কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ফায়দা নিচ্ছে চাল ব্যবসায়ীরা | daily-sun.com

সরকারি মজুদে ঘাটতি ও বন্যার অজুহাত

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ফায়দা নিচ্ছে চাল ব্যবসায়ীরা

শওকত আলী     ১৩ জুন, ২০১৭ ০৯:২৬ টাprinter

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ফায়দা নিচ্ছে চাল ব্যবসায়ীরা

 

এ বছরের শুরু থেকেই চালের দাম একটু একটু করে বাড়ছিল। এখন তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ভরা মৌসুমেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম কমাচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। সরকারের চাল মজুদে ঘাটতি এবং হাওরের বন্যাকে অজুহাত বানিয়ে তারা প্রতিনিয়তই চালের দাম বাড়াচ্ছে। এ অবস্থায় বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেগ পেতে হচ্ছে সরকারকে। তবে শিগগির বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হবে এবং তাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।  

  
চালকল মালিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরে আগাম বন্যা এবং ব্লাস্ট রোগের কারণে সারা দেশেই ধানের বেশ ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে বোরো মৌসুমে ধানের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। এতে বেড়ে গেছে ধানের দাম। ধানের দাম বাড়ায় চাল উৎপাদনের খরচও বেড়েছে।  


খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, এ বছর প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২২ টাকা, আর প্রতি কেজি চাল উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৩১ টাকা। এ হিসাবে সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে ৩৪ টাকা কেজিতে সিদ্ধ চাল এবং ৩৩ টাকা কেজিতে আতপ চাল কেনার জন্য দাম নির্ধারণ করে। চালকল মালিকরা খাদ্যমন্ত্রী ও খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে মিটিং করে এই দামে সরকারকে চাল দিতে রাজি হয়।


তবে গত ৫ মে থেকে সরকার চাল সংগ্রহ করতে গেলে চালকল মালিকরা সরকারের কাছে চাল বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানায়। হঠাৎ এই অস্বীকৃতির কারণ পরিষ্কার হতেও সময় লাগেনি। সরকারের হাতে চালের মজুদ কম থাকায় ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফা করার সুযোগ নিয়েছে। এ সুযোগে তারা বাজারে চালের দাম বাড়াতে থাকে ইচ্ছামতো। দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ যে মোটা চালের ভাত খায় তা ৩৬-৩৭ টাকা থেকে বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৪৭-৪৮ টাকা কেজি দরে; যদিও এর কিছুদিন আগে মিলাররাই খাদ্যমন্ত্রীর কাছে বলেছিল বাজারে চালের সংকট দূর করতে ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির সুযোগ দিতে। তখন সরকার রাজি না হলেও চাপে পড়ে নতুন করে চিন্তা শুরু করে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার। চালের বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে খাদ্য অধিদপ্তর এনবিআরের চেয়ারম্যানকে চিঠি লিখে চাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য। তবে সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে নতুন সিদ্ধান্ত আসে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ব্যবসায়ীরা চাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাবে না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হবে।


এ সিদ্ধান্তের পর থেকেই ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে চাল বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। কারণ যত দিন পর্যন্ত সরকার চাল আমদানি করতে না পারবে তত দিন বাজারে বেশি দামেই চাল বিক্রি করা সম্ভব হবে। সে অনুযায়ীই চলছে চালের বাজার।


বাংলাদেশ অটো মেজর হাসকিং ও মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কয়েক দিন ধরেই সরকারের কাছে কয়েকটি বিষয়ে দাবি জানিয়ে আসছিলাম। আমাদের দাবি, প্রণোদনা দেওয়া এবং চাল উৎপাদনে প্রকৃত যে ব্যয় সে অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা। এ ছাড়া যেহেতু ঘাটতি রয়েছে সেটা পূরণের জন্য ব্যবসায়ীদেরও সুযোগ দেওয়ার জন্য আমরা বেশ কয়েকবার মৌখিকভাবে সরকারের কাছে আবেদন করেছিলাম। এখন সরকার যেটা ভালো মনে করবে সেটাই করবে। ’


খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, নতুন ধান ও চাল বাজারে আসার এক মাস পেরিয়ে গেলেও মাত্র ১৫ হাজার ৩৩৫ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করতে পেরেছে সরকার।  যেখানে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে আট লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের। এদিকে সরকারের খাদ্যগুদামে এক লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন চালের মজুদ রয়েছে। যা মজুদের সর্বনিম্ন পর্যায় বলে মনে করা হচ্ছে।


উল্লেখ্য, গত চার-পাঁচ বছর ধরেই ধান উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ছিল ধারাবাহিকভাবে। কিন্তু উৎপাদন বাড়লেও প্রকৃত দাম পাচ্ছিল না কৃষকরা। কারণ আমদানি করা চালে নিয়ন্ত্রণে ছিল দেশের বাজার। যে কারণে কৃষক তার উৎপাদিত ধান খরচের চেয়েও কম মূল্যে বাজারে বিক্রি করেছে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে সরকার চাল আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের চিন্তা করে। ২০১৫ সালে চাল আমদানিতে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। তার পরও চাল আমদানির পরিমাণ না কমায় পরে ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এ শুল্ক নিয়ে যাওয়া হয় ২৫ শতাংশে। সঙ্গে আরো ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি। এরপর থেকেই প্রায় বন্ধ হয়ে যায় চাল আমদানি।


এদিকে সরকার মাসখানেক ধরে বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মাঝে ভিয়েতনামের সঙ্গে সরকার চাল আমদানির জন্য চুক্তিও করেছে। ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে প্রতি টন চালের বর্তমান মূল্য ৩৮২-৪২৮ মার্কিন ডলার। এসব দেশ থেকে আমদানি করতে চাইলে সরকারকে প্রতি কেজি চালে খরচ করতে হবে ৩৫.৬৬ থেকে ৩৯.৫৩ টাকা।


ভারত থেকে চাল আমদানি করতে হলে প্রতি টনের মূল্য পড়বে ৪১০ ডলার। যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩৯৭ ডলার। পাকিস্তানের চালের দাম ৪২৩ ডলার থেকে বেড়ে টনপ্রতি ৪২৮ ডলারে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ডের চাল ৪২০ ডলার থেকে বেড়ে টনপ্রতি ৪২৮ ডলার, ভিয়েতনামে ৩৬৮ ডলার থেকে বেড়ে টনপ্রতি ৩৮২ ডলারে পৌঁছেছে। সারা বিশ্বেই চাল সংকটের কারণে গত এক সপ্তাহে চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।   অর্থাৎ বিদেশ থেকে চাল আমদানির ক্ষেত্রেও সরকার এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের আসলে সংকট নেই। তবে একটা সংকটের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে। মিডিয়ার প্রচারণা ও হাওরে আগাম বন্যার কারণে এটা হয়েছে। বাজারে এখন চালের দামও বেশ চড়া। আমরাও একটু সমস্যার মধ্যে পড়েছি। যেভাবে মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করতে চেয়েছি তা পারিনি। এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ হয়েছে। ’


তবে এই সংকট কাটাতে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বদরুল হাসান। দ্রুত এ পরিস্থিতি কেটে যাবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সংকট কাটাতে চাল আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আগামী এক মাসের মধ্যেই চাল আমদানি করতে পারব। আমদানি হয়ে গেলে আমরা আশাবাদী বাজারে চালের দাম কমে যাবে। ’


খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের খুচরা বাজারে এখন মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬-৪৮ টাকায়। যা গত বছরের এই সময়ে ছিল ৩০-৩২ টাকা। এ ছাড়া টিসিবির তথ্যানুযায়ী এক বছরে এই চালের দাম বেড়েছে ৪২ শতাংশেরও বেশি। বিগত চার-পাঁচ মাসেই কেজিতে ১০ টাকারও বেশি বেড়েছে। এ ছাড়া নাজির ও মিনিকেট ৫২-৫৮ টাকা, পাইজাম ৪৮-৫৪ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।  


চালের ওপর উচ্চহারে ট্যাক্স বসানোটা উদার আমদানি নীতির পরিপন্থী বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক ড. মোহাম্মদ ইউনুস। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে সেটা অস্বাভাবিক একটা অবস্থা। ২০০৮ সালে এ রকম হয়েছিল। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আরো আগে চাল আমদানির ওপর ট্যাক্স তুলে দেওয়া উচিত ছিল। তাহলে আজকে চালের দাম এ পর্যন্ত আসত না।


তিনি বলেন, হাওরে যে ক্ষতি হয়েছে সেটা হয়তো সামগ্রিক উৎপাদনের ১০-১২ শতাংশ। কিন্তু চাল ব্যবসায়ীরা এটাকে বানিয়ে দিয়েছে ২৫ শতাংশ। তারা সুযোগ বুুঝে চালের মজুদ বাড়িয়েছে। যেহেতু এখন চালের উৎপাদনের মূল অংশটা তাদের হাতে এবং সরকারের কাছে পর্যাপ্ত চাল নেই, তাই ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছে।


এখন সরকার যদি দ্রুত চাল আমদানি করতে পারে তাহলে দেখা যাবে চালকল মালিকরা যে চালগুলো ধরে রেখেছে সেগুলোও দ্রুত বাজারে ছেড়ে দেবে। এতে করে বাজারে চালের দামে দ্রুত ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করেন এ গবেষক।


-সূত্র: কালের কন্ঠ

 


Top