ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের ১৯ তলা থেকে ঝাঁপ | daily-sun.com

ফেসবুক লাইভে আত্মহত্যার টিপস দিয়ে

ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের ১৯ তলা থেকে ঝাঁপ

ডেইলি সান অনলাইন     ৪ এপ্রিল, ২০১৭ ১৯:১৫ টাprinter

ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের ১৯ তলা থেকে ঝাঁপ

 

এক হাতে স্কচের বোতল। আর এক হাতে মোবাইলে সেলফি ক্যামেরা অন।

শুরু হয়ে গেল ফেসবুক লাইভ। সদ্যতরুণ ছেলেটির মুখে তাঁর হোটেল রুমের পরিস্থিতির বর্ণনা। টেবিলের উপরে রাখা ৯ পাতার সুইসাইড নোট দেখানোও বাদ গেল না। ফেসবুক লাইভের ফাঁকে স্কচের চুমুক।

 

এরই মধ্যে আত্মহত্যা নিয়ে নানা টিপস দিয়ে যাচ্ছে সেই ছেলেটি। এমনকী, মোবাইল ক্যামেরায় দেখিয়ে দিচ্ছে আরব সাগরের দিকে মুখ করে থাকা বিশাল কাঁচের জানালা। যেখান থেকে সমুদ্রের উপরে পড়ন্ত বিকেলের সূর্য জ্বলজ্বল করছে। ছেলেটি জানাচ্ছে এই জানলা দিয়েই সেই ঝাঁপ দেবে একটু পরে।  

 

অর্জুন ভরদ্বাজ নামে এই তরুণের ফেসবুক লাইভে উঠে এসেছে এমনই হাড়হিম করা ব্যাপার।

অর্জুনের ফেসবুক লাইভ কতজন দেখেছিলেন, তা জানা যায়নি। কিন্তু, সোমবার সন্ধ্যা ৬.৩০টায় মুম্বইয়ের বান্দ্রা পশ্চিমে এক পাঁচতারা হোটেলের নিচ থেকে অর্জুনের দেহ উদ্ধারের পর ভাইরাল হয়ে যায় এই ভিডিও।  

আত্মঘাতী হওয়ার আগে ফেসবুকের কভার পেজও বদলে দিয়েছিলেন অর্জুন

 

জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে মুম্বাইয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তেন অর্জুন। অন্ধেরি পশ্চিমে তিনি পেয়িং গেস্ট হিসাবে থাকতেন। কিন্তু, থার্ড ইয়ারের গণ্ডি পার করতে পারছিলেন না তিনি। এই নিয়ে মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। আর তাই সোমবার বিকেল ৩টায় মুম্বাইয়ে বান্দ্রা পশ্চিমে একটি পাঁচতারা হোটেলের ১৯ তলায় রুম বুক করেন অর্জুন। ১৯২৫ নম্বর ঘরে ঢোকার পরে পাস্তা, স্কচ এবং নানা খাবারের অর্ডারও করেন। এরপরই স্কচ আর পাস্তা খেতে খেতে ফেসবুক লাইভ শুরু করেছিলেন অর্জুন। প্রাথমিক তদন্তেও এসব তথ্যই উদ্ধার করেছে বান্দ্রা পুলিশ। ১ মিনিট ৪২ সেকেন্ড ধরে এই ফেসবুক লাইভের ভিডিও শ্যুট করেছিলেন অর্জুন। এমনকী ভিডিও-তে অর্জুনকে সিগারেট খেতেও দেখা যায়। পুলিশ অর্জুনের সুইসাইড নোটগুলিও উদ্ধার করেছে।  

 

সুইসাইড নোটে তাঁর মৃত্যুর জন্য মানসিক হতাশাকেই দায়ী করেছেন অর্জুন। বেঙ্গালুরুর ছেলে অর্জুনের বাবা একজন ব্যবসায়ী। ছেলের মর্মান্তিক পরিণতির খবর পাওয়ার পরেই তিনি মুম্বইয়ে চলে আসেন।  

 

পাঁচ তারা হোটেলের নিচের প্ল্যাটফর্মে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলেন অর্জুন। লীলাবতি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। সমস্ত ঘটনা জানার পরে অবাক হয়ে যান হাসপাতালের চিকিৎসক সুলেমান মার্চেন্ট। তিনি জানান, যেভাবে অল্পবয়সি ছেলেমেয়েরা জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে তা যথেষ্টই উদ্বেগের।

 

এই অল্পবয়সিদের কাছে জীবনটা যেন একটা সেলফি মোড। তাই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়েও অর্জুন সেলফি ভিডিও-তে ফেসবুক লাইভ করে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছে। মনোবিদদের সাহায্য ছাড়া বর্তমান যুব সমাজকে এমন ভয়ঙ্কর পরিণতিকে রক্ষা করা খুবই কঠিন বলেও মনে করছেন সুলেমান মার্চেন্ট।  

 

দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা প্রবলভাবে বেড়েছে। ইউনিসেফের প্রকাশ করা তথ্যে দেখা গিয়েছে ভারত এই তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে। ২০১২ সালেই ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে ১ লক্ষ ছেলে-মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও এই প্রবণতা হু হু করে বাড়ছে। গত বছরই প্রেমিকের সঙ্গে ঝামেলার জেরে ফেসবুকে আত্মহত্যার কথা ঘোষণা করে আত্মঘাতী হয়েছিল বহরমপুরের এক ছাত্রী। এমনকী, ঘনিষ্ঠ ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আত্নঘাতী হওয়ার সংখ্যাটাও দেশে মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।  

 

মনোবিদ রাজশ্রী রায়-এর মতে, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েরা প্রচণ্ডই স্মার্ট। তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসটাও সাংঘাতিকরকমের। ফলে, এদের মধ্যে সবসময়েই একটা নায়কোচিত মনোভাব ঘোরাফেরা করছে। কোনও গণ্ডির মধ্যে বেশিদিন এরা আটকে থাকতে পারছে না। ঘটছে ধৈর্যচ্যুতি। আর সেখান থেকে নিয়ে নিচ্ছে চরম পদক্ষেপ। কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমেই এই প্রবণতা আটকানো সম্ভব। বিশেষে করে অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের মনের হদিশ অভিভাবকদের রাখতেই হবে। চিনতে হবে অস্বাভাবিক প্রবণতাগুলিকে। না হলে এমন ঘটনা নিরন্তর বৃদ্ধি পাবে। ’ 

 

এদিকে, অর্জুনের এই ঘটনার পরে নড়েচড়ে বসেছে মুম্বাই পুলিশও। টুইটারে তারা অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদেরকে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার আর্জি জানিয়েছে।  

 

 


Top