বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন: মানবসভ্যতার অস্তিত্বের সামনে এক গভীর সংকট
জলবায়ু সংকটে ঝুঁকিতে বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষ
গোলাম সরওয়ার
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৮ পিএম
ছবি: লেখক
মানবসভ্যতার সামগ্রিক অগ্রগতি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। অথচ শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত ভোগব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ আজ সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্যকেই বিপন্ন করে তুলেছে, যার ওপর তার নিজের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক গভীর সংকট।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, চরম আবহাওয়া, খাদ্যনিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়টি ছিল এ যাবৎকালের রেকর্ডে থাকা উষ্ণতম ১১ বছর। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় প্রায় ১.৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। একই সময়ে সমুদ্রের তাপ সঞ্চয়ও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। এসব তথ্য পৃথিবীর জলবায়ুব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের স্পষ্ট প্রমাণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান প্রবণতার প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস (যেমন কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি)। কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বনের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। পাশাপাশি কৃষি, শিল্প ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকেও ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হচ্ছে। অন্যদিকে, নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক ক্ষমতাও আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা, ভারী বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে। সমুদ্রের পানি উষ্ণ হওয়া এবং হিমবাহ গলার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নিচু উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপ ও বদ্বীপগুলো বিশেষ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলছে, উষ্ণায়ন বিভিন্ন ধরনের চরম আবহাওয়ার সম্ভাবনা ও তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদন, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর। আর এই ক্ষতির শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রির অনেক নিচে এবং ১.৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখার প্রচেষ্টার অঙ্গীকার করা হয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ‘এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৫’ বলছে, দেশগুলোর ঘোষিত অঙ্গীকার পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও এ শতাব্দীতে উষ্ণতা ২.৩ থেকে ২.৫ ডিগ্রিতে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান নীতি চললে তা প্রায় ২.৮ ডিগ্রি হতে পারে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয়, বন সংরক্ষণ ও শিল্পে নির্গমন কমানোর উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, বিস্তীর্ণ বদ্বীপ ও দীর্ঘ উপকূলরেখার কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও তীব্র তাপপ্রবাহ এ দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের Bangladesh Country Climate and Development Report (2022) অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের অভ্যন্তরে স্থানান্তরিত বা বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। প্রতিবেদনটিতে কৃষি উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপকূলীয় বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রের উন্নয়ন, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা, লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও পরিকল্পিত পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা, উন্নত গণপরিবহন এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক নিঃসরণে দেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও এসব উদ্যোগ অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারে।
জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যায়বিচার। ঐতিহাসিকভাবে যেসব উন্নত দেশ অধিক কার্বন নিঃসরণ করে শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, তাদের দায় সবচেয়ে বেশি। অথচ তুলনামূলকভাবে কম নিঃসরণকারী অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এই পরিবর্তনের চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
তাই জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য সহজপ্রাপ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অভিযোজনের সুযোগ নিশ্চিত করা উন্নত দেশগুলোর নৈতিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। এই অর্থায়ন শুধু প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সময়মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে পৌঁছাতে হবে। একই সাথে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যেন এই অর্থ প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাজে লাগে।
জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার সামনে এক কঠিন পরীক্ষা। এর মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, দ্রুত নিঃসরণ হ্রাস, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীকে রক্ষা করা মানে শুধু বন, নদী ও সমুদ্রকে রক্ষা করা নয়; এর অর্থ মানুষের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা। বর্তমান প্রজন্মের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে আগামী পৃথিবী কতটা বাসযোগ্য থাকবে।
লেখক: জলবায়ু অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির কর্মকর্তা
(তথ্যসূত্র: ডব্লিউএমও, ইউএনইপি ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অবলম্বনে)