EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’

মাসুদ আহাম্মদ সুবর্ন

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’
অ অ

যানজট নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল এবং গতি পরিমাপক প্রযুক্তির ব্যবহার একদিকে যেমন বাড়ছে; অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে তো বটেই আমাদের দেশেও জলবায়ুর সক্ষমতা বাড়াতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো সবুজ ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারও ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে। সারা বিশ্বের প্রধান প্রধান মেগাসিটিগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইন্টারনেট অব থিংস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সড়ক ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ মিলে এখন প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। 

বিশ্বে প্রতিদিন যে পরিমাণ নতুন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, তার সিংহভাগই (প্রায় ৭৫%) এখন পূরণ করছে একা সৌরশক্তি। এই শক্তিকে এখন সড়ক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সড়ক সুরক্ষার শক্তি হিসেবে। যাতে সড়ক এবং সড়কে চলাচলে নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং মানুষকে স্বস্তি দেওয়া সম্ভব হয়। অন্যদিকে জলবায়ুকেও মানুষের সহনশীল পর্যায়ে যতটুকু পারা যায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়। মানুষ-প্রকৃতি মিলে এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ! নিজস্ব ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির সহায়তা ইত্যাদির মাধ্যমে সড়কে আমাদের নিত্যদিনের চলাচল আর জলবায়ুর মাঝেই বসবাস। এই দুইয়ের নিট ফলাফল আমাদের জীবন-জীবিকার প্রকাশ, বিকাশ এবং অতীত থেকে মিলে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের পথচলা। সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু মিলিয়ে মানুষ রক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে প্রতিদিন। এ পর্যন্ত যে কথাগুলো বলা হলো তার সবকিছু ঠিকই আছে এবং এমনটাই হওয়া সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশিত।

সড়ক এবং জলবায়ু—উভয় ক্ষেত্রই মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হওয়ায় এ নিয়ে নানা মাত্রার আলোচনা, সমালোচনা ও মতভিন্নতা থাকবেই। আপাতদৃষ্টিতে সড়ক শৃঙ্খলায় আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব সুরক্ষার এই আয়োজনগুলো সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা পূরণ করার কথা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এতটা সরল নয়, বরং বেশ জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে চরম প্রতিকূল। প্রযুক্তি ও সবুজ শক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক কাঠামোগত বাস্তবায়ন এবং মানবিক সচেতনতার অভাবে আধুনিকায়নের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাচ্ছে না। এই আধুনিকায়নের আবহের ভেতরেও প্রতিনিয়তই আমাদের সড়ক ও জলবায়ুর বিভিন্ন নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে, যা আমাদের জীবনযাত্রার ওপর বৈরী প্রভাব ফেলছে।

সড়কে নিত্যদিনের ঝুঁকির মধ্যে চলাচল আর জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বৈরিতার মাঝে বসবাস—এই দুই সংকটের জটিল আবর্তেই এখন পৃথিবীর অনেক দেশের মতো আমাদের দেশের মানুষের জীবনসংগ্রামের গতিধারা প্রবহমান। একদিকে সড়কে প্রতিদিন দুর্ঘটনার কারণে মৃত্যুর মিছিল, আহতদের আহাজারি, বেঁচে থাকাদের মানসিক ট্রমা এবং পারিবারিক পরিসরে বহুমাত্রিক বিপর্যয় ও রাষ্ট্রীয়-সামাজিক ক্ষতি; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের নিত্যদিনের ধাক্কায় স্থানান্তরসহ সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবন-জীবিকার বহুধা বিভক্ত জটিল পরিস্থিতি। কৃষিজীবীদের ভোগান্তির মাত্রাও বেশ কঠিন। এসবকিছুর যোগফলে আমাদের দেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে। আর এগুলোর প্রায় সবকিছুই ঘটছে আমাদের চোখের সামনে। মানুষ ক্ষণিক আশায় বুক বাঁধলেও এসব দেখে পরক্ষণেই হতাশায় তলিয়ে যাচ্ছে।

এর নির্মম উদাহরণ দেখা যায় অতি সম্প্রতি। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ছোট কুমিরা এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গত ২৬ অক্টোবর একটি যাত্রীবাহী বাস যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাস্তার পাশে দাঁড়ায়। বাসের মেরামত চলাকালীন যাত্রীরা যখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন, তখন একটি দ্রুতগামী লরি তাদের ওপর উঠে গেলে একই পরিবারের ৩ জনসহ ৫ জন বাসযাত্রী নিহত হন এবং ৮ জন গুরুতর আহত হন। একইভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। কেনিয়ায় ২৫শে অক্টোবর রাজধানী নাইরোবি ও উপকূলীয় শহর মোমবাসার সংযোগকারী প্রধান মহাসড়কের মাকুয়েনি কাউন্টিতে একটি যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হন। ভুল ওভারটেকিংয়ের এই মারাত্মক ঘটনাটি ঘটে।

সড়কের এই মরণফাঁদের সমান্তরালে প্রকৃতির রুদ্ররূপও সমানতালে তাণ্ডব চালাচ্ছে। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে, যা নগরগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বন্যা-খরায় চাষাবাদও কঠিন হচ্ছে দিন দিন। বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসের মতো মশাবাহিত ও সংক্রামক রোগের বিস্তার আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও ভয়াবহ আকারে ছড়াচ্ছে। এছাড়াও বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ সংকটের কারণে জীবনযাপনের পরিস্থিতি অমানবিক হয়ে দিন দিন আরও তীব্রতর হচ্ছে। সড়কের অব্যবস্থাপনা ও দুর্গতি, চলাচলরত যানবাহনের জরাজীর্ণ দশা এবং জলবায়ুর যখন-তখন চরম রূপ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটে চলা মানুষ জীবন-জীবিকার সামগ্রিক সংকটে অকালেই ঝরে যাচ্ছে অথবা পঙ্গুত্ব বরণ করছে। এতে মানুষের আস্থার প্রত্যাশাগুলো সহসাই তীব্র হতাশায় রূপ নিচ্ছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিকে আমরা এক কথায় বলতে পারি ‌‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’!

আমরা এক অদ্ভুত সময় পার করছি। চারদিকে তাকালে মনে হয়, সবকিছুর ভেতর দিয়ে মানুষের জীবন আর সম্ভাবনারই অকালমৃত্যু ঘটছে প্রতিনিয়ত। এই বৈরিতায় মানুষের যখন স্রেফ টিকে থাকতেই নাভিশ্বাস উঠছে, তখন পরিবার বা সমাজ নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? নিজের দিকে তাকাবার সামান্য সময়টুকু নেই অনেকক্ষেত্রে। এর সাথে সাথে আমাদের ওপর আবার চেপে বসেছে বা বসে আছে নিজেদেরই তৈরি নানামুখী সামাজিক, কাঠামোগত আর পরিবেশগত জটিলতার আনুপাতিক-সমানুপাতিক ঘাত-প্রতিঘাত। এই সামগ্রিক সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ব্যক্তি থেকে পরিবার আর পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবখানেই আজ এক বিবর্ণ, অমানবিক পরিবেশের জন্ম হচ্ছে। যেখানে মানুষের স্বাভাবিক বেঁচে থাকা আর নিরাপদ চলাচলের ন্যূনতম নাগরিক অধিকারটুকুই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে সামাজিকভাবে একটি 'সুবর্ণ' বা আদর্শ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখা তো বিলাসিতা মাত্র!

কিন্তু জীবনের তাগিদে, বেঁচে থাকার স্বার্থে এই কঠিন প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আবেগ দিয়ে নয়, প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আমাদের এর উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ, মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সমাজের সব সার্থকতা আর প্রশান্তি; যা মানুষকে নতুন নতুন উন্নয়ন ও উৎপাদনের পথে এগিয়ে নেয়। যদি আমরা উন্নয়ন ও উৎপাদনের গতি বজায় না রাখতাম, তবে সড়ক ও পরিবেশের প্রাত্যহিক জটিলতা আমাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলত। প্রতিদিনের সম্ভাবনা হারিয়ে নতুন করে সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখার যে স্বাভাবিক ধারা এটাই জীবন। আমরা আসলে জীবনের গতি সচল রেখেই এগিয়ে যেতে চাই এবং প্রতিটি সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

বেঁচে থাকার এই সংকটে নীরব-সরব সব দিক দিয়ে আজ সবচেয়ে বড় আঘাতটি হানছে পরিবেশ তথা জলবায়ু। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষি খাতে বিপর্যয়ের কারণে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এটি দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকাশিত ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্ক অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলেই বাস করে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্লাবন-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। গ্রিনহাউজ গ্যাসের উচ্চ নির্গমনের বর্তমান হার বজায় থাকলে এই শতকের শেষ নাগাদ (২১০০ সাল) বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় প্লাবনের শিকার হতে পারে। এডিবি বলছে, বিশ্ব জুড়ে ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় বন্যায় প্রতি বছর আক্রান্ত হতে পারে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ, যা ২১০০ সাল নাগাদ বেড়ে দাঁড়াবে ১০ কোটি ৮০ লাখে। এসব ঝুঁকির একটি বড় অংশ কেন্দ্রভূত রয়েছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপসহ এশিয়ার বৃহৎ ঘনবসতিপূর্ণ নদী অববাহিকাগুলোতে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উপকূলীয় প্লাবনের প্রধান শিকার দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে তাদের দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চক্র আরও ঘনীভূত হয়। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬) কিন্তু কেবল প্রকৃতির মার-ই শেষ কথা নয়; আমাদের নিজেদের তৈরি কাঠামোগত খুনের উৎসবও সমানে চলছে। দেশের সড়কগুলোতে প্রতিদিন যে মৃত্যু, তার কোনো শেষ নেই। ‘গাড়ির বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতাসহ চালক-পথচারীদের অসচেতনতায় সড়কে প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ। হাজারো মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছে। 

গত ১৩ বছরে সারা দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার জন, আহত ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৯৪ শতাংশ। আর মৃত্যুর হার বেড়েছে ৫.৭৯ শতাংশ। আহতের হার ১৪.৮৭ শতাংশ বেড়েছে। গত বছর ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন। ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছেন। এ সংখ্যা যথাক্রমে মোট দুর্ঘটনার ৩৭.৪ শতাংশ, নিহতের সংখ্যার ৩৮.৪৬ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যার ১৪.৯৮ শতাংশ।‘ (দৈনিক ইত্তেফাক, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬) সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত রাজধানী জুড়ে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৩৮৪ জন নিহত এবং ২ হাজার ৪৮৮ জন আহত হয়েছেন। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬)

একদিকে জলবায়ুর নীরব থাবা, অন্যদিকে সড়কের রক্তক্ষয়ী ও মারাত্মক অব্যবস্থাপনা—দুইয়ে মিলে আমাদের স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার আর সম্ভাবনাকে প্রতিদিন গলা টিপে হত্যা করছে। এর ফলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিনিয়ত কোনো না কোনোভাবে বৈরী পরিবেশ-পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষকে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে নানা কাজে বিভিন্ন দিকে ছুটতে হয়, যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু এই ছুটে চলার পথে পরিবেশ আর সড়কের যে করুণ অবস্থা, তা সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না। এর চড়া মূল্য দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত কত মানুষ মরছে, পঙ্গু হচ্ছে, আর ঘরবাড়ি-ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে—তার হিসাবের কোনো ইয়ত্তা নেই। সড়ক এবং জলবায়ু তথা পরিবেশের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কোনো অংকেই মেলানো সম্ভব নয়; যেভাবে সম্ভব নয় হারিয়ে যাওয়া জীবনের আর্থিক হিসাব করা। এভাবে বেহিসাবে ক্ষয়-ক্ষতির মুখোমুখি আমরা অনেকেই—সার্বিকভাবে সমগ্র দেশ! মৃত্যু তো মৃত্যু-ই, তবে বাস্তুচ্যুত হওয়াও এক প্রকার জীবন্ত মৃত্যুর মতো।

এমন নয় যে জলবায়ু এবং সড়কের নানা জটিলতার মাঝে মানুষ পথচলা বন্ধ করে দিয়েছে, কিংবা এই বৈরী পরিবেশে টিকতে না পেরে কাজ বন্ধ করে ঘরে বসে আছে; না, তা কিন্তু নয়। বাস্তবতা হলো—সড়ক আর পরিবেশের এই ধ্বংসযজ্ঞ, মৃত্যু, জখম আর ট্রমার মধ্য দিয়েই মানুষের জীবন সমান্তরালে এগিয়ে চলছে নিজ নিজ লক্ষ্যে, আদর্শে অথবা কেবল টিকে থাকার তাগিদে। তবে চলমান এমন অবস্থা কোনোভাবেই মানবিক নয়, জীবনধারণের পক্ষে টেকসই কোনো ব্যবস্থা নয়, এগিয়ে যাওয়ার পথে শক্তিশালী কোনো পথও নয়; বরং সড়ক আর পরিবেশ তথা জলবায়ুর এমন পরিস্থিতির গুমোট ভাব জীবন-জীবিকার জন্য সরাসরি হুমকি আর ভয়।

আমাদের এই মানসিক দ্বন্দ্ব ও ভয়ের কারণ বুঝতে সড়ক নিরাপত্তার বাস্তব চিত্রের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে চলতে গিয়ে মানুষের মনে এক স্থায়ী ভীতি তৈরি হচ্ছে, ফলে দৈনন্দিন চলাচলে সাহসের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে; নতুন কিছু করার ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে মানসিক দ্বন্দ্ব। অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নেতিয়ে পড়ে চূড়ান্ত হতাশায় ভুগছে। এমন হুমকির মুখে কোনোভাবেই ভালো কিছু আশা করা যায় না। এর ফলে মানুষ নিজ সমাজ ও দেশের প্রতি অনাস্থা থেকে নিজেদের বাঁচাতে অন্য কোথাও পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করবে—যা সমাজের চরম দুর্দশারই নামান্তর এবং সামাজিক প্রগতির প্রধান অন্তরায়। এই বাধা জীবনের গতিকে যখন-তখন থমকে দেবে এবং জীবনের অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। শুধু তাই নয়, বাস্তবেও ঘটছে; আটকে যাচ্ছে সম্ভাবনার অনেক দ্বার। এতে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকছে না। পথ যেখানে সৃষ্টির মাধ্যম আর জলবায়ু যেখানে উৎপাদন ও উন্নয়নের সমন্বয়ক, সেখানে এমন বৈরী পরিস্থিতি আমাদের আস্থার ঘাটতিকে কেবলই দীর্ঘায়িত করছে। পরিবেশ তথা জলবায়ুর বিষয়ে এডিবির ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল ইয়েভগেনি জুকোভ উল্লেখ করেন, ‘এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রগতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো এর উপকূলীয় এলাকা। তবে সমুদ্রের ক্রমাগত উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তীব্র দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলো ধীরে ধীরে তাদের ভূখণ্ড হারাচ্ছে। আমরা এখন একটি জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি।  (দৈনিক ইত্তেফাক, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬)

সড়ক নিরাপত্তার এই অভ্যন্তরীণ সংকটের সমান্তরালে আমাদের পরিবেশ ও জলবায়ুগত অস্তিত্বও আজ চরম হুমকির মুখে। তবে এমন অবস্থায় ‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’ দেখে বসে থাকার মতো সময় হাতে নেই। সড়ক নিরাপত্তায় বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান রয়েছে। তবে অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সরকারসহ বেসরকারি পর্যায়ে নিসচা, যাত্রী কল্যাণ সমিতি, রোড সেফটি ফাউন্ডেশনসহ সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের সুপারিশের সমন্বয়ের আলোকে দ্রুত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার সংশ্লিষ্ট সবার। ২২শে অক্টোবর, ২০২৬ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক নিরাপত্তায় নেওয়া কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রকাশ্যে মূল্যায়ন করতে হবে। কী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা দেশবাসীকে জানাতে হবে।’ জলবায়ু রক্ষায় সাগর থেকে দেশের সর্ব উত্তরের কৃষিজমি পর্যন্ত নানাবিধ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। এগুলোরও লক্ষ্যাভিমুখি সমন্বয় দরকার। আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের সাবেক বিশেষ দূত মেরি রবিনসন লিখেছেন, ‘… বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের এই সময়ে প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টিকে আপাতত কম জরুরি বলে মনে হতে পারে। অনেকের ধারণা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে মনোযোগ দেওয়া যাবে। কিন্তু এমন ভাবনা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। (আমার দেশ অনলাইন  ০২ নভেম্বর ২০২৬) 

লেখক, সাহিত্য ও সংস্কৃতিজন, ঠাকুরগাঁও

আরও পড়ুন