র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারকে কেন এশিয়ার নোবেল বলা হয়? এটি প্রতিষ্ঠার পেছনের ইতিহাস কী?
ডেইলি সান রিপোর্ট, ফিচার
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে সমাজ পরিবর্তন, জনসেবা, শিক্ষা, মানবাধিকার, সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান ও মানুষের কল্যাণে অসাধারণ কাজ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননাগুলোর একটি র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার। দীর্ঘদিন ধরে এটি পরিচিত ‘এশিয়ার নোবেল’ নামে।
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট র্যামন ম্যাগসেসের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই পুরস্কার শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যকে স্বীকৃতি দেয় না; বরং মানুষের জীবন বদলে দেওয়া সাহসী উদ্যোগ, সততা, নেতৃত্ব ও জনকল্যাণমূলক কাজকে সম্মান জানায়।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের সমাজকর্মী ও ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর বাংলাদেশে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারের ইতিহাস আবারও আলোচনায় এসেছে। তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি পুরস্কারপ্রাপ্তের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে।
কিন্তু কেন এই পুরস্কারকে ‘এশিয়ার নোবেল’ বলা হয়? কীভাবে এর জন্ম হয়েছিল? আর বাংলাদেশ থেকে কারা এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মান পেয়েছেন—তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকছে এই ফিচারে।
যে নেতার নামে শুরু হলো এই পুরস্কার
র্যামন ম্যাগসেসে ছিলেন ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট। সাধারণ মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা, জনসেবামূলক নেতৃত্ব এবং সরকারি দায়িত্ব পালনে সততার জন্য তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
তবে তার রাজনৈতিক জীবন দীর্ঘ হয়নি। ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুর পর তার স্মৃতি ও জনসেবার আদর্শকে সামনে রেখে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই বছর নিউইয়র্কভিত্তিক রকফেলার ব্রাদার্স ফান্ডের ট্রাস্টিরা র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটিই পুরস্কার পরিচালনা এবং পুরস্কারপ্রাপ্তদের নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করে।
১৯৫৮ সালের ৩১ আগস্ট প্রথমবারের মতো র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথম বছর ফিলিপাইনভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এবং ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও শ্রীলঙ্কার পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে এ সম্মান দেওয়া হয়েছিল।
এরপর থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে তাদের অসাধারণ অবদানের জন্য স্বীকৃতি দিয়ে আসছে এই পুরস্কার।
কেন বলা হয় ‘এশিয়ার নোবেল’?
র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল পুরস্কারের কোনো অংশ বা বিকল্প নয়। তবে এশিয়াজুড়ে এর মর্যাদা, প্রভাব এবং পুরস্কারপ্রাপ্তদের অসাধারণ কাজের কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরে ‘এশিয়ার নোবেল’ নামে পরিচিত।
এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এই পুরস্কার সাধারণত এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়, যারা ব্যক্তিগত লাভ বা খ্যাতির বাইরে গিয়ে মানুষের জীবন পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, শান্তি ও জনসেবার মতো ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষরা এই পুরস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন।
নোবেল পুরস্কারের মতোই র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। আর এশিয়ার মানুষের জীবন ও সমাজ পরিবর্তনে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার কারণেই একে জনপ্রিয়ভাবে ‘এশিয়ার নোবেল’ বলা হয়।
এই পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন দালাই লামা, মাদার তেরেসা, স্যার ফজলে হাসান আবেদ ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব।
পুরস্কারটির দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হলো জনসেবায় সততা, সাহস এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। র্যামন ম্যাগসেসের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত এই মূল্যবোধগুলোই পুরস্কারটির মূল চেতনা হিসেবে বিবেচিত।
কোন কোন ক্ষেত্রে দেওয়া হতো পুরস্কার
১৯৫৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার ছয়টি বিভাগে দেওয়া হতো। এগুলো হলো—
- সরকারি সেবা
- জনসেবা
- কমিউনিটি নেতৃত্ব
- সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সৃজনশীল যোগাযোগ
- শান্তি ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া
- উদীয়মান নেতৃত্ব
‘উদীয়মান নেতৃত্ব’ বিভাগটি ২০০০ সালে চালু করা হয় এবং ২০০১ সালে প্রথম এ বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়। সামাজিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ৪০ বছর বা তার কম বয়সী তরুণ নেতৃত্বকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য এই বিভাগ চালু করা হয়েছিল।
২০০৯ সাল থেকে পুরস্কারটি আর আগের নির্দিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। তবে পুরস্কারপ্রাপ্তদের নির্বাচন করা হয় এশিয়ার মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা, সাহস, সততা ও সমাজ পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার
বাংলাদেশের জন্য র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। সমাজ উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, মানবাধিকার, স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও বিজ্ঞানে অসাধারণ অবদানের জন্য বাংলাদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি এই সম্মান পেয়েছেন।
২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ১২ জন এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০২৬ সালে রুনা খান পুরস্কারজয়ী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশি পুরস্কারপ্রাপ্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে।
বাংলাদেশের র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্তরা
- তহরুন্নেসা আবদুল্লাহ — ১৯৭৮
বাংলাদেশের সমাজ উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।
- স্যার ফজলে হাসান আবেদ — ১৯৮০
ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসাধারণ অবদানের জন্য পুরস্কৃত হন।
- ড. মুহাম্মদ ইউনূস — ১৯৮৪
গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ ধারণাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলেন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
- ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী — ১৯৮৫
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
- ফাদার রিচার্ড উইলিয়াম টিম — ১৯৮৭
বাংলাদেশে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য তিনি এই সম্মান পান।
- মোহাম্মদ ইয়াসিন — ১৯৮৮
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও সমবায়ভিত্তিক কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য তিনি পুরস্কৃত হন।
- অ্যাঞ্জেলা গোমেজ — ১৯৯৯
প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ‘বাঁচতে শেখা’র প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান।
- অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ — ২০০৪
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে বই পড়া ও আলোকিত মানুষ গড়ার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকার জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।
- মতিউর রহমান — ২০০৫
সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারে ভূষিত হন।
- এ এইচ এম নোমান — ২০১০
প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও উন্নয়নে কাজের জন্য তিনি এই সম্মান লাভ করেন।
- সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান — ২০১২
পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় আইনি লড়াই এবং পরিবেশবাদী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি এই পুরস্কার পান।
- ড. ফেরদৌসী কাদরী — ২০২১
সংক্রামক রোগ, বিশেষ করে কলেরা এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসী কাদরী এই পুরস্কার পান।
- রুনা খান — ২০২৬
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান দুর্গম, নদীভাঙনকবলিত ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
রুনা খানের অর্জন কেন গুরুত্বপূর্ণ
২০০২ সালে রুনা খান প্রতিষ্ঠা করেন ফ্রেন্ডশিপ। সংস্থাটির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা পৌঁছে দেওয়া।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে ফ্রেন্ডশিপ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, জলবায়ু সহনশীলতা, জীবিকা ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করছে।
বিশেষ করে নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফ্রেন্ডশিপের কাজ ব্যাপকভাবে পরিচিত।
২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ী হিসেবে রুনা খানের নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সামাজিক উদ্যোগের ইতিহাসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়েছে।
এ বছর রুনা খানের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের কূটনীতিক ও আইনজ্ঞ টমি কোহ এবং মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী বো চিও পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী ১৫ নভেম্বর ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে।
শুধু পুরস্কার নয়, অনুপ্রেরণার গল্প
র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এর অনুপ্রেরণার জায়গাটি।
এই পুরস্কারপ্রাপ্তদের অনেকেই ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত খ্যাতির জন্য কাজ শুরু করেননি। কেউ গেছেন গ্রামের মানুষের কাছে, কেউ গড়ে তুলেছেন শিক্ষা আন্দোলন, কেউ লড়েছেন পরিবেশ রক্ষায়, কেউ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছেন দরিদ্র মানুষের কাছে।
তাদের কাজ একটি বিষয়ই মনে করিয়ে দেয়—সমাজ পরিবর্তনের জন্য সব সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হতে পারে একটি সাহসী ধারণা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাওয়ার মানসিকতা।
এ কারণেই র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার শুধু একটি সম্মাননা নয়। এটি এশিয়ার মানুষের সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও মানবিক উদ্যোগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
ফিলিপাইনের একজন জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের স্মৃতিতে ১৯৫৭ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে।
বাংলাদেশের ১৩ জন পুরস্কারপ্রাপ্তের পথচলাও সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়—মানুষের কল্যাণে করা একটি কাজ কখনো কখনো একটি দেশ বা সমাজের সীমানা পেরিয়ে পুরো বিশ্বের জন্য অনুপ্রেরণায় পরিণত হতে পারে।