EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

মানিক পশারীর দাফনে বাধা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান নিয়ে প্রশ্ন

এই বীরদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে হবে সবসময়, তাদের জীবিতকালে, এমনকি তাদের শেষ বিদায়ে

অদিতি করিম

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩২ এএম

মানিক পশারীর দাফনে বাধা, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান নিয়ে প্রশ্ন

অদিতি করিম। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্মানিত এবং শ্রদ্ধেয় মানুষ হলেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা, যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। এই অর্জন যাদের হাত ধরে এসেছে, তারা আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান।

বাংলাদেশের জন্মলগ্নে যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে, তাঁরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা। একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যে স্বাধীনতার লড়াই শুরু করেছিলেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের অনেকের হাতে প্রশিক্ষণ ছিল না, ছিল না আধুনিক অস্ত্র। ছিল শুধু বুকভরা সাহস আর একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। সেই সাহসকেই একমাত্র অস্ত্র করে তাঁরা যুদ্ধে নেমেছিলেন।

এই বীরদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে হবে সবসময়, তাদের জীবিতকালে, এমনকি তাদের শেষ বিদায়ে।

কিন্তু ২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে আমরা লক্ষ‍্য করছি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ২৪-এর আন্দোলনের সাথে তুলনা করার চেষ্টা করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে ২৪-এর আন্দোলনকে বড় করে দেখানোর এক বিকৃত মানসিকতা অনেকের মধ্যে দেখা যায়।

একটি ক্ষুদ্র বিভ্রান্ত গোষ্ঠী সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্হাপনা ভাঙচুর করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করেছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পর্যন্ত পরানো হয়েছে। এসব যারা করেছে, তারা যতটা না মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করেছে, তার চেয়ে বেশি ২৪-এর আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শুরু থেকেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এইসব স্বাধীনতা বিরোধী অপতৎপরতার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তারেক রহমান বলেছেন, সবার আগে একাত্তর। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সাথে অন্য কিছুর তুলনা হতে পারে না। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার ২৪-এর আন্দোলনের সাথে একাত্তরের তুলনা না করার আহবান জানানো হয়েছে।

কিন্তু তারপরও একাত্তরের পরাজিত শক্তি নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের এক নগ্ন প্রকাশ আমরা দেখলাম পিরোজপুরে।

পিরোজপুরে যুদ্ধাপরাধে দন্ডিত জামায়াত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অন্যতম সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর লাশ দাফনে বাধা দেওয়া হয়েছে। অবশেষে সরকারের হস্তক্ষেপে ১৫ ঘণ্টা পর পুলিশ প্রহরায় দাফন করা হয়। শনিবার রাত ২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর (৮৭) লাশ দাফন করা হয় বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো শরিফুল ইসলাম। এর আগে এ মরদেহে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানে এবং পিরোজপুরে কবর দিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা বাধা প্রদান করে বলে অভিযোগ করেন তার স্বজনরা।

পরে পিরোজপুর জেলা পুলিশের সহায়তায় লাশ সরিয়ে নেয়া হয় পুলিশ লাইনসে। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে গার্ড অফ অনার শেষে বিশেষ নিরাপত্তায় মরদেহ ঘিরে রাখা হয়।

রাত ১টার দিকে সদর থানা পুলিশের সহায়তায় মানিক পশারীর মরদেহ চিতলিয়া গ্রামের বাড়ি নিয়ে যায় স্বজনরা।

সেখানে রাত ২টার দিকে তার দাফন সম্পন্ন করে পুলিশ। এ সময় মানিক পশারীর স্ত্রী-সন্তান উপস্থিত ছিলেন।

মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার বলেন, “আমার ভাই মারা গেছেন। প্রথমে আমরা তাকে দাফনের জন্য পিরোজপুরে নিয়ে আসি। তখন দাফন করতে না পারায় আমরা বিপাকে পড়ি।”

গত শনিবার দুপুর ১২টার পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানিক পশারীর মরদেহ নিয়ে আসলে জেলা জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ে তার স্বজনরা।

মানিক পশারীর মেয়ে জামাই ফারুক হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পরে মানিক পশারী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকায় তার (মেয়ে জামাই) কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দুই মাস ধরে তিনি শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে শনিবার সকাল ১০টায় মৃত্যুবরণ করেন।

“পরে দুপুর ১২টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে তাকে গার্ড অফ অনারের জন্য আনা হলে বাধা প্রদান করা হয়। তিনি একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা। পরে পুলিশ তাকে পুলিশ লাইনসের ভিতরে গোপনে গার্ড অব অনার দিয়ে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।”

তখন পিরোজপুর জেলা জামাতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, “মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, তাকে কোনোভাবেই গার্ড অনার দিতে দেয়া হবে না। পিরোজপুরের মাটিতে মানিক পশারীর লাশ দাফন দিতে দেয়া হবে না।”

এ সময় শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতেও দেখা গেছে।

প্রশ্ন হলো, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিনা, তা বিচার করার দায়িত্ব জামায়াতকে কে দিল?

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জামায়াতের এতো আক্রোশ কেন?

যে দলটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করেছিল, তারা কে মুক্তিযোদ্ধা, সেই সার্টিফিকেট দেয় কি করে? এই ধৃষ্টতার সাহস তারা পায় কীভাবে?

জামায়াতের এই কাজের প্রতিবাদ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। বেশ কিছু সংগঠন এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে।

পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা-কর্মীদের বাধা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসক ও তরুণ রাজনীতিক তাসনিম জারা। এ ঘটনার জেরে জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?’

তাসনিম জারার এই বক্তব্য যেন বাংলাদেশের জনগণের মনের কথার প্রতিধ্বনি। কিন্তু জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে এবিষয়ে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জামায়াত কি তাহলে এধরনের জঘন্য কর্মকাণ্ড সমর্থন করে?

একজন মুসলমানকে মৃত‍্যুর পর কবরে বাঁধা প্রদান করা ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে না। এই ঘটনায় নীরব থেকে জামায়াত কি প্রকারন্তে ইসলাম বিরোধী কাজের প্রতি মৌন সমর্থন জানালোল না?

এ দেশের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। এটাই আমাদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি, রীতি। একজন মানুষের চিরবিদায় তাকে দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে নিয়ে যায়। সবাই তাকে সম্মান জানিয়ে শেষ বিদায় জানায়।

রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, গণতন্ত্রে তা স্বাভাবিক। কিন্তু মৃত্যুর পরও কি বিরোধ থামবে না? একজন মানুষের কবর দেওয়া নিয়েও কি রাজনীতি করতে হবে? মৃত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁর দাফনে বাধা না দেওয়া, এগুলো তো আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও মানবিকতার সবচেয়ে মৌলিক শিক্ষা।

কিন্তু বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে যা করা হয়েছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। এর দায় শুধু পিরোজপুরের জামায়াতের নয়, কেন্দ্রীয় জামায়াতেরও।

আমাদের সমাজে সাধারণত কবর খোঁড়ার কাজ করেন পুরুষেরা, বিশেষ করে প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়স্বজন। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী বিষয়টি হলো, এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁড়তে হয়েছে তাঁর মেয়ে ও বোনকে। বাংলাদেশের সমাজে এমন দৃশ্য বিরল। এই পরিস্থিতি যারা সৃষ্টি করেছেন, তাদের প্রতি শুধু করুণাই করা যায়।

একজন মানুষ, যিনি একদিন এই দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাঁর নিথর দেহ পড়ে আছে, অথচ পাড়া-প্রতিবেশী কেউ জানাজা-দাফনে এগিয়ে আসছেন না। কী অদ্ভুত প্রতিদান আমরা মানিক পশারীকে দিলাম!

মানিক পশারীকে শেষযাত্রায় যে অসম্মানের মুখোমুখি হতে হলো, তা খুবই লজ্জাজনক। একজন মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে ছবি আমরা দেখলাম, তা কখনোই কাম্য নয়।

এ ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের নেতা-কর্মীদের একটি অংশও পূর্বসূরিদের উত্তরাধিকারই বয়ে বেড়াচ্ছেন, অতীতের ভুলের জন্য অনুতপ্ত নন। জামায়াতে ইসলামী যদি সত্যিই একাত্তরের কলঙ্কিত অবস্থান থেকে নিজেদের সংশোধন করত, তাহলে আজ মানিক পশারীর জানাজায় নিজেরাই শরিক হতে পারত। কিন্তু সেই উদারতার পরিচয় তারা দিতে পারেনি। বরং এমন আচরণ দলটির পুরোনো ক্ষতকেই আবার সামনে আনছে, আর তাতে শেষ পর্যন্ত দলটি নিজেরই ক্ষতি করছে।

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা পেয়েছি আমাদের মাতৃভূমি, পবিত্র জাতীয় পতাকা। একাত্তরের পরাজিত শক্তি আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস মুছে ফেলতে পারবে না কোনদিন। মানিক পশারীর শেষ যাত্রায় যারা বাধা দিয়েছে, তারা শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করেনি, মহান মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করেছে। দেশের জনগণ এই তৎপরতার নিন্দা জানিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, এদেশের মানুষ স্বাধীনতার পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। একাত্তর কে অস্বীকার করে এদেশে রাজনীতি করা যাবে না।

অদিতি করিমঃ লেখক ও নাট্যকার।

ইমেইলঃ [email protected]

আরও পড়ুন