EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

জাতীয় শিক্ষা নীতি ও একটি আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন

এ ইউ দৌলা

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

জাতীয় শিক্ষা নীতি ও একটি আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
অ অ

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড— আমাদের স্কুলজীবনের কৈশোরে এই বাক্যটির ভাবসম্প্রসারণ ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ পাঠ, আমরা পড়তাম, মুখস্থ করতাম এবং খাতায় লিখে নম্বর পেতাম। আমরা পড়তাম ঠিকই কিন্তু বুঝতাম না যে শিক্ষা আসলে কী? শিক্ষা বলতে কী বোঝায়, আর কেনই বা শিক্ষাকে মেরুদণ্ড বলা হয়। আজ ৪০ বছর পর মাত্র একটু অনুভব করতে পারছি যে ‘শিক্ষা’ শব্দটির মাঝে কী বিরাট এক মানসিক জগৎ লুকিয়ে আছে! কিছুটা অনুমান করতে পারছি, কেন আমাদের সমাজে আজ এত বিশৃঙ্খলা আর কেনই বা মাননীয় স্পিকার মহোদয় সেদিন অত্যন্ত আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, “…সকলে চোর।”

ভাবছি, যদি আজ থেকে ৪০ বছর আগে এদেশের স্কুল-কলেজ ও সামাজিক শিক্ষার প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত করা হতো যে, ‘আত্মসম্মানবোধই জাতির মেরুদণ্ড’; যদি শেখানো হতো ‘দায়িত্ববোধ, সততা আর সহমর্মিতাই আত্মসম্মানী মানুষের একমাত্র পরিচয়’—তবে আজ এই রাষ্ট্রের চেহারা ঠিক কেমন হতো? তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসে গেল, আমাদের শিক্ষানীতির লক্ষ্য আসলে কী?

খুঁজে দেখলাম, যার ওপর দাঁড়িয়ে আজকের শিক্ষাব্যবস্থা, সেই ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ৩০টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা রয়েছে। ভাবছি—লক্ষ্য কীভাবে ৩০টি হতে পারে? ‘লক্ষ্য’ শব্দটিই তো একবচন। তিরন্দাজ শিকারি যখন ধনুকে তীর চড়ান, তখন তার লক্ষ্য থাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিন্দু; একজন সুটার যখন তাক করেন তখন তার লক্ষ্য থাকে কেবল একটি বিন্দু; সেটি এমন বিন্দু, যা ভেদ করতে পারলে পুরো পরিকল্পনা সফল হয়। তাহলে শিক্ষানীতিতে কেন এতগুলো লক্ষ্য আর সে সব লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিই বা কী? ২০১০ সালের পর দেড় দশক চলে গেছে, সেদিনের শিশুরা আজ যুবক হয়েছে সেই শিক্ষানীতির ওপরেই। কিন্তু আসলেই কি আমাদের রাষ্ট্র সেই শিশুদের সাথে ন্যায়বিচার করতে পেরেছে? সম্ভবত না; যদিও সেই দায় অনেক কিছুর সাথে যুক্ত, তবুও আমার মনে হয় সেই ব্যর্থতার একটি মৌলিক কারণের সাথে যুক্ত হয়ে আছে ‘শিক্ষার লক্ষ্য’ নামক বিষয়টি।

আমার অনুভব, শিক্ষানীতির একটি মাত্র লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন যা হবে স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট এবং অটুট বিন্দুতে নিবদ্ধ—আর তা হলো “আত্মসম্মানী নাগরিক সৃষ্টি”। কেন এই একটিমাত্র লক্ষ্যই বর্তমান যুগের সব রাষ্ট্রের শিক্ষানীতির মূল মন্ত্র হওয়া উচিত এবং কীভাবে এই নীতির মাধ্যমে একটি অপরাধমুক্ত সেরা রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে, তা নিবন্ধের নিচের অংশে তুলে ধরা হলো।

কোনো বৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিক বা জাতীয় প্রচেষ্টায় যখন বহুবিধ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, তখন তা আর ‘লক্ষ্য’ থাকে না, বরং হয়ে ওঠে নানা রকমের উপলক্ষ। আসলে একাধিক লক্ষ্য মানে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যই না থাকা। যখন একজন শিক্ষক বা নীতিনির্ধারক ৩০টি ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য একসঙ্গে নিয়ে ক্লাসে যান, তখন তার মূল ফোকাস হারিয়ে যায়। তিনি হয়তো কোনো একটি লক্ষ্যের প্রতি বেশি গুরুত্ব এবং অন্যটির প্রতি কম গুরুত্ব দিয়ে ফেলতে পারেন। শিক্ষক নিজেও হয়তো দ্বিধায় আক্রান্ত হতে পারেন এবং শেষে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকেই শিক্ষার মূল লক্ষ্যে পরিণত করে ফেলতে পারেন। এমন শিক্ষাব্যবস্থা যে লক্ষ্যহীন ও জিপিএ-সর্বস্ব তত্ত্বে পর্যবসিত হয়, তার প্রমাণ হাতের কাছেই রয়েছে। বিগত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, ২০১০ সালের শিক্ষানীতির ৩০টি লক্ষ্য তেমন কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি কেন? কারণ আমরা সবকিছুকে লক্ষ্য বানিয়েছি, আর মানুষ গড়ার মৌলিক জায়গাটিতে ফোকাস করতে ভুলে গেছি। তাই শিক্ষানীতির লক্ষ্যকে বিক্ষিপ্ত না রেখে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির করা জরুরি।

কেন আত্মসম্মানী নাগরিক সৃষ্টিই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন? 

একটি শিশু যখন জীবনের প্রথম ১৬ বছর (প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত) শিক্ষা গ্রহণের সেরা সময়ে তার সিলেবাসের যেকোনো পাঠের মধ্য দিয়ে আত্মসম্মানবোধের মৌলিক মানসিকতা নিয়ে বড় হয়, তখন তার নৈতিক গঠন এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে যায়। যদি শৈশব থেকেই শিশুটি এই শিক্ষা পায় যে, “দায়িত্ববোধসম্পন্ন মানুষই সেরা মানুষ, বিশুদ্ধ সততা দিয়ে দায়িত্ব পালন করাই সেরা মানুষের পরিচয় এবং সহমর্মিতার সাথে দায়িত্ব পালন করাই একজন মানুষের সেরা জীবন”—তখন এই তিনটি অন্তর্নিহিত শক্তি তার সত্তার আত্মসম্মানী পরিচয় হয়ে ওঠে। জীবনের প্রথম ১৬ বছরের মানসিক ক্যানভাসে সেই দায়িত্ববোধ, সেই সততা আর সহমর্মিতার চর্চার মধ্য দিয়ে বড় হওয়া একটি শিশু যখন রাষ্ট্রে প্রবেশ করে, তখন সে হয়ে ওঠে এক অনন্য নাগরিক।

একজন আত্মসম্মানী নাগরিক যখন জীবনের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হন, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আত্মসম্মানী মানুষ কখনোই আইনকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে না; সে বিশ্বাস করে, নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা তার নিজস্ব মর্যাদার প্রতীক। পেশা ছোট হোক বা বড়, সে সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিজের কাজ সম্পন্ন করে। যদি সে ছাত্র হয়, তবে সে নোট মুখস্থ করে সার্টিফিকেট অর্জনের চেয়ে প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হয়। যদি সেই ব্যক্তি কোনো কর্মকর্তা হন, তবে তিনি হন সৎ এবং নিবেদিতপ্রাণ—যিনি যেকোনো ছোট বা বড় দুর্নীতিকে নিজের আত্মসম্মানের ওপর চরম আঘাত বলে মনে করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন প্রকৃত পিতার মতো, যিনি শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে মনুষ্যত্বের আলো জ্বেলে দেন। এমন মানুষ শ্রমিক ও পেশাজীবী হলে নিজ কাজের প্রতি তার থাকে তীব্র নিষ্ঠা; ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি হন সৎ, দয়ালু ও নীতিবান; এবং নেতৃত্বের চেয়ারে তিনিই হন জনগণের অভিভাবক। যখন একটি সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন মানুষ ছড়িয়ে পড়েন, তখন সেখানে অন্যায়, অপরাধ বা দুর্নীতির কোনো স্থান থাকতেই পারে না; কারণ এই মানুষগুলো অন্তরের গভীর থেকে অন্যায়কে ঘৃণা করতে অভ্যস্ত মানুষ। যে দেশের নাগরিকরা আত্মসম্মানবোধে মজবুত, সে দেশের কেউ রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করে না। এমন জনগণের হাতেই কেবল একটি সত্যিকারের কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে।

তবে শিক্ষার লক্ষ্য যদি হয় ‘আত্মসম্মানী নাগরিক তৈরি করা’, তবে শুধু লিখিত বা নীতিবাক্য দিয়ে তা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষাক্রমের প্রতিটি স্তরে চুলচেরা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। শিক্ষার সিলেবাসে যে কবিতা, ছড়া, গল্প, জীবনী বা উপমা অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তার প্রতিটি শব্দ ও পংক্তির সাইকোমেট্রিক মূল্যায়ন করা দরকার। দেখতে হবে যে, নির্দিষ্ট কোনো পাঠ্য, কোন ছবি, এমনকি কোন রঙ শিশুর অবচেতন মনে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে। একটি গল্প পড়ানোর পর শিশুটির মধ্যে সহমর্মিতা বা দায়িত্ববোধ কতটুকু বৃদ্ধি পেল, তা বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিমাপ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। সিলেবাস এমন হতে হবে যা মুখস্থ করাবে না, বরং শিশুকে আত্মজিজ্ঞাসায় উদ্বুদ্ধ করে বলবে, “আমি কীভাবে একজন দায়িত্বশীল ও সৎ মানুষ হতে পারব?”

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জ্ঞানার্জনের জন্য স্কুল-কলেজের ওপর খুব বেশি নির্ভর করার প্রয়োজন এখন আর নেই। ডিজিটাল দুনিয়ায় এখন জ্ঞান ও তথ্যের বন্যা; কিন্তু যা কিছুর সবচেয়ে বড় অভাব, তা হলো ভালো মানুষ হওয়ার পরিবেশ। তাই আধুনিক রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থাকে জ্ঞানার্জনের বদলে ‘আত্মসম্মানী মানুষ গড়ার অগ্রাধিকার’ দেওয়াই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সব কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের আত্মিক শক্তিকে নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। বিগত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছে, তা থেকে সব বিভ্রান্তি দূর করে শিক্ষানীতির একক ও মূল মন্ত্র হিসেবে “আত্মসম্মানী নাগরিক সৃষ্টি”-কেই গ্রহণ করা দরকার।

তবে শিক্ষানীতি কিংবা শিক্ষাব্যবস্থা যা কিছুই হোক, প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক জীবনের সংস্কার। এই জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষের অবদান ও সচেতনতা দরকার। এই যুগে শিশুরা স্কুল-কলেজ থেকে যতটুকু শিখছে, তার চেয়েও অনেক বেশি শিখছে ডিজিটাল স্পেস থেকে। তাই সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা দরকার। 

তাই ডিজিটাল স্পেসের প্রতিটি পোস্ট দেওয়ার আগে একটু থামুন, নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনার এই পোস্টটিতে কী কী ভালো আর কী কী মন্দ উপাদান রয়েছে! আপনার বলা একটি শব্দ কীভাবে শিশুদের জীবনে ভালো অথবা মন্দ প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে একটু ভাবুন। ভাইরাল হওয়ার ট্রেন্ডে প্রায়ই কেউ কেউ এমন সব নোংরা আচরণ ও শব্দ দিয়ে কনটেন্ট প্রকাশ করছেন যার ক্ষতি পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার চেয়েও মারাত্মক, অথচ অনেকেই সেটা অবলীলায় করে চলেছেন। রাষ্ট্রের মালিক যেহেতু জনগণ, তাই জনগণের দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। অন্য কারো মুখের দিকে না তাকিয়ে নিজ দেশকে গড়ার সচেতন দায়িত্ব আপনার নিজেকেই নিতে হবে।

লেখক, মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক

আরও পড়ুন