EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

সিন্ডিকেটের কবলে জনজীবন: স্থানীয় বাজার থেকে আন্তর্জাতিক পরিসর

মাসুদ আহাম্মদ সুবর্ন

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম

সিন্ডিকেটের কবলে জনজীবন: স্থানীয় বাজার থেকে আন্তর্জাতিক পরিসর
অ অ

আকাশে মেঘ নেই, অথচ বজ্রপাত! বলা নেই, কওয়া নেই, চলতে-ফিরতে হঠাৎ করেই কোনো কারণ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার এক অদ্ভুত সংস্কৃতি আমাদের দেশে জেঁকে বসেছে; যা বহাল রয়েছে সময়ের পরম্পরায়। যার নেপথ্য কারিগর হলো ‘সিন্ডিকেট’। এই চরম অব্যবস্থাপনা এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে অলিখিত এক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সিন্ডিকেটের অদৃশ্য খেলায় প্রতিনিয়ত মানুষ দিশেহারা ও উৎকণ্ঠিত। শুরুতে দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে না পাওয়া গেলেও, সময়ের সাথে সাথে এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। পণ্যের গুণগত মানের চেয়ে তখন দামের দাপটই মুখ্য হয়ে ওঠে, চারদিকে আলোচনার ঝড় বয়। মানুষের এই চরম অসহায়ত্বে আড়ালে-আবডালে মুচকি হেসে দামের একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে অসাধু চক্র মেতে ওঠে নতুন কূটকৌশলের সুবিধাজনক ছন্দে। বাহ্! কী চমৎকার! নাকি মচৎকার? হ্যাঁ, 'চৎকারই' বটে! কারণ, সিন্ডিকেটের এই আগ্রাসী দাপটে আমরা প্রতিনিয়ত 'মচৎ' করে ভাঙছি। আর চিন্তায় ও চেতনায় দুর্বল হয়ে হারচ্ছি মনোবল! 

সরকারি সদিচ্ছা বনাম সিন্ডিকেটের অদৃশ্য দাপট

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে সরকারি খাদ্য সংরক্ষণাগার ও স্থাপনা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গত ৬ অক্টোবর, ২০২৬ খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেছেন, ‘সিন্ডিকেট কোনো সরকারই পছন্দ করে না। আমরাও চাই, সিন্ডিকেট বলে যেন কোনো শব্দই না থাকে। কারণ সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব থাকলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

অথচ সরকারসহ সবার অপছন্দের এই ‘সিন্ডিকেট’ কিন্তু বাজারে যখন-তখন নিজের আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে অবিরাম। এতে জানা-অজানায় আর্থিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত—সবদিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। দামের জ্বালায় দম বন্ধ অবস্থা! মনে যাচ্ছে, ‘সিন্ডিকেট’-ই যেন শক্তিশালী সামাজিক উপাদান। সিন্ডিকেট সরকার আর জনতার ইচ্ছাকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে না, বরং বাজারে টিকে আছে বেশ সক্রিয়ভাবে। খেলছে দারুণ ভাবে! বাজারকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে ওষ্ঠাগত করে তুলছে। আবার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টাও চলছে জনতার ইচ্ছা আর সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবকে। নিজেকে শক্তিশালী করছে প্রায় যাবতীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়! তাদের চালে বেচাল মানুষের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি! হতভম্ভ মানুষ আজ কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দেখা যায় সরকারও অনেক সময় দিশাহীন! কখনও বা সাধারণ মানুষের মতোই তাদের চালে পা দিয়ে বসে থাকছে! মানুষ তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে, সরকার তাকিয়ে আছে মানুষের দিকে। কিন্তু ‘সিন্ডিকেট’ তাকিয়ে আছে শুধু নিজেরই দিকে-নিজের অস্তিত্বের বিকাশ আর প্রকাশে।

সর্বগ্রাসী চক্র: ক্ষতি সকলেরই

তবে সিন্ডিকেটের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট, তারা সাময়িক লাভে প্রসারিত মুখে হাসলেও ক্ষতি কিন্তু দিনশেষে তাদেরও হচ্ছে। কেননা, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তো আর সব পণ্যের সিন্ডিকেট একাধারে করতে পারে না। এখানে অনেকেই জড়িয়ে আছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে। কেউ চালের সিন্ডিকেট করছে, তো কেউ ডালের; আবার কেউ ওষুধের, কেউ কাপড়ের, কেউ বা সবজির আবার অন্যজন রাস্তার কাজের বা সরকারি কোনো নির্মাণের। নিস্তার নেই কোথাও, এদিক-সেদিক বা সবখানে সিন্ডিকেট! সুতরাং দিনশেষে সিন্ডিকেটের জ্বালা কিন্তু সকলেরই জ্বালা! অদ্ভুত এই জ্বলন থেকে নিস্তার নেই কারোও।

প্রচলিত কোনো পণ্যকে গোডাউনে বা বাজারে আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কথার মারপ্যাঁচে দামের ওপর হেঁচকা টান দিতে পারলেই কেল্লাফতে (রাস্তায় যেমন ছিনতাইকারীরা করে)—এটাই সিন্ডিকেট। এরা জীবন আর জীবিকার ছিনতাইকারী। বেশি সময়ের প্রয়োজন নাই, অল্প সময়ে কথার মারপ্যাঁচেই বিপুল লাভ। এখানে কথায় কথা বাড়লেও টাকাও বাড়ে! এরপর সেই লাভের ঠিকানা হয় দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে। এভাবেই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে সিন্ডিকেট; আমাদের কারো না কারো গোচরে অথবা অগোচরে।

সিন্ডিকেট মানসিকতা প্রায় সর্বত্র 

ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের পৌর এলাকার ঠাকুরগাঁও রোড রেলওয়ে স্টেশন ক্রসিংয়ের কথাই ধরা যাক। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর ক্রসিংয়ের রাস্তার উপরই বসে মাছের বাজার—চলে রাত অবধি। মাছের ওপর ছোট-বড় অনেক লাইটের আলো জ্বলে ওঠে। রাত যত গভীর হয় আলো তত গভীর হয়! ঝিকিমিকি করে সোনালী-রূপালী মাছ! সেই আলোর ছটায় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। চকিত চাহুনিতে মুগ্ধ হন রাস্তার পথচারীরা। মুগ্ধতায় অনেকে পকেটের কথা না ভেবে দ্রুত কিনে নেন। এ যেন এক গোলকধাঁধা!

অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। বেশ বড় আকৃতির মাছ পাওয়া যায়, দেখতেও মন্দ নয়। কিন্তু দাম যেন আকাশছোঁয়া! অবশ্য মাছের চকচকে আকর্ষণে দরদাম কমার আগেই তা বিক্রি হয়ে যায়। হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী হওয়ায় এখানে সিন্ডিকেট ধারণার প্রভাব বেশ স্পষ্ট। তারা যে দাম হাঁকেন, সেখান থেকে নামার জো নেই। খুব একটা নামেনও না। ফলে আমার মতো অনেকেরই মাছ কেনার শখ থাকলেও, আর্থিক অনটনের কারণে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠে না।

শুধু এখানেই বা বলছি কেন? যেকোনো বাজারে বা যেকোনো আড়তে একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই সিন্ডিকেটের তাপ-উত্তাপ অনুভব করা যায় জোরে, সজোরে। বাজারে প্রায় সকলের চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই। এভাবে নিত্য সয়ে যাওয়া আমাদের জীবনের এক সাংবাৎসরিক সয়া হয়ে গেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের মাছ বাজারই নয়, সবজির আড়তে তাকালেও আজ সিন্ডিকেটের অসাধু তৎপরতা স্পষ্ট। এমন পরিস্থিতি এখন দেশের প্রায় সর্বত্রই দৃশ্যমান। একশ্রেণীর নীতিহীন মানুষের অতি-মুনাফার লোভ সাধারণ মানুষের ওপর অসহনীয় অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের উত্তাপ এখন আমাদের ঘরের রান্নাঘরেও এসে লেগেছে।

রান্নাঘরে এলপিজির আগুন ও কৃষিতে কৃত্রিম সংকট

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম অনেক বেশি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষণা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১২ কেজির সিলিন্ডার ১,৮৩৭ টাকা। অথচ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে দাম বেশ কম। সরকারি দর ও বাস্তব বাজারের এই ব্যবধান প্রমাণ করে—রান্নাঘরের এই অতিপ্রয়োজনীয় জ্বালানি খাতে সিন্ডিকেট জেঁকে বসেছে। এলপিজি ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারও যেন একরকম জিম্মি; তাদের চাপেই ক’মাসেই প্রায় ৩৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এরপরও নির্ধারিত দামের চেয়ে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।

কৃষি খাতেও এই চক্রের আঘাত মারাত্মক। শস্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত রংপুরে চলতি আমনের মৌসুমে টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের তীব্র সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা। চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ায় দিশেহারা তারা। তবে সার ব্যবসায়ীরা বলছেন কোনো সংকট নেই। অন্যদিকে কৃষকদের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চড়া দামে সার বিক্রি করলেও জোড়ালো ব্যবস্থা নাই। এভাবে ধীরে ধীরে জনজীবন সম্পৃক্ত প্রায় সকল ক্ষেত্রে দেখা-অদেখার নানা সূত্রে সিন্ডিকেট রাজত্ব জোঁকের মতো আঁকড়ে ধরছে।

৬ কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে

সিন্ডিকেটের চাপ এখন ঘর পেরিয়ে পুরো সমাজে আঘাত করছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। এমনকি কেবল গত এক বছরেই নতুন করে দরিদ্র হয়েছে প্রায় ২১ লাখ মানুষ। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বাজার সিন্ডিকেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের চরম অভাবই দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী।

অদ্ভুত ‘কমার্স ফিকশন’ : ট্রেনের টিকিট গায়েব এক মিনিটে

নিত্যপণ্যের পাশাপাশি যাতায়াত খাতও চক্রের বাইরে নয়। টিকিট কালোবাজারি ও অদৃশ্য সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নাট্যকার আশফাক নিপুণ লেখেন, “ঘড়ির কাঁটা ঠিক আটটায় পৌঁছাতেই সার্চ অপশনে ক্লিক করি। চোখের সামনে সারি সারি খালি সিট ভেসে ওঠে। কিন্তু ৮টা বাজতেই টিকিট কাটার প্রক্রিয়া শুরু করার পর ৮টা ১ মিনিটে দেখি গোটা দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ! চোখের পলকে একদম সব ফাঁকা!” সবার দ্রুতগতির ইন্টারনেট থাকলেও সব টিকিট বিক্রি সম্পন্ন হতে যেখানে ন্যূনতম ৮টা ৭ মিনিট বাজার কথা, সেখানে এক মিনিটে পুরো দুটি ট্রেনের সব টিকিট কীভাবে শেষ হয়ে যায়, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। জুল ভার্ন লিখেছিলেন সায়েন্স ফিকশন ‘৮০ দিনে বিশ্ব ভ্রমণ’, আর আমাদের রেলওয়ে লিখল ‘এক মিনিটে দুই ট্রেন গায়েব’-এর মতো কমার্স ফিকশন!

এদিকে ট্রেনের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে টিকিট ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গায়েব হওয়া এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। এ নিয়ে সিলেটের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা দায়ের করেন এবং পরবর্তীতে আদালত মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেয় পিবিআই-কে। বর্তমানে পিবিআইয়ের এক উপপরিদর্শক মামলাটি তদন্ত করছেন। (ইত্তেফাক ডিজিটাল ডেস্ক ০৮ অক্টোবর ২০২৬)

সব খাতে সিন্ডিকেটের থাবা ও অর্থ পাচার

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের অন্যতম আলোচিত ও ক্ষতিকর বিষয় হলো বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অসাধু চক্র। দেশের কয়েকটি বৃহৎ আমদানিকারক ও মিল-মালিকদের গ্রুপ যৌথভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করছে। গণমাধ্যমে প্রায়শই এটিকে ‘২৫ সদস্যের’ বা ‘১০ সদস্যের’ সিন্ডিকেট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এদের বিরুদ্ধে অভিবাসন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। দেশের সড়ক পরিবহন খাতে বাস-ট্রাক মালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের একাংশ মিলে গড়ে তুলেছে চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট। মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রবাসী শ্রমিকদের উড্ডয়ন নিয়ে কারসাজি করতে সক্রিয় রয়েছে উড়োজাহাজের ‘টিকিট মাফিয়া’ চক্র, যারা একযোগে সব টিকিট বুক করে পরবর্তীতে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করে। সোনা চোরাচালানের পেছনেও রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক।

স্বাস্থ্যখাতেও এমন চক্র সক্রিয়—সরকারি হাসপাতালে হার্টের রিং, কৃত্রিম অঙ্গ বা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহে নির্দিষ্ট কিছু অসাধু ঠিকাদারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে, যা ‘রিং বাণিজ্য’ বা ‘ওষুধ সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। হাসপাতাল থেকে রোগী আনা-নেওয়ার অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট কিংবা সরকারি রাস্তা ও বিভিন্ন ধরনের কনস্ট্রাকশন খাতের ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের কথা আমরা হরহামেশাই সংবাদপত্রে দেখছি। নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে বিভোর হলেও, দিনশেষে এক কিম্ভুতকিমাকার বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের সকলকে। এভাবে অদেখা টাকার চক্রে অনেকের জীবনচক্র মিশে দেশজুড়ে এক সর্বগ্রাসী চক্রব্যূহ তৈরি হচ্ছে, যার আচরণে আমরা সবাই বিভ্রান্ত ও হতবিহ্বল। ফলশ্রুতিতে ধূলিসাৎ হচ্ছে প্রত্যাশিত স্বাস্থ্য ও সামাজিক ব্যবস্থাপনা।

চাল, ডাল, ফল ও তেলের বাজারে লুটপাট

বর্তমানে খুচরা বাজারে মাল্টা ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি। অথচ নথিপত্র বলছে—ক্রয়মূল্য, আমদানি শুল্ক, পরিবহন খরচ ও মুনাফা মিলিয়ে প্রতি কেজি মাল্টার সর্বোচ্চ খরচ হওয়ার কথা ২১০ টাকা। অর্থাৎ খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কোনোভাবেই ২৫০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এর একটাই অর্থ, অসাধু সিন্ডিকেট জনগণের পকেট থেকে অবাধে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। একই অবস্থা সুগন্ধি চালের বাজারে। ১২০ টাকার পোলাওয়ের চাল বিক্রি হচ্ছে ২৪০ টাকায়। দেশে উৎপাদিত এই পণ্যের দামের ওপর কোনো যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব পড়ার কথা নয়। বলা হচ্ছে, বিদেশে রপ্তানির কারণে দাম চড়া। অথচ ২০০৯ সালে রপ্তানি শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে ২০২৫ সালে। তখনও এর দাম ১২০ টাকার বেশি হয়নি। হিসেব করলে দেখা যায়, শুধু পোলাওয়ের চাল থেকেই গত তিন মাসে আনুমানিক হাজার কোটিরও বেশি টাকা লোপাট হয়েছে। অন্যদিকে ডিমের বাজারেও চলছে লঙ্কাকাণ্ড। ক’দিন পূর্বের ১২০ টাকা ডজনের ডিম এখন ১৫০ টাকার ওপরে। মুরগির খাবারের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দিয়ে দামের এই উল্লম্ফন মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। তেলে আবার তৈলাক্ত অবস্থা সবসময় বিদ্যমান। এভাবে সময়ের আবর্তে স্থান থেকে স্থানান্তরে তৈরি হয়েছে এক দৃশ্য-অদৃশ্য সংকটের জাল।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব

শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই নানা ধরনের সিন্ডিকেট চক্র ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে সক্রিয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশ্লেষণে দেখা যায়, লাতিন আমেরিকায় (মেক্সিকো) মাদক ও ফেন্টানিল পাচারে কুখ্যাত ‘সিনালোয়া’ ও ‘সিজেএনজি’; ইউরোপে (ইতালি) কোকেন চোরাচালান ও রিয়েল এস্টেটে অর্থ পাচারে সক্রিয় ‘এন্দ্রাংগেতা’; পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আন্ডারগ্রাউন্ড ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও অবৈধ জুয়ায় লিপ্ত চীনা ‘ট্রায়াড’ ও ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক; মিয়ানমার ও কম্বোধিয়ায় মানব পাচার ও জোরপূর্বক সাইবার জালিকাতিলব্ধ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় স্ক্যাম গ্যাং। অন্যদিকে ডিজিটাল বিশ্বে করপোরেট হ্যাকিং ও ডিজিটাল মুক্তিপণ আদায়ে সক্রিয় বিকেন্দ্রীকৃত অনলাইন সাইবার সিন্ডিকেট ‘লকবিট’। এমনকি বর্তমানের বড় বড় যুদ্ধ-বিগ্রহের পেছনেও কাজ করছে এক ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও করপোরেট সিন্ডিকেট মানসিকতা!

অবশেষে করণীয় যদি ইচ্ছে থাকে!

সিন্ডিকেট ভাবনাটা বেশ জটিল আর কুটিল। শ্রমহীন আয় এবং অদৃশ্য মুনাফার লোভ সক্রিয় থাকায় এই প্রবণতা এখন ছোঁয়াচে রোগের মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। টাকার গন্ধে আমাদের অনেকের আত্মীয়-স্বজন বা পাড়া-প্রতিবেশীরাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছেন। এর পরিধি বিশাল এবং ভিন্ন ভিন্ন খাতের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে করপোরেট হাউসের কুবুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণ—সর্বত্রই আজ সিন্ডিকেটের ছায়া দৃশ্যমান।

এই সংকটের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত গত ১২ অক্টোবর মানববন্ধনে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে ক্যাব-এর সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘দেশে কসমেটিকস থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পর্যন্ত নকল ও ভেজালের বিস্তার ঘটেছে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির পেছনেও রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। পণ্য পরিবহনের বিভিন্ন পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত মূল্যের বোঝা চাপাচ্ছে। তাই ভোক্তাদের পকেট কেটে মুনাফা করা এই অসাধু চক্রকে দমন এবং বাজারে তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

জেনেশুনে কিংবা না বুঝে আমরা অনেকেই এর শিকার হচ্ছি; আবার কখনো কখনো সামাজিক বাস্তবতার কারণে অপারগ হয়ে এর পরোক্ষ সহযোগী হিসেবেও কাজ করছি। ফলে সমাজ থেকে অপরাধের ন্যূনতম লজ্জাটুকুও বিলীন হয়ে যাচ্ছে এবং জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সিন্ডিকেটের আগ্রাসী মানসিকতা। এই চক্র ভাঙা সম্ভব না হলে মানুষের মেরুদণ্ড কোনোদিনই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। অর্থনৈতিক অপরাধের পাশাপাশি এটি সমাজে চরম মানবিক সংকটও তৈরি করছে। তবে মানসম্মত জীবন-জীবিকার প্রশ্নে আমাদের আশাবাদী হতে হবে। এই অব্যবস্থাপনা নিরসনে সচেতন ভোক্তা, সরকার ও সৎ ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ও সুস্থ বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই, অবশ্য যদি আমরা সকলে চাই!

লেখক, সাহিত্য ও সংস্কৃতিজন, ঠাকুরগাঁও

আরও পড়ুন