সেই ‘জজ মিয়া’ এখন ট্যাক্সিচালক! | daily-sun.com

সেই ‘জজ মিয়া’ এখন ট্যাক্সিচালক!

ডেইলি সান অনলাইন     ২৩ আগস্ট, ২০১৭ ১৪:০৪ টাprinter

সেই ‘জজ মিয়া’ এখন ট্যাক্সিচালক!

 

মনে পড়ে সেই জজ মিয়াকে?  যিনি ২০০৪ সালের বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা নিয়ে সাজানো নাটকের মূল চরিত্র ছিল। নোয়াখালীর আলোচিত সেই জজ মিয়া আজ সর্বহারা। নোয়াখালীর সেনবাগ কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট গ্রামের টেন্ডল বাড়ির জালাল আহমদ জজ মিয়া দীর্ঘ কারাভোগের পর ছাড়া পেয়েছেন। মা আর ছোট বোনকে নিয়ে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় এক বস্তিতে বসবাস করছেন তিনি। বাঁচার তাগিদে এখন ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার সেই কথিত ‘প্রধান আসামি’ জজ মিয়া।

 

জানা যায়, মাস ৩ আগে তিনি বসবাস করতেন রাজধানীর কদমতলী থানার রায়েরবাগ এলাকায়। কিন্তু সেই এলাকার মানুষ তাকে ‘জজ মিয়া’ হিসাবে চিনে ফেলায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো। ফলে তিনি বাসা পরিবর্তন করে বর্তমান ঠিকানায় চলে এসেছেন।

 

এ ব্যাপারে ক্ষোভের সঙ্গে জজ মিয়া বলেন, ‘আমি জজ মিয়া নই’। আমি জালাল উদ্দীন। ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে বলেন, দেখুন আমার ভোটার আইডি কার্ডে জালাল উদ্দীন নাম।

এদিকে ২১ আগস্ট এলে অনেকের মনেই নতুন করে মাথাচাড়া দেয় অনেক প্রশ্ন। তিনি এখন কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কী করছেন?

 

তার উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহ ভালোই রাখছে। সৌজন্যতার খাতিরে এতটুকু বলে নিজেই যেন আবার নিজের কথা ফিরিয়ে নিলেন। বললেন, খুব বেশি ভালো নাই, ভাই। আপনারা ছাড়া কেউ আর খোঁজ-খবর নেয় না। সরকার আমার জন্য কিছু করেনি। এখন ভাড়ায় গাড়ি চালাই। বাজার খারাপ। কয় টাকা আর ইনকাম। তার ওপর মা অসুস্থ। ওষুধের ওপরেই বেঁচে আছেন। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা-পয়সা লাগছে। সেই ঘটনার পরে তার জীবনে যে দুর্বিষহ দিন নেমে এসেছিল তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বলেন, আমাকে তো আর কেউ সেই জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না। ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের শীর্ষ পর্যায় থেকে ঘাতকদের রক্ষা করতে আমাকে ‘জজ মিয়া’ বানানো হয়।

 

তিনি বলেন, আমি বর্তমানে কিস্তিতে একটি পুরনো প্রাইভেটকার কিনে নিজেই ড্রাইভিং করে সংসার চালাই। নামের কারণে আমি সবার কাছে হাসি-তামাশার পাত্র। তাই আমার কাছে কেউ মেয়ে বিয়ে দিতেও চায় না। বছর দুই আগে চাঁদপুরে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের কিছু দিন পরে আমার স্ত্রী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন যখন জানতে পারেন আমিই সেই ‘জজ মিয়া’ তখন আমার স্ত্রীও আমাকে ছেড়ে চলে যায়। তিনি আরো বলেন, সত্যি কোনো দিনই চাপা থাকে না। যারা আমাকে আসামি করেছিল তারাই এখন সত্যিকারের আসামি হয়েছে। আল্লাহ্ তাদের বিচার করছে।

 

২০০৫ সালের ৯ জুন গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের একটি চায়ের দোকান থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় সেনবাগ থানায়। সেখানে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ভিডিও চিত্র দেখিয়ে বলেন, তুই এই ভিডিও ভালোভাবে দেখ। আমরা যাদের নাম বলবো সেই সবের নাম মুখস্থ করে আদালতে বলবি তাদের নির্দেশে তুই এই হামলা চালিয়েছিস। যদি না বলিস তা হলে তোকে ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়া হবে। তোর পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা হবে। আর বললে তোর পরিবারকে মাসোহারা দেওয়া হবে, তোর ভাই-বোনদের চাকরি দেওয়া হবে, জেল থেকে বের করে তোকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এভাবে আমাকে একটানা ৪ বছর ২৬ দিন হাতে-পায়ে বেড়ি পরা অবস্থায় কনডেম সেলের অন্ধকার কুঠুরিতে থাকতে হয়েছিল।

 

অপরদিকে সারা দেশে জজ মিয়া আলোচিত হলেও এলাকায় বা আত্মীয়স্বজনদের কেউই তার পরিবারের খোঁজখবর জানেন না। বীরকোট গ্রামের মৃত আবদুর রশিদ ও জোবেদা খাতুনের ৪ ছেলে ১ মেয়ের মধ্যে জজ মিয়া দ্বিতীয়। প্রায় একযুগ আগে তার বাবা মারা যাওয়ার পর সামান্য পুুঁজি নিয়ে ঢাকার মতিঝিলে ফলের ব্যবসা করতেন জজ মিয়া। ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ৯ মাস পর সেনবাগ থানার এএসআই কবির হোসেন গ্রাম পুলিশ মোকছুদ মিয়ার সহায়তায় বীরকোট গ্রামের রাজামিয়ার চা দোকান থেকে গ্রেপ্তার করে জজ মিয়াকে। পরে থানা থেকে জজ মিয়াকে সিআইডির এএসপি আবদুর রশিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর কয়েক দিনের মাথায় জজ মিয়া ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় জড়িত বলে স্বীকারোক্তির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নানা নাটকীয়তার পর ২০০৮ সালের ১১ই জুন আদালতে সিআইডির দাখিল করা চার্জশিটে ২২ জনকে আসামি করা হলে অব্যাহতি দেয়া হয় জজ মিয়াকে।

 

তখন জজ মিয়া মুক্তির বিষয়টি আটকে যায় ঢাকার সূত্রাপুর থানায় বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা (১০৮, তাং- ২৭-১২-৯৮) মামলায়। এ মামলায় কোনদিন জজ মিয়াকে আদালতে হাজির না করা হলেও ২০০৫ সালের ২রা নভেম্বর আদালত তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দীর্ঘ তদন্তের পর সিআইডি’র পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল জজ মিয়া ওই হামলায় জড়িত। যদিও তখনই এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বিভিন্ন মহলে। এর পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তদন্তের মূল রহস্য বেরিয়ে আসে।

 

মামলা ভিন্নখাতে নেয়ার অভিযোগে তৎকালীন সিআইডির তিন তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি আবদুর রশিদ, এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান ও বিশেষ পুলিশ সুপার মো. রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে সরকার মামলা করে। সেই সময়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের সঙ্গে অভিযুক্ত করা হয় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে।

 

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে জজ মিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশ চার্জশিট দিলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার সময়ে তদন্ত শেষে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয় জজ মিয়াকে। দীর্ঘ ৪ বছর ২ মাস ২৫ দিন কারাভোগের পর ২০০৯ সালের ২০শে জুলাই কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জজ মিয়া। কারামুক্তির পর ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে বীরকোট তার পৈতৃক বাড়িতে এসে আত্মীয়দের ঘরে উঠেন জজ মিয়া। কারণ মামলার ব্যয় বহন করতে গিয়ে ভিটেমাটিসহ সবকিছুই হারাতে হয়েছে জজ মিয়ার পরিবারকে।

গত ২০শে আগস্ট রোববার জজ মিয়ার পৈত্রিক নিবাস বীরকোট গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিক্রীত বসতঘরের দরজায় তালা ঝুলছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জজ মিয়া জেলে থাকা অবস্থায় তার পরিবার বসতবাড়ির জায়গাটুকু তার জেঠাত ভাই রফিক উল্যার কাছে বিক্রি করে দেয়।

 

জজ মিয়ার মামলার সাক্ষী বীরকোট গ্রামের সাবেক মেম্বার বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তাফা চৌধুরী জানান, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় জড়ানো জজ মিয়া ঘটনার দিন ও সময়ে তার বাড়ির পাশে বাবুলের দোকানে আমাদের সঙ্গে বসে চা খেতে খেতে টেলিভিশনের পর্দায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ঘটে যাওয়া গ্রেনেড হামলার দৃশ্য দেখছিলেন। কিন্তু গ্রেনেড হামলা মামলায় তাকে জড়িয়ে তার পরিবারটিকে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। এর পর কেউই তার খোঁজখবর রাখেননি। তার মা জোবেদা বেগমের আবেদনের প্রেক্ষিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে গত ২৫ রমজান দু’লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। জজ মিয়া ও তার পরিবারের দুঃখ-দুদর্শার কথা একে একে তুলে ধরলেন চায়ের দোকানদার বাবুল মিয়া, রাজা মিয়াসহ এলাকার শত শত নারী পুরুষ।

 

এক আত্মীয়ের ফোনে জজ মিয়ার মাতা জোবেদা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, আমার নিরপরাধ ছেলেটিকে ধরে নিয়ে কত নাটক সাজাইছে। আমার পুরো পরিবারটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বাড়িঘর বিক্রি করে দিতে হয়েছে। জোট সরকারের আমলে সর্বস্বান্ত হয়ে বর্তমান সরকারের নিকট একটু মাথা গোঁজার জায়গার জন্য বহু আবেদন করেছি। না পেয়ে বর্তমানে বস্তিতে বসবাস করছি। ছেলের ভবিষ্যৎ পথ চলা ও নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করলেন মা জোবেদা।

 

এদিকে বহুল আলোচিত জজ মিয়ার সঙ্গে আলাপ করলে তিনি জানান, আমাকে নিয়ে সিআইডির নাটকের কথা এদেশের মানুষ জানেন। মিথ্যা মামলায় পড়ে আমার জীবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো চলে গেছে বলে হুঁ হুঁ করে কেঁদে ফেললেন জজ মিয়া। তিনি বলেন, আমি কখনো কোন রাজনীতি বা দলাদলিতে ছিলাম না। টুকিটাকি ব্যবসা করে কোনো রকম পরিবার পরিজন নিয়ে চলতাম। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সিআইডি কর্মকর্তাদের সাজানো মামলায় আমাকে বলি করা হয়েছে। তাদের নাটকের বলি হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর বর্তমানে আমি নিঃস্ব। সরকারের কাছ থেকে একটু মাথা গোঁজার জায়গা ও জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি চাকরি পেলে সংসার জীবনে পদার্পণ করে সুখী জীবন যাপন করতে পারবো।

 

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে সেই গ্রেনেড হামলায় দলটির মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন আওয়ামী লীগ সভাপতি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ চার শতাধিক নেতাকর্মী। জজ মিয়ার প্রত্যাশা- এ ঘটনায় জড়িত প্রকৃত দোষীদের যেন বিচার হয়। তিনি বলেন, এ ঘটনা তো আমার জীবন লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছেই। কিন্তু এতে অনেকেই নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন। আমি চাই, এর জন্য যারা দায়ী তাদের যেন বিচার হয়।

 


Top