আমি ব্যর্থ হলে ৪০০ নারী বিচারক নিয়োগ পেতেন না: বিদায়ী সংবর্ধনায় প্রথম নারী বিচারপতি | daily-sun.com

আমি ব্যর্থ হলে ৪০০ নারী বিচারক নিয়োগ পেতেন না: বিদায়ী সংবর্ধনায় প্রথম নারী বিচারপতি

ডেইলি সান অনলাইন     ৬ জুলাই, ২০১৭ ১৫:৫৫ টাprinter

আমি ব্যর্থ হলে ৪০০ নারী বিচারক নিয়োগ পেতেন না: বিদায়ী সংবর্ধনায় প্রথম নারী বিচারপতি

 

‘প্রথম নারী বিচারক হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে হয়ত আজ বাংলাদেশের প্রায় ৪০০ নারী বিচারক নিয়োগ পেতেন না। ’ -প্রায় ৪২ বছরের বিচারক জীবনের শেষ কর্মদিবসে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা এসব কথা বলেন।


বৃহস্পতিবার (৬ জুলাই) দুপুরে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চের এই নারী বিচারপতিকে বিদায় সংবর্ধনা দেন অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। অনুষ্ঠানে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতি ছাড়াও সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের পাঁচ শতাধিক সিনিয়র ও জুনিয়র আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।


প্রথা অনুসারে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বিদায়ী বিচারপতিকে সংবর্ধনা দিয়ে থাকে। প্রধান বিচারপতির ১ নম্বর এজলাস কক্ষে আজ নাজমুন আরা সুলতানার বিদায়ী সংবর্ধনা হয়।


দেশ ও বিচার বিভাগের ইতিহাসে নাজমুন আরা সুলতানা প্রথম নারী জেলা জজ। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে হওয়া প্রথম নারী বিচারপতি।


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘আমি আমার সুদীর্ঘ বিচারিক জীবনে কখনোই জেনে-বুঝে, অবহেলা করে বা অমনোযোগী হয়ে কোনো ভুল বিচার বা অন্যায় বিচার করিনি। আমার অনেক বিচার হয়তো ভুল হয়ে গেছে। আপিলে গিয়ে হয়তো তা সংশোধিত হয়েছে।

কিন্তু সে ভুল বিচার আমি জেনে-বুঝে বা অমনোযোগী হয়ে করিনি। আমি আমার সমস্ত জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে, সবটুকু মনোযোগ দিয়ে, সমগ্র একাগ্রতা দিয়ে বিচারকাজ করে গেছি। ’


অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের পক্ষ থেকে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার বর্ণাঢ্য কর্মজীবন নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরপর সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সভাপতি জয়নুল আবেদীন এ নারী বিচারপতির বর্ণাঢ্য কর্মময়জীবন নিয়ে বক্তব্য রাখেন।


এই দু’পক্ষের বক্তব্য শেষে বিচারপতি নাজমুন আরা নিজের ৪২ বছরের বিচারিক জীবনের নানা স্মৃতি-অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘৪২ বছরের বিচারিক জীবন আজ শেষ হলো। বিচার করার কঠিন কাজ ও সীমাবদ্ধ জীবন থেকে মুক্ত হওয়ার আগ্রহ ছিল আমার। কিন্তু যতই বিদায়ের দিনটি এগিয়ে আসছিল, আগ্রহ কমে আসছিল। আজকের ক্ষণটিতে আমার কষ্ট হচ্ছে এই বিচারাঙ্গণ থেকে বিদায় নিতে। আপনাদের সবাইকে ছেড়ে যেতে। ’


তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে বিচারক বানিয়েছেন, এ দেশের প্রথম নারী বিচারক। তবে আমার বিচারক হওয়ার পেছনে আমার মরহুম আব্বার ইচ্ছা ও আম্মার প্রেরণা বড় ভূমিকা রেখেছে। ’


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘পাঁচ সন্তানকে ছোট রেখে তাঁর বাবা মারা যান। বাবার ইচ্ছা ছিল, সন্তানদের মধ্যে একজন ব্যারিস্টার হবে। কিন্তু মায়ের পক্ষে তাঁর কোনো সন্তানকে বিদেশে পাঠিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ানো সম্ভব হয়নি। আমার মনে হয়েছিল, আমার আইন পড়ার মাধ্যমে বাবার ইচ্ছা খানিকটা পূরণ হবে। ’


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, তিনি তাঁর মায়ের উৎসাহে ল কলেজে ভর্তি হন। মফস্বল শহরে ল কলেজে রাতে ক্লাস হতো। ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত নয়টার বেশি হয়ে যেত। মায়ের সাহস ও প্রেরণায় তিনি পড়া চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন।


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘ময়মনসিংহ জজ কোর্টে আমি প্রথম যেদিন আইনজীবী হিসেবে যোগদান করি, সেদিনের কথা আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। এর আগে আমি কখনো কোর্টে যাইনি। ল কলেজের অধ্যক্ষ প্রখ্যাত আইনজীবী যোগেন্দ্র নাথ দাস তাঁকে প্রথম দিন জেলা জজের এজলাসে নিয়ে বসিয়ে দিয়ে আসেন। বিচারকাজ শুরু হলে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তা শুনতে থাকেন। ওই দিনই বোধ হয় আমার মনের কোনায় ইচ্ছাটা উঁকি দিয়েছিল, আমি কি জজ হতে পারি না! কিন্তু জানলাম, জজ হতে পারি না। বাংলাদেশের নারীরা জজ হতে পারে না। ওই সময় তারা পারত না। তারা জজ হওয়ার জন্য যোগ্যই ছিল না। ’


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘ওকালতি শুরুর বছর দেড়েকের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার নারীদের বিচারক না হওয়ার বিধান তুলে নেয়। এরপর বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী বিচারক হন। ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে খুলনার জজ শিপে মুনসেফ (সহকারী জজ) হিসেবে যোগ দেন। ওই সময়ে খবরের কাগজে এটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়েছিল। প্রতিক্রিয়া দু’রকমেরই হয়েছিল। কেউ স্বাগত আবার অনেকে নাক সিঁটকেছিলেন -নারী আবার বিচারক হতে পারে না কি? নারী আবার কি বিচার করবে? কর্মক্ষেত্রেও আমি এই দু’রকমের আচরণ পেয়েছিলাম। ’


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, কারও কারও কাছ থেকে অবজ্ঞা পেলেও অনেকের কাছ থেকে ভালো আচরণ পেয়েছিলেন তিনি। সাহায্য পেয়েছিলেন। ওই উৎসাহ ও সাহায্য না পেলে হয়তো তাঁর বিচারক হিসেবে টিকে থাকাই সম্ভব হতো না।


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, দেশের নারী বিচারকেরা অনেক সময় বেশ কিছু অসুবিধা-বিপদের সম্মুখীন হন। এগুলো দূর করার দায়িত্বে ঊর্ধ্বতন যে পুরুষ বিচারক আছেন, তাঁরা অনেক সময়ই এই অসুবিধা-বিপদ বুঝতেই পারেন না। বুঝতে চান না।


নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, নারী বিচারকদের সুবিধা-অসুবিধা-বিপদ-সংকট ইত্যাদি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার জন্য ১৯৯০ সালে কিছু নারী সহকর্মীদের সহযোগিতায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ মহিলা জজ অ্যাসোসিয়েশন। এটি এখন সারা বিশ্বের নারী বিচারকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত সংগঠন।


উল্লেখ্য, বিচারপতি নাজমুন আরা ১৯৭৫ সালের ২০ ডিসেম্বর মুন্সেফ হিসেবে (সহকারী জজ) নিয়োগ পান। ওই নিয়োগের মধ্য দিয়েই তিনি দেশের প্রথম নারী বিচারক হিসেবে নাম লেখান। এরপর পদোন্নতি পেয়ে ১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর হন জেলা জজ। জেলা জজ হিসেবে যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিয়ে তিনি ২০০০ সালের ২৮ মে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।  
 

এর দুই বছর পর ২০০২ সালের ২৮ মে স্থায়ী বিচারপতি হন। ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে। এরপর শপথ নেন আপিল বিভাগের প্রথম নারী বিচারপতি হিসেবে। ছয় বছর আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর শুক্রবার তিনি অবসরে যাচ্ছেন। ওই দিন শুক্রবার হওয়ায় আগের দিন আজ বৃহস্পতিবারই ছিল তার শেষ কর্মদিবস। প্রথা অনুসারে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যার্টনি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। আজ বিকেলে জাজেস লাউঞ্জে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা তাঁকে সংবর্ধনা দেবেন।

 

আরও পড়ুন:


দেশের প্রথম নারী বিচারপতির শেষ কর্মদিবস আজ

 


Top