EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

বিরোধীদলের লংমার্চ কর্মসূচি কেন গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে পারে?

অদিতি করিম

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

বিরোধীদলের লংমার্চ কর্মসূচি কেন গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে পারে?
অ অ

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রে সরকার এবং বিরোধীদলের সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি রয়েছে। সরকারের কাজ হলো নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির আলোকে দেশের কল্যাণ নিশ্চিত করা। 

অন‍্যদিকে বিরোধীদলের কাজ হলো সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। সরকারের সবরকম কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা। তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া। ভালো কাজের প্রশংসা এবং খারাপ কাজের সমালোচনা করা। পৃথিবীর উন্নত গণতন্ত্রে বিরোধীদল ছায়া সরকার গঠন করে, এই ছায়া সরকার সরকারকে সবসময় নজরদারিতে রাখে। এভাবেই একটি নির্দিষ্ট সময়ে সরকার ও বিরোধীদলের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জনগণ সরকার এবং বিরোধীদলের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করে। পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ যাদের যোগ‍্য মনে করে তাদেরকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। এটাই গণতন্ত্রের চিরায়ত পদ্ধতি। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তনের একমাত্র উপায় হলো নির্বাচন। বাংলাদেশে এখন সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত হলো, সংসদই হবে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। যা কিছু আলোচনা তা সংসদেই হবে। সংসদের বাইরে রাজপথে আন্দোলন সংসদীয় গণতন্ত্রের সংস্কৃতি নয়।

আমরা লক্ষ্য করেছি, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটি ভারসাম্য পূর্ণ সংসদ গঠিত হয়েছে। এখানে বিরোধীদল সংগঠিত এবং সরব। ফলে প্রথমদিন থেকেই সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। বিরোধীদল যেমন সরকারের সমালোচনা করছে তেমনি ভালো কাজের প্রশংসা করছে। সংসদে সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চার একটি ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সর্বশেষ কয়েকদিন আগে সমাপ্ত সংসদের অধিবেশন ছিল উত্তপ্ত এবং প্রাণবন্ত। 

আমাদের সংবিধানে দুই মাস পরপর সংসদ অধিবেশনের বিধান রয়েছে। তাই সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু সংসদ। বিরোধী দলের নেতাও সংসদের প্রথম অধিবেশনে বলেছিলেন, সংসদই হবে রাজনীতির মূল কেন্দ্র। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি। আমরা দেখলাম, সংসদ অধিবেশন শেষ করেই সংসদে যেসব বিষয় আলোচনা হয়েছে, সেগুলো নিয়েই বিরোধীদল শনিবার লংমার্চ কর্মসূচি শুরু করেছে। শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ১১–দলীয় ঐক্যের ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শুরু হয়। উদ্বোধনী সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে জনতার দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। লংমার্চের ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল গঠন, জুলাই গণহত্যার বিচার, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সার সংকট সমাধান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারত্ব বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন। অবাক বিষয় যে এই সব দাবি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে, আগামীতে আবারও হতে পারে, তাহলে সংসদের একটি বিষয় নিয়ে রাজপথে আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী? এর ফলে কি সংসদকে খাটো করা হলো না? এটি কি সংসদীয় গণতন্ত্রকে অকার্যকর করার কৌশল?

বিরোধীদলগুলো এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ করেছে। আবার এখন একই ধরনের কর্মসূচি পালন করে কি করতে চাইছে? 

সংসদের বাইরে এ ধরনের কর্মসূচি গণতন্ত্রকে কেবল দুর্বল করবে না, গণতন্ত্রকে ঝুঁকিতে ফেলবে। বিরোধীদল কি দীর্ঘ সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে চায়? বিরোধীদ‍ল যে দাবি উপস্থাপন করেছে তার দুটি অংশ রয়েছে। একটি রাজনৈতিক অন‍্যটি আর্থ- সামাজিক। রাজনৈতিক দাবির গুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট। সরকার সাফ জানিয়েছে গণভোট এবং সাংবিধানিক কাউন্সিলের ব‍্যাপারে তাদের অবস্থান। এর আইনি ও সাংবিধানিক ব‍্যাখ্যা আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন। আসল কথা হলো, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে সংবিধানের যেসব বিষয়ে সকল রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। এটা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে হবে না সংবিধান কাউন্সিলের মাধ্যমে হবে, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো সংবিধানের ধারা গুলো পরিবর্তন হলো কিনা। সরকার বলছে আমরা জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়ন করবো। জুলাই সনদের আলোকে তারা সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু বিরোধীদল সেই কমিটিতে যোগ দেয়নি। কেন? বিরোধীদল কি তাহলে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন চায় না? 

মাও সে তুং বলেছিলেন, বিড়াল কালো না সাদা সেটা বড় বিষয় না, বিড়াল ইঁদুর মারতে পারে কিনা সেটাই বড় বিষয়। তেমনি সংবিধান সংশোধন কাউন্সিল হলো না কমিটি হলো সেটা বড় কথা নয়, জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন হলো কিনা, সেটাই  আসল কথা। কিন্তু এই ছোট পদ্ধতিগত ইস্যুকে নিয়ে কেন বিরোধীদল রাজপথ উত্তপ্ত করতে চাইছে? এর পেছনে কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে? বিরোধীদল কি তাহলে গণতন্ত্র নস্যাৎ করতে চায়? এই প্রশ্নের জবাব বিরোধীদলকেই দিতে হবে।

বিরোধীদের দাবির অন‍্য অংশ হলো আর্থ- সামাজিক। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট থেকে শুরু করে দ্রব্যমূল‍্যের ঊর্ধ্বগতি। এইসব সমস্যা কি সরকার অস্বীকার করছে? সরকার কি বলেছে দেশে লোডশেডিং হচ্ছে না। গ্যাস সংকট নেই। সরকার কি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে না?

এসব কোনো সমস্যাই এই সরকারের সৃষ্ট নয়। বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি এবং অনিয়মের কারণে এই সংকটগুলো তৈরি হয়েছে। বিরোধীদলও তা জানে। এসব সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। সরকার আন্তরিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি করার চেষ্টা করছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে এজন্য জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছেন। তিনি বিরোধীদলকে এসব সংকট সমাধানের কোনো পথ জানা থাকলে তা বলতে বলেছেন। কিন্তু বিরোধীদল সমাধান খুঁজতে রাজপথে নেমেছে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিরোধীদল কি সমস‍্যার সমাধান চায় নাকি দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়। গ‍্যাস, বিদ‍্যুৎ সংকট সমাধানে চাই রাজনৈতিক ঐক্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য চাই রাজনৈতিক সহনশীলতা। কিন্তু বিরোধীদল রাজপথ উত্তপ্ত করে রাজনৈতিক ঐক্য ও সহনশীলতার ধারা নষ্ট করতে চাইছে। বিরোধীদল কি তাহলে গণতন্ত্র চায় না? তারা কি দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তর বিরোধীদলকেই দিতে হবে।

লেখক ও নাট্যকার

ইমেইল: [email protected]

আরও পড়ুন