‘মাছের ঝোল’ খেয়ে বাঙালির রসনা তৃপ্তি হবে তো? | daily-sun.com

‘মাছের ঝোল’ খেয়ে বাঙালির রসনা তৃপ্তি হবে তো?

ডেইলি সান অনলাইন     ২২ আগস্ট, ২০১৭ ১৬:২৩ টাprinter

‘মাছের ঝোল’ খেয়ে বাঙালির রসনা তৃপ্তি হবে তো?

সর্ষেবাটা হোক বা জিরে ফোড়ন, আলু-ফুলকপি কিংবা বড়ি-বেগুন, বাঙালির পাতে মাছের ঝোল পড়লেই হল। দিব্যি চেটেপুটে খেয়ে নেবে।

অথচ এমন খাদ্যরসিক বাঙালিই নাকি এতদিন কোনও ফুড-মুভি বানিয়ে উঠতে পারেনি। ফুড-মুভি মানে, যেখানে চিত্রনাট্যে খাবার একটা বড় চরিত্র। যেখানে আর পাঁচটা চরিত্রের মতোই কথা বলে খাবারও। পরদা থেকে দর্শককে চোখ সরতে দেয় না। যেখানে খাবারই হয়ে ওঠে আসল ‘স্পেক্টাক্‌ল’।  

 

বিদেশে এমন ছবির সংখ্যা অগুনতি। তবে ভারতে এই প্রথম বলা যেতে পারে। শর্ট ফিল্ম দু’-একটা হলেও এই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি বানালেন প্রতীম ডি গুপ্ত। পরিচালক নিজেও খাদ্যরসিক।

তাই খাবার নিয়ে ছবি যে যথেষ্ট মন দিয়ে বানাবেন, তেমনই আশা করা গিয়েছিল।

 

খুব একটা নিরাশ করেননি পরিচালক। ঝকঝকে ছবি বানিয়েছেন। গল্প কিন্তু একই গতে বাঁধা। বাঙালি ছেলে বাবার চাপে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু একঘেয়ে চাকরি করতে না পেরে ঘর এবং দেশছাড়া। অনেক বছর পর সে প্যারিসের মাস্টারশেফ। তার বিশ্বজোড়া খ্যাতি। ফরাসি গার্লফ্রেন্ড। কিন্তু জীবনে কোথাও যেন একটা শূন্যতা রয়ে গিয়েছে। হঠাৎই অসুস্থ মায়ের খবর পেয়ে দেশে ফেরা। খাবারের হাত ধরে নস্ট্যালজিয়ায় ডুব, অতীতের সঙ্গে ফের যোগাযোগ এবং সব শেষে বর্তমানে তৃপ্তি পাওয়া। গল্পে নতুন কিছু নেই। কিন্তু ফিল্মমেকিংয়ে যেন একটা টাটকা স্বাদ রয়েছে। মানে পুরনো রেসিপি ঠিকই। কিন্তু উপকরণগুলো রেফ্রিজারেটরে রাখা বাসি-পচা নয়। একদম সকাল সকাল বাজার থেকে কেনা তাজা মালমশলা বলা যেতে পারে।

 

ফুড-মুভির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফুড-সিনেম্যাটোগ্রাফি। কীভাবে খাবার রান্না করা পরদায় দেখানো হচ্ছে, সেটাই দর্শকের মন পাওয়ার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি। এই ছবিতে যে ধরনের শট ব্যবহার হয়েছে, তা নতুন নয়। যাঁরা ফুড বা লাইফস্টাইল চ্যানেলগুলোয় সম্প্রচারিত হওয়া বিভিন্ন ফুড রিয়্যালিটি শো রোজ গোগ্রাসে গেলেন, তাঁরা এমন অনেক দৃশ্য হয়তো ওপেনিং ক্রেডিট্‌সে দেখে ফেলেছেন। ক্লোজ আপ শটে মশলা, তেল গরম হওয়া, কড়াইয়ে মাছ পড়া, কড়াইশুঁটি গড়িয়ে যাওয়া, কোনওটাই নতুন নয়। সব দৃশ্যই চেনা। কিন্তু ফুড-মুভির মজাটা ওখানেই। দৃশ্য যতই চেনা হোক, ভালভাবে শ্যুট হলে জিভ থেকে জল পড়বেই!

 

ছবিতে মুখ্য চরিত্র (দেবদত্ত বা দেব ডি) অভিনয় করেছেন ঋত্বিক। তাঁর অভিনয় নিয়ে নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। বিশ্বখ্যাত মাস্টারশেফের চালচলন যেমন হওয়া উচিত, তিনি সেটা অনায়াসে রপ্ত করে ফেলেছেন। দেব ডি’র ফরাসি প্রেমিকা সিমের ভূমিকায় ক্লাইয়া ব্লুকসাজ’ও ভাল। অল্প সময় পরদায় দেখা গেলেও মন ছুঁয়ে যাবে তাঁর অভিনয়। মায়ের ভূমিকায় মমতাশঙ্কর। ছেলেকে তার সেরা মাছের ঝোলটা রাঁধতে সে-ই বাধ্য করবে।

 

 অভিমানী অথচ প্র্যাক্টিক্যাল মায়ের চরিত্রে মমতাশঙ্করকে ভাল লাগবে। পরদায় অনেকটা সময় জুড়ে রয়েছেন শৌরসেনী। তিনি দেব ডি’র জুনিয়র শেফ ম্যাগির চরিত্র। শৌরসেনীর অভিনয় যেন এই ছবির মতোই ঝকঝকে। তবে একটু বেশিই। বেশ কিছু সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি তাঁর রপ্ত করতে এখনও সময় লাগবে। অবশ্য ভবিষ্যতে যে তাঁর অভিনয় আরও পোক্ত হবে, সেই সম্ভাবনা দেখা যায়। দেব ডি’র প্রাক্তন স্ত্রীয়ের ভূমিকায় পাওলি দাম। পাওলিকে এবার একটু সিরিয়াস চরিত্র ছেড়ে হাসিখুশি চরিত্রে দেখতে পেলে ভাল লাগবে।

 

ছবির চিত্রনাট্য বেশ স্মার্ট। ফুড-মুভি যখন, প্যারিসকেও জুড়ে দিয়েছেন পরিচালক। কিন্তু সেই শহরটাকে আরেকটু এক্সপ্লোর করলে ভাল লাগত। যদিও গল্পে তার সুযোগ তেমন ছিল না। কারণ এটা মূলত ঘরে ফেরার গল্প। সেখানে কিছু কিছু প্লট পয়েন্ট বেশ ভাল। ফুড রিয়্যালিটি শো’য়ের মতোই এখানেও, সব শেফদের মধ্যে একই উপকরণ দিয়ে অন্য অন্য খাবার বানানো নিয়ে প্রতিযোগিতার একটা পর্ব রয়েছে। শুধু পাঁচতারা হোটেলের কিচেনে পড়ে না থেকে পরিচালক তাঁর ক্যামেরাম্যানকে মাছের বাজার, সব্জির বাজারের মতো জায়গাগুলোতে নিয়ে গিয়েছেন। সম্পাদনাও টানটান। কোথাও খুব একটা দীর্ঘ মনে হয়নি ছবিটা।

 

 অথচ পেট ভরল, মন যেন ভরল না। ঠিক যেমন মমতাশঙ্কর বারবার মাছের ঝোল খেয়ে বলছিলেন, ‘ভালই হয়েছে, কিন্তু ঠিক তেমনটা হয়নি’। গল্প নিয়ে আরেকটু সাহসী হতেই পারতেন পরিচালক। তবে শেষপাতে পরিচালকের নিজস্ব কমলালেবু-কাতলার ঝোলের রেসিপিটা যেন ডেজার্টের মতো কাজ করেছে। এই প্রথম বাঙালিকে এন্ড ক্রেডিটের শেষ পর্যন্ত হল’এ বসে থাকতে দেখা গেল।

 


Top