ভারত শেখ হাসিনার রেকর্ড করা ভাষণ বাজাতে দিল কেন?
হাসিনার অডিয়ো ভাষণ: বাক-স্বাধীনতার দোহাই দিল্লির, ক্ষুব্ধ ঢাকা
বিবিসি বাংলা
প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দিল্লিতে গত শুক্রবার একটি সেমিনারে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রেকর্ড করা অডিয়ো বাজানো নিয়ে ঢাকার প্রবল আপত্তির প্রেক্ষিতে ভারতের একাধিক বিশ্লেষক বলেন, তাদের দেশে বাক-স্বাধীনতা আছে, তাই কে কখন মুখ খুলবেন, সেটা ভারতের সরকার ঠিক করে দিতে পারে না।
তারা আরও বলেন, যদি ভারতের সরকার চাইত, তাহলে শেখ হাসিনার রেকর্ড করা অডিয়ো ভাষণ বাজানোর ক্ষেত্রে বাধা দিতে পারত, কিন্তু দিল্লি তাতে বিশেষ আগ্রহী নয় বলেই তাদের ধারণা।
‘ফরেন করেস্পডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া’ দিল্লিতে ২৩ জানুয়ারি ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি সেমিনার আয়োজন করেছিল। সেখানে সশরীরে এবং ভার্চুয়াল মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রী ও নেতা হাজির ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানেই শেখ হাসিনার একটি রেকর্ড করা অডিয়ো ভাষণ বাজানো হয়েছিল।
এর আগে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমকে ইমেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি সামাজিক প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে নিয়মিতই তার নিজের দলের নেতা-কর্মীদের সামনে ভাষণ দিয়ে থাকেন। তবে সব ক্ষেত্রেই সেগুলি শুধুই অডিয়ো। তবে ভিডিয়ো বা ভারতে অবস্থানকালে তার কোনও ছবি প্রকাশ করা হয় না।
ওইসব সাক্ষাৎকার এবং শেখ হাসিনার ভাষণ নিয়ে এর আগেও আপত্তি তুলেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু দিল্লি সেগুলির সরাসরি জবাব দেয়নি কখনোই।
‘ভারতে বাক-স্বাধীনতা আছে...’
শেখ হাসিনার রেকর্ড করা ভাষণ বাজানো নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তির প্রেক্ষিতে এখনও সরকারি ভাবে কোনও মন্তব্য করেনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তবে, ভারতের একাধিক বিশ্লেষক মনে করেন যে, শেখ হাসিনা কখন, কী বলবেন, সেটা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। সরকার তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না বা চায়ও না।
বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘ভারতে তো বাক-স্বাধীনতা আছে। ভারত সরকার তা ঠিক করে দিতে পারে না যে কে কী কথা বলবেন।’
বাংলাদেশে নির্বাচনের ঠিক আগে শেখ হাসিনার রেকর্ড করা ভাষণ বাজানো হয়েছে। সেই প্রসঙ্গে পিনাক চক্রবর্তী আবারও বলেন, ‘কোন সময়ে কে মুখ খুলবেন, কী বলবেন, সেটা ভারতের সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তো হয় না! যিনি কথা বলতে চাইছেন, সেটা তার নিজের সিদ্ধান্ত।’
কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীও সেই ‘বাক-স্বাধীনতার’ কথাই বলেন।
তবে তার সংযোজন, ‘এ দেশে বাক-স্বাধীনতা রয়েছে। তাই ভারতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা কোন কথা কীভাবে, কখন বলবেন, সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে যে ভারত সরকার আগ্রহী নয়, সেটা স্পষ্ট। তবে এটাও ঠিক যে সরকার যদি চাইত, তাহলে বাধা দিতে পারত। তারা চায়নি বাধা দিতে।’
বাংলা সংবাদ পোর্টাল ‘দ্য ওয়াল’- এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক ও বাংলাদেশের ঘটনাবলির দিকে গভীর নজর রাখেন, এমন এক সাংবাদিক, অমল সরকার একটু ভিন্ন প্রেক্ষাপটের কথা বলেন।
তার কথায়, ‘গত শুক্রবারের অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার যে রেকর্ড করা ভাষণ বাজানো হয়েছে, সেখানে তিনি যা বলেছেন, তার সঙ্গে এতদিন ধরে তিনি যে ন্যারেটিভ তুলে ধরছেন- তার বিশেষ ফারাক নেই। বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্ম বা দলীয় গ্রুপগুলোতে তো তিনি মুহাম্মদ ইউনুসের সরকারের ব্যর্থতা, সংখ্যালঘুদের ওপরে নির্যাতন, মব কালচার ইত্যাদি নিয়ে বলেই আসছেন।
‘আবার ভারত সরকারও তো এই একই ন্যারেটিভেই বিশ্বাস করে। সরকার হয়ত কূটনৈতিক শিষ্টাচার থেকে খোলাখুলি বলতে পারে না কথাগুলো। তবে শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ আর ভারত সরকার যে একই ন্যারেটিভে বিশ্বাস করে, সেটা তো স্পষ্ট। সেকারণেই শেখ হাসিনাকে বাধা দিচ্ছে না ভারত,’ বিশ্লেষণ অমল সরকারের।
‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ নিয়ে দিল্লির কথা মানেনি ঢাকা
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার বার একই মন্তব্য করেছে যে, তারা চায় বাংলাদেশে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হোক।
এখানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন’ শব্দ বন্ধের মাধ্যমে তারা বলার চেষ্টা করে থাকে যে, সব দল যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। যেটা স্পষ্ট করে বলা হয় না, তা হলো বাংলাদেশে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগও যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, দিল্লির ইচ্ছা সেটাই।
‘তবে ঢাকাও তার যুক্তি দেখিয়েছে যে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনই তো হচ্ছে- যেখানে সব জনগণ শামিল হচ্ছেন,’ বলেন অমল সরকার।
তার কথায়, ‘এখানে তো ভারতের আকাঙ্ক্ষা তো পূরণ হয়নি, ঢাকা তো দিল্লির ইচ্ছা মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগসহ সব দলকে অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন করছে না। যখন ভারতের ইচ্ছা বাংলাদেশ শোনেনি, তাই দিল্লি এখন চাইছে শেখ হাসিনা তার বক্তব্য তুলে ধরুন।’
অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরি অবশ্য মনে করেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক এখন তলানিতে এসে ঠেকলেও ভোটের পরে যে দলের সরকারই আসুক না কেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে উন্নতে ঘটাতে চাইবে দুটি দেশই।
তার কথায়, ‘দুই দেশেরই স্বার্থ এতে জড়িত আছে।’
শেখ হাসিনার ভাষণ নিয়ে যে আপত্তি ঢাকার
ভারতে বসে প্রকাশ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দিতে দেওয়ায় রবিবার এক বিবৃতি দিয়ে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তার এসব বক্তব্য বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে দাবি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করার এবং আসন্ন নির্বাচনকে ব্যাহত করার জন্য আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করার জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে প্রকাশ্যে যে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের সরকার বিস্মিত ও হতাশ হয়েছে।’
শুক্রবার ভারতের নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন আওয়ামী লীগের নেতারা।
‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’, অর্থাৎ ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র বাঁচাও’ শীর্ষক ওই সেমিনারে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি রেকর্ড করা অডিয়ো ভাষণ শোনানো হয়।
ওই অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছে, যার অন্যতম হলো জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ করে বিগত বছরের ঘটনাবলির ‘নিরপেক্ষ তদন্তের’ দাবি, যাতে, ‘খাঁটি সত্যটা’ জানা যায়।
এছাড়াও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, মব, সন্ত্রাসের সংস্কৃতি, সংখ্যালঘু এবং বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী আর সাংবাদিকদের ওপরে আক্রমণ ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরা হয় ‘বিশ্বের নজরে’ আনার জন্য।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগে, পর পর দুই সপ্তাহে ভারতের রাজধানী শহরে আওয়ামী লীগ নেতাদের দুটি সংবাদ সম্মেলনে আসেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
এসব প্রসঙ্গ টেনে রবিবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দুই দেশের মধ্যে থাকা দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের সরকার বারবার অনুরোধ করার পরেও ভারত শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করেনি, যা বাংলাদেশকে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। বরং ভারত তাকে নিজেদের মাটিতে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এরকম উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। এটা পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’
ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের রাজধানীতে বসে এরকম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্য অন্তরায়। বিশেষ করে সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, অন্য দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং প্রতিবেশীসুলভ আচরণ নয়। এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগ নেতাদের দেওয়া এরকম উসকানিমূলক বক্তব্য আবারও প্রমাণ করেছে যে, কেন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের দিন সংঘটিত সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের দায়ী করা হবে এবং তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’