চেয়ে আছেন তিনি। স্বামী মহসীন মণ্ডল মারা গেছেন কয়েক বছর আগে।

 

 এখন তিন ছেলে নিয়ে সেখানেই থাকেন নায়করাজ রাজ্জাকের একমাত্র বোন সফিরন বিবি। সোমবার সন্ধ্যায় মামার মৃত্যুর খবর পেলেও তাদের মাকে এ খবর দেওয়া হয়নি বলে জানালেন আবদুল হাই মণ্ডল। গতকাল মঙ্গলবার সকালে খবর শুনে মা শুধু কাঁদছেন আর বলছেন, ’আলতা দাদা, তুমি আর আসবে না?’
আবদুল হাই মণ্ডল বলেন, মা ও রাজ্জাক মামা ছিলেন পিঠাপিঠি ভাইবোন। তাই দু’জনের মধ্যে সম্পর্কও ছিল ভালো। ছোটবেলায় তাদের বাবা-মা মারা যাওয়ার পর বড় ভাইয়ের সংসারে খুব কষ্টে মানুষ হয়েছিলেন দু’জন।

 

 

রাজ্জাক মামা পেট চালানোর জন্য ঘরে চানাচুর তৈরি করে বিক্রি করতেন।

সেইসঙ্গে তার ছিল নাটকের নেশা। টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় চলে যেতেন সিনেমায় অভিনয় করার জন্য। সেসব কথা মায়ের কাছে শুনেছি। মামা ভালো গানও করতেন। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় তার বাড়িঘর লুট হয়ে যায়। তখন মামা বাধ্য হয়ে মামি আর বড় ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। আবদুল হাই আরও বলেন, মামা খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কলকাতায় এলে আমাদের বাড়িতে আসতেন। শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। তাদের নিয়ে খুব মজা করতেন।



রাজ্জাকের স্মৃতিবিজড়িত বসতভিটা ও স্কুল :ভারতের স্বাধীনতার পর চবি্বশ পরগনা জেলার গড়িয়ার নতুনহাট থেকে দক্ষিণ কলকাতার নাকতলা অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন আকবর হোসেন মোল্লা। তার ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে ছোট ছেলে আবদুর রেজ্জাক মোল্লাই আজকের বাংলাদেশের নায়করাজ রাজ্জাক। ১৯ নাকতলা রোড, কলকাতা-৪৭ বাড়িটির বর্তমান মালিক নৃপেন্দ্রনাথ সরকার। গতকাল সকালে তিনি জানান, তার বাবা প্রয়াত প্রাণনাথ সরকার ফরিদপুরের রাজবাড়ী থেকে এসে ১৯৬৫ সালে এই বাড়িটি কিনে নেন। তখন বাড়িটি ছিল ভাঙাচোরা। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় দুষ্কৃতকারীরা বাড়ির দরজা-জানালা সব ভেঙে ফেলেছিল। আমরা সেগুলো ঠিক করি। এই বাড়িতে রাজ্জাক চানাচুরের কারখানা করেছিলেন। আর নাটকের মহড়া দিতেন।



নৃপেন্দ্রনাথ সরকার আরও বলেন, রাজ্জাক কলকাতায় এলেই এই বাড়িতে আসতেন। বাড়িটা ঘুরে দেখতেন আর চোখের জল ফেলতেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আমরা খুব কষ্ট পেয়েছি। তিনি আমাদের নিজের পরিবারের মানুষ বলে মনে করতেন।



নায়করাজের বসতভিটা থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে খানপুর স্কুল। ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত এই স্কুলটি এ এলাকার একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রধান শিক্ষক সজল কুণ্ডু বলেন, আমাদের স্কুুল থেকে রাজ্জাক ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অনুপ্রেরণায় রাজ্জাক প্রথম সরস্বতী পূজার সময় নাটক করেছিলেন। এই স্কুল থেকে পাস করার পর রাজ্জাক ভর্তি হন চারুচন্দ্র কলেজে। তিনি বলেন, তার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে স্কুলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এখন পরীক্ষা চলছে, শেষ হলে রাজ্জাককে নিয়ে স্মরণসভা করব।

খানপুর স্কুলের কর্মচারী উজ্জ্বল গায়েন এই প্রতিবেদককে স্কুলের ভর্তির নথি দেখান। এই নথির ৬০ ক্রমিক নম্বরে দেখা যাচ্ছে ১৯৫০ সালে জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখে আকবর হোসেন মোল্লা তার ছেলে আবদুর রেজ্জাক মোল্লাকে নতুনহাটের খজ মজুয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুল থেকে এনে এই স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করান। তখন তার বয়স ছিল ৭ বছর ১ মাস। জন্মসাল ১ জানুয়ারি, ১৯৪৩।



মুম্বাইয়ে পালিয়েছিল রাজ্জাক :হিটলার
রাজ্জাক ছিল আমাদের পাড়ার চকোলেট বয় চোখের পানি ফেলে গতকাল মঙ্গলবার এমনটাই বললেন নায়করাজ রাজ্জাকের বাল্যবন্ধু টি দাস ওরফে হিটলার। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হিটলার বলেন, আমরা একই স্কুলে পড়তাম। ছোটবেলা থেকে ওর উদ্যোগেই আমরা নাটক করতাম। একটা নাটকের ক্লাব বানিয়েছিল নব ঝঙ্কার নাট্য সমিতি। পাড়ার মধ্যে প্যান্ডেল খাটিয়ে টিকিট কেটে আমরা নাটক করতাম। আমরা ৬ বন্ধু ছিলাম খুব অন্তরঙ্গ। লালজি, রণেন, পিলু আর প্রদীপ। আমরা ’বিদ্রোহী’ নাটক করেছিলাম। পরে ’দুই মহল’ নামে একটি নাটক নিয়ে আমরা কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে শো করেছি।



স্মৃতিমেদুরতায় হিটলার বলেন, সব নাটকের প্যান্ডেল থেকে সব খরচ ওই করত। আর নাটকের পর যথারীতি পাওনাদাররা ওর বাড়িতে গিয়ে হামলা করত। একবার হিরো হবে বলে ও ১৯৫৬ সালে পালিয়ে গেল মুম্বাইয়ে; আবার ফিরেও এলো। বাড়ির লোক তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দিল লক্ষ্মীর সঙ্গে। ও খুব কষ্ট করেছে এক ছেলে নিয়ে, দিনের পর দিন। টালিগঞ্জে অভিনয় করেছিল, তবে সাইড রোলে।



রাজ্জাকের কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়াটা আজও মেনে নিতে পারেন না তিনি। হিটলার বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য, ১৯৬৪’র দাঙ্গায় ওকে মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে হলো। ওকে রাখতে পারলাম না।

শারীরিক সৌন্দর্যের কারণে রাজ্জাক ছিলেন পাড়ার মেয়েদের হিরো এমনটা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ও ছিল আমাদের চকোলেট বয়। পাড়ার সব বাড়িতে ছিল ওর অবারিত দ্বার। আমাদের বাড়ি হিন্দু রক্ষণশীল পরিবার হলেও রাজ্জাক ঠাকুরঘরে ঢুকতে পারত। শুধু তাই নয়; আমার দিদিমা মরে যাওয়ার পর ও কাঁধে করে শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিল।


Top