কল রেকর্ড ট্রেলার মাত্র, অনেক কিছু এখনো বাকি: চিফ প্রসিকিউটর
তাজুল ইসলাম পোস্টে লিখেছেন, এই কল রেকর্ডটি বিবিসি উদ্ধার করেনি, করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা।
ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৫, ০৯:৩৯ এএম
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
জুলাই আন্দোলনের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী ক্র্যাকডাউন চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন একটি অডিও কল যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। বিবিসির প্রতিবেদনটি ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম লিখেছেন, ‘এটা ট্রেলার মাত্র। অনেক কিছু এখনো বাকি।’
তাজুল ইসলাম পোস্টে লিখেছেন, ‘মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। নিজের চোখেই দেখে নিন। তবে এই কল রেকর্ডটি বিবিসি উদ্ধার করেনি, করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা। এটা ট্রেলার মাত্র। অনেক কিছু এখনো বাকি। অপেক্ষায় থাকুন।’
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারকাজ চলছে। কৌঁসুলিরা হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে এই রেকর্ডিংকে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করছেন।
শেখ হাসিনার সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর অনুমতি দিয়ে তিনি যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, এখন পর্যন্ত তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো অজ্ঞাতপরিচয় এক শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে হাসিনার কথোপকথনের এই রেকর্ড।
জুলাই অভ্যুত্থানের আন্দোলনকারীদের ওপর ‘প্রাণঘাতী’ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে আছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন’ করলে বিচারের সময় এই ফোনালাপ সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম কয়েকটি গণমাধ্যমকে এ কথা বলেন। এদিন সকালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি আই ও বিবিসি বাংলা জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘অনুসন্ধান প্রতিবেদন’ প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিবিসির যাচাই করা ওই রেকর্ডিং অনুসারে, শেখ হাসিনা তাঁর নিরাপত্তাবাহিনীগুলোকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার’ করার অনুমতি দিয়েছেন এবং তাঁরা (এসব বাহিনীর সদস্যরা) যেখানেই তাঁদের (আন্দোলনকারী) পাবেন, তাঁরা গুলি করবেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের খবর সংগ্রহকারী কয়েকজন সংবাদকর্মী বিবিসির প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিথাল ওয়েপন (প্রাণঘাতী অস্ত্র) ব্যবহার করে নিরস্ত্র মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নিরূপণের চেষ্টা করেছেন। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। শুধু তা-ই না, কেপিআই (রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) স্থাপনাগুলো ধ্বংসের নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন তাঁর দলকে, যেন এর দায় ছাত্রদের ওপর চাপানো যায়। টেলিফোন কনভারসেশনের (শেখ হাসিনার) এই অডিও রেকর্ড তদন্ত সংস্থার হাতে এসেছে। তদন্ত সংস্থা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে ভেরিফিকেশন করে দেখেছে যে এটি জেনুইন, এটি আসামি শেখ হাসিনার ভয়েস। আমরা সেটিকে বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছি। ট্রাইব্যুনাল যদি চার্জ (অভিযোগ) গঠন করেন, তাহলে অ্যাট দ্য টাইম অব ট্রায়াল (বিচারের সময়) এটিকে আমরা সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রার্থনা জানাব।’
তামিম বলেন, ‘এরই মধ্যে আমরা জেনেছি, বিবিসি থেকে এই নিউজটা (শেখ হাসিনার ফাঁস হওয়া ফোনালাপ) ব্রডকাস্ট (সম্প্রচার) হয়েছে। তারাও তাদের ইনভেস্টিগেশনে এই ভয়েসের সত্যতা পেয়েছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ১৯(৩) ধারার বিধান ব্যাখ্যা করে এই প্রসিকিউটর বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সংস্থা অথবা যেকোনো এনজিও অথবা সরকারি কোনো সংস্থা থেকে যদি কোনো রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনাল জুডিশিয়াল নোটিশ এবং কমন নলেজ থেকে এই ধরনের প্রতিবেদনকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। তার পরও সব প্রমাণ আমরা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেছি। যদি চার্জ ফ্রেম (অভিযোগ গঠন) হয়, আমরা সাক্ষ্যের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে সেসব উপস্থাপন করব।’
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলাটির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য আছে। এ মামলায় শেখ হাসিনার সঙ্গে আসামি করা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে। তিন আসামির মধ্যে মামুনকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে রেখেছেন ট্রাইব্যুনাল। শেখ হাসিনা ও কামালকে পলাতক ঘোষণা করা হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান চলার সময় ড্রোন ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নিরূপণ, পরিকল্পিতভাবে হেলিকপ্টার, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের পদ্ধতিগতভাবে নির্মূলসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে এই তিনজনের বিরুদ্ধে। মামলাটি ঊর্ধ্বতনের নির্দেশনার দায় বা ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র মামলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।