শৈশব থেকে ব্যস্ততা, ডিসেম্বরের বদলে যাওয়া রঙ
মুক্তির স্বাদ আর দায়িত্বের বোঝা, দুই প্রজন্মের ডিসেম্বর
তখন ডিসেম্বর মানে ছিল কেবলই মুক্তির আনন্দ। ছবি: সংগৃহীত
বছর ঘুরে যখন ক্যালেন্ডারের শেষ পাতাটি উল্টানো হয়, তখন প্রকৃতিতে নামে হালকা শীতের চাদর আর মনের গভীরে জাগে এক মৃদু বিষণ্ণতা মেশানো নস্টালজিয়া। এই মাসটির নাম ডিসেম্বর। বাঙালি জীবনে ডিসেম্বর মানে কেবল বছরের সমাপ্তি নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে বিজয়ের গৌরব, লেপ-কম্বলের উষ্ণতা, আর ফেলে আসা শৈশবের এক স্নিগ্ধ, শান্ত দিনের ছবি।
স্মৃতিতে ভাসে, শৈশবের সেই ডিসেম্বর কত সহজ ছিল! বার্ষিক পরীক্ষার শেষ ঘণ্টার আনন্দ, হাতে অফুরন্ত সময় আর মুক্তির স্বাদ। সেই ডিসেম্বরে চিন্তা ছিল না, ছিল শুধু মুক্তির অবাধ স্বাধীনতা। আজ যখন জীবন তার গতিপথে এগিয়ে এসেছে, বড়বেলার এই ডিসেম্বর তখন আর শান্ত নেই। এখন এটি চিন্তা, হিসেব, দায়িত্ব আর সীমাহীন ব্যস্ততায় ভরা- যেন মাসটি শৈশবের ‘মুক্তির সনদ’ থেকে বড়দের কাছে ‘দায়িত্বের দলিল’ হয়ে ধরা দিয়েছে।
শৈশবের দিনগুলো ছিল সরল, নির্ভার। ডিসেম্বর মাস মানেই ছিল এক নতুন উৎসবের সূচনা। তখন ক্যালেন্ডারের অন্য কোনো মাসের দিকে অতটা আগ্রহ ছিল না। আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুধু এই শেষ মাসটি। এর মূল কারণ ছিল- পরীক্ষা শেষ!
পরীক্ষার খাতা জমা দেওয়া মাত্রই বুক থেকে যেন বিশাল এক পাথর নেমে যেত। সকালে ঘুম থেকে ওঠা বা সন্ধ্যায় পড়তে বসার তাড়া থাকত না। সেই সময়টার বড় একটি অংশ কাটত খেলাধুলা আর অবাধ দুরন্তপনায়। শীতের আমেজ শুরু হয়েছে সবে, লেপ-কম্বলের উষ্ণতা আর খেজুর রসের মিষ্টি গন্ধে দিনগুলো ভরে থাকত।

স্কুলব্যাগের ওজন হালকা হয়ে যেত, নিয়ম-কানুনের শেকল ভাঙার এক আনন্দ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত গোল্লাছুট, ক্রিকেট বা চোর-পুলিশ খেলা। অনেকের কাছে এই মাসটি ছিল দূরবর্তী আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার মাস। শৈশবের ডিসেম্বর ছিল যেন একটি লম্বা ছুটি, যেখানে একমাত্র কাজ ছিল শুধুমাত্র খুশি থাকা আর বিজয়ের উৎসবের রঙে মেতে ওঠা।
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। সেই দুরন্ত শৈশব আজ অতীত। এখনকার ডিসেম্বর আসে হিসেব আর কাজের বোঝা নিয়ে। শৈশবের ‘পরীক্ষা শেষ’ হওয়ার বিপরীতে বড়দের জীবনে ডিসেম্বরের অর্থ- ‘বছর শেষ’।
বেশিরভাগ পেশাজীবীর জন্য ডিসেম্বরের মানে হলো বছরের শেষ রিপোর্ট জমা দেওয়া, বাৎসরিক লক্ষ্য পূরণের জন্য শেষ চেষ্টা করা এবং নতুন বছরের পরিকল্পনা সাজানো। যেন এক অদৃশ্য ডেডলাইন তাড়া করে বেড়ায় সারাক্ষণ।
নতুন বছরে খরচের তালিকা আর বছরের শেষে আয়-ব্যয়ের হিসেব মেলাতে গিয়ে কেটে যায় অনেক রাত। বছরের শেষে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি ফেরা, নানা সামাজিক অনুষ্ঠান আর দাওয়াত রক্ষা করার এক বাড়তি চাপ থাকে।

শৈশবে যে শান্ত ডিসেম্বর ছিল, বড় হয়ে তা পরিণত হয়েছে একটি ব্যস্ত সময়সূচীতে। এখন ডিসেম্বরে শীতের সকালের কুয়াশা উপভোগ করার সময় নেই, আছে শুধু রুটিনের কাঁটায় বাঁধা জীবনের নিরন্তর ছুট।
তবে সব ব্যস্ততার মধ্যেও ডিসেম্বর মাসটি তার ঐতিহ্যগত আবেগ ধরে রেখেছে। এটি বিজয়ের মাস। ১৬ই ডিসেম্বরের জাতীয় চেতনা, লাল-সবুজের পতাকা, আর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ- এই সবকিছু বড়দের ব্যস্ত জীবনেও কিছুটা থমকে দাঁড়াতে শেখায়। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান আর বছরের শেষে প্রিয়জনদের নিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি- এই সবকিছুর মধ্যে দিয়েই বড়রা নিজেদের শৈশবের আনন্দের টুকরোগুলো খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
আসলে, শৈশব আর বড়বেলার ডিসেম্বরের এই বৈপরীত্য আমাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। একসময় জীবন ছিল দায়িত্বহীন, তাই ছিল অনাবিল শান্তি। আর এখন জীবন দায়িত্বপূর্ণ, তাই শান্তি খুঁজতে হয় ব্যস্ততার ফাঁকে।