সিনহা বনাম হাসিনা: যে যুদ্ধ এসেছে শূন্য থেকে | daily-sun.com

সিনহা বনাম হাসিনা: যে যুদ্ধ এসেছে শূন্য থেকে

আফসান চৌধুরী     ২৪ আগস্ট, ২০১৭ ১৩:৪৪ টাprinter

সিনহা বনাম হাসিনা: যে যুদ্ধ এসেছে শূন্য থেকে

 

সংবিধানবিষয়ক একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ বেঁধে যাবে, এমনটা কেউ প্রত্যাশা করেনি। কিন্তু যুদ্ধ লেগেছে এবং রাজনীতিবিদ, আইনজীবী এবং সাবেক বিচারপতি- সবাই তুমুলভাবে মিডিয়ায় কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। সবাই যে মূল বিষয়টির পরোয়া করে বা বোঝে তেমন নয়, তবে যে দেশে হিংস্রতা মেশানো ভাষায় রাজনৈতিক বাক্যবাণ ছোঁড়া হয়, সেখানে এটা সত্যিই অস্বাভাবিক ঘটনা।


রাজনৈতিক শ্রেণীর সব সদস্যই এতে অংশ নিচ্ছে, তবে প্রধান দুই খেলোয়াড় হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান এবং তার বিরুদ্ধে অবস্থান করছেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, যিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান।


পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপটে তীব্র বিষোদগার আর সমালোচনার ঝড় আঘাত হানায় যুদ্ধটি অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়েছে। সরকার, এমপি আর রাজনীতিবিদেরা সবাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হলেও প্রধান বিচারপতির সত্যিকার অর্থে কোনো সমর্থক গোষ্ঠী নেই। তবে তিনি যে কায়দায় আক্রমণ করে যাচ্ছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে, তার মনোবল বা শক্তি- কোনোটারই অভাব নেই। তিনি ভয় পাননি, অনিবার্য সঙ্ঘাতের পথে চলতে মনে হচ্ছে পিছুপা হননি।


ষোড়শ সংশোধনীর আপিল বাতিল রায়টি আইন পরিষদকে ভয়াবহভাবে ক্ষুব্ধ করেছে এবং সরকারের, বিশেষ করে মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত আইনমন্ত্রীর আইনগত ও আইনি-সংশ্লিষ্টতাহীন কিছু বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে এগুলো আইন ও সাংবিধানিক ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত এবং কোনো বিচারককে অপসারণে পার্লামেন্টের ক্ষমতার ইস্যুটির সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিষয়টি সবার জন্য ছিল না। এমপিরা বলছেন, বিচারককে অপসারণে জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা নস্যাৎ করেছে এবং তা-ই এর মাধ্যমে আসলে জনগণের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।


সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক এই দলে যোগ দিয়ে বলেছেন, এর ফলে ‘জনগণের প্রজাতন্ত্র’ থেকে ‘বিচারকদের প্রজাতন্ত্র’ হয়ে পড়বে বাংলাদেশ। তবে তিনি বর্তমানে আইন কমিশনের প্রধান হওয়ায় তার এই বিতর্কে যোগদানের ফলে এটি আইনগত অবস্থান থেকে সরে গিয়ে রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।


এদিকে কট্টরপন্থীরা লাগাম ছিনিয়ে নেওয়ায় আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থীরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন এবং হুমকি ও পাল্টা হুমকি ক্রমাগত মাত্রা ছাড়ানো শব্দে ফেটে পড়ছে।


তাদের আক্রমণের শিকার কিন্তু রায়টি নয়, বরং প্রধান বিচারপতি যেসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সেগুলো। আওয়ামী লীগকে একটি মন্তব্য খুবই উত্তেজিত করেছে। তা হলো, কেবল এক ব্যক্তি একটি জাতি গঠনের দায়িত্ব নিতে পারেন না। আওয়ামী লীগ এর ব্যাখ্যা করে এভাবে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার কৃত্বিত্ব শেখ মুজিবর রহমানের (তিনি শেখ হাসিনার পিতাও), পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী তিনি ‘জাতির পিতা’ এবং সেইসূত্রে তার মর্যাদার সমকক্ষ কেউ নয়। এর মাধ্যমে কার্যত কৃতিত্বটি একা তাকে দেওয়া হয়েছে।


প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় দ্রুত ও তীব্র, সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় জাতির পিতাকে অপমান করার। এটা একটা স্পর্শকাতর বিষয়। কারণ প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও দাবি করে, তাদের নেতা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগের উদ্বেগ হলো, পর্যবেক্ষণটি স্বাধীনতার কৃতিত্ব ভাগাভাগি করার সামিল।


সমালোচনা বেগবান হতে থাকায় ষোড়শ সংশোধনী অনেকটাই বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায় এবং বিচারপতি সিনহাকে রাজনীতি করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। তাকে পাকিস্তানপন্থী হিসেবেও অভিযুক্ত করা হয়। কারণ তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনুগত বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে সিনহা বলেছেন, তিনি রাতের বেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য সরবরাহ করতেন। এটা সত্যিকার অর্থে অনেকের বেলায় প্রযোজ্য, অনেকেই এমন কাজ করেছেন।

এদিকে সিনহা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের ধৈর্য শেষ হয়ে আসছে। তিনি পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার উদাহরণ টেনে বলেন, তারা সংযম প্রদর্শন করছেন। তার এই মন্তব্যটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য খুবই দরকারি হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, এ ধরনের মন্তব্য করার আগে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, কোনো হুমকিকেই তিনি পরোয়া করেন না। তিনি বলেন, ‘এটা পাকিস্তান নয়।’

আওয়ামী লীগ নেতা হাসান মাহমুদ আবার মন্তব্য করেছেন, সিনহাকে বিচারপতি করার একমাত্র কারণ ছিল তিনি ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং আদিবাসী ব্যক্তি হওয়া। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন, সিনহাকে যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচারপতি করা হয়নি। তার পদত্যাগের দাবি অব্যাহতভাবে জানানো হচ্ছে। রায়ের ইস্যুটি নিয়ে রাষ্ট্রপতির সাথেও কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। মিডিয়া সূত্রের খবর, আওয়ামী লীগ সরকার তার অপসারণের যে প্রবল দাবি জানাচ্ছে, তার সাথে একমত নন রাষ্ট্রপতি।


বিরোধী দল রাষ্ট্রের সরকারি মহলের যুদ্ধের ছায়ায় রয়েছে, তারা কেবল শুনেই যাচ্ছে। বিচারপতি সিনহা যতটা সরকারকে চাপে ফেলেছেন, বিরোধী দল বিএনপি কখনো ততটা পারেনি। তার রায় এবং পর্যবেক্ষণ এমনভাবে আওয়ামী লীগ সরকারকে ঝাঁকি দিয়েছে, তা গত এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটিকে কোনো রাজনৈতিক দল দিতে পারেনি।


এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল এবং সংস্কৃতির দুর্বলতাই প্রকট করেছে। সিনহার পর্যবেক্ষণে বিএনপির শাসনকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করায় যেকোনো দিক থেকেই অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হতে পারে বলেও এতে প্রতীয়মান হয়েছে।


আর সিনহার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কারণ তিনি এ যাবতকালের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তার পর্যবেক্ষণগুলো ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ থাকলেও এবং রূঢ়তার পরিভাষায় নমনীয় করা হলেও তিনি একগুঁয়ে ও নির্ভীক ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, তার একক রক্ষাকর্তার ভাবমূর্তিটির জনপ্রিয় মূল্য রয়েছে। আর এটাই আওয়ামী লীগকে বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।


সরকার যদি প্রধান বিচারপতিকে বরখাস্ত করে, তা জনপ্রিয়তা পাবে না। সেটা বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা হিসেবে বিবেচিত হবে, কোনো দলই ২০১৮ সালে নির্বাচন হোক তা চাইবে না। আর প্রধান বিচারপতি যদি কিছু করেন, সরকারকে বরখাস্ত করেন, তবে কী ঘটতে পারে তা কেউ জানে না। অর্থাৎ ঝামেলা মাত্র জট পাকাতে শুরু করেছে।


১৯৭২ সালের পর থেকে তিনবার ক্ষমতা দখল করা ঐতিহ্যবাহী সেনাবাহিনীর পর ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে এখন বিচার বিভাগ হুমকিতে পরিণত হয়েছে। কেউ জানে না কী ঘটতে পারে। তবে প্রত্যেকেই জানে, রাজনীতি যখন আইনের শাসনহীন অবস্থায় সাগরে সাঁতার কাটে, তখন আইন নিজেই প্রাণঘাতী মাছে পরিণত হতে পারে।


-সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর ডট কম

 


Top