প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন, তারেক রহমানের সামনে বড় দায়িত্ব
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন’—এই তিন ধারণার ভিত্তিতে দেশের উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেছেন
এম. ওসমান সিদ্দিক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১০ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন এক সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, যখন দেশের মানুষ পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে। তাঁর সামনে যেমন বড় সুযোগ রয়েছে, তেমনি দায়িত্বও ব্যাপক। এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ইতিহাস কঠোরভাবে মূল্যায়ন করবে বলে মনে করছেন লেখক।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে তারেক রহমান বলেছেন, তাঁকে কে ভোট দিয়েছেন, কে অন্য কাউকে ভোট দিয়েছেন কিংবা কে ভোট দেননি—তা বিবেচনায় না নিয়ে সরকার সবার জন্য কাজ করবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও দুর্নীতি দমনকেও অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি। এখন এসব প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব শাসনব্যবস্থায় রূপ দেওয়াই মূল চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের রয়েছে বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী, উৎপাদনশিল্প, প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন’—এই তিন ধারণার ভিত্তিতে দেশের উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, উৎপাদনশিল্পের বিকাশ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথাও বলেছেন তিনি।
দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার পরিচালনা
লেখকের মতে, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি পরিকল্পনার অভাব নয়; বরং রাজনৈতিক ব্যস্ততা ও দলীয় স্বার্থে জড়িয়ে পড়ে সংস্কারের লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়া। শুধু প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরিবর্তন করলেই হবে না, সরকার পরিচালনার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
এ জন্য এমন জনপ্রশাসন প্রয়োজন, যা রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে রাষ্ট্রের সেবা করবে। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। ভিন্নমতকে বিরোধিতা বা আনুগত্যহীনতা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন লেখক।
তারেক রহমানের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী, বিএনপিকে ভোট দেওয়া, অন্য দলকে ভোট দেওয়া কিংবা ভোট না দেওয়া—সব নাগরিকের অধিকার সমান হওয়া উচিত। রংপুরের কৃষক, গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক, ঢাকার উদ্যোক্তা, চট্টগ্রামের শিক্ষার্থী কিংবা বিদেশে থাকা বাংলাদেশি—সবার জন্য কাজ করতে হবে সরকারকে। লেখকের মতে, যাঁরা ভোট দেননি, তাঁরাও সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারলেই একজন নেতা প্রকৃত জাতীয় নেতায় পরিণত হন।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবাসীদের কাজে লাগানো
আগামী এক দশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারি ব্যয় বাড়ানো যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষ কর্মী, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, আধুনিক অবকাঠামো এবং স্থিতিশীল নীতিমালা।
লেখক মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হলে চুক্তির শর্ত রক্ষা, নিয়মকানুনের ধারাবাহিকতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। তরুণদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যাতে তাঁরা দেশে থেকেই কর্মজীবন গড়তে পারেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের শুধু রেমিট্যান্সের উৎস হিসেবে না দেখে বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি সহযোগী ও পরামর্শক হিসেবেও কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন লেখক। তাঁদের পুঁজি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের মাপকাঠি
রাজনৈতিক বিজয় সাময়িক হলেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন টিকে থাকে—এ কথা উল্লেখ করে লেখক বলেছেন, সরকারের সাফল্য নির্ধারিত হবে বাস্তব পরিবর্তনের মাধ্যমে। তরুণেরা রাজনৈতিক যোগাযোগ ছাড়াই কর্মজীবনে সফল হতে পারছেন কি না, উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা করতে পারছেন কি না, নাগরিকেরা প্রভাব ছাড়াই ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না এবং কৃষকেরা তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নই গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমানকে নিজের সঙ্গে একমত ব্যক্তিদের পাশাপাশি ভিন্নমতাবলম্বী অর্থনীতিবিদ, তরুণ, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কৃষক, নারী উদ্যোক্তা ও প্রবাসীদের কথাও শোনার পরামর্শ দিয়েছেন লেখক। একজন সফল প্রধানমন্ত্রীর সব উত্তর জানা জরুরি নয়; বরং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কার্যকর সরকার গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।
লেখকের মতে, তারেক রহমানের সামনে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক সুযোগ বিস্তৃত করা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে পারলে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নির্ধারিত হবে তিনি কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন, তা দিয়ে নয়; বরং তাঁর সময়ে দেশের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও নাগরিকদের জীবন কতটা উন্নত হয়েছে, তা দিয়ে।
লেখক: এম. ওসমান সিদ্দিক, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত।
সূত্র: সাউথ এশিয়া জার্নাল