EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সহায়তা করে চীনেরও অনেক কিছু অর্জনের সুযোগ আছে

ড. আজিম ইব্রাহিম

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সহায়তা করে চীনেরও অনেক কিছু অর্জনের সুযোগ আছে
অ অ

প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বাংলাদেশ আবারও আঞ্চলিক কূটনীতির দিকে তাকাচ্ছে। চলতি মাসে ঢাকা জানিয়েছে, তারা চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, একমাত্র রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমেই ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাস্তুচ্যুতির অবসান সম্ভব। বাংলাদেশ বরাবরই বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই।

এ ক্ষেত্রে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—দুই দেশের সঙ্গেই চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উভয় দেশেই চীনের বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। বঙ্গোপসাগর ঘিরে স্থিতিশীলতার বিষয়টিও বেইজিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাতেও চীন কয়েক বছর ধরে যুক্ত। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা গঠনে সহায়তা করেছিল চীন। এর লক্ষ্য ছিল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং রাখাইন রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করা।

নতুন করে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা তাই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু একটি মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখার বাইরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এটি এমন একটি আঞ্চলিক সমস্যা, যেখানে চীনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও জড়িয়ে আছে।

স্থিতিশীল রাখাইন চীনের স্বার্থেই

একটি স্থিতিশীল রাখাইন রাজ্য বিভিন্নভাবে চীনকে সুবিধা দিতে পারে। প্রথমত, অর্থনৈতিক দিক থেকে। চীনের আঞ্চলিক যোগাযোগ পরিকল্পনায় রাখাইনের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। চীন ও মিয়ানমার চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর অন্যতম। মিয়ানমারের উপকূল থেকে চীনে যাওয়া তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনও এ অঞ্চলকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

জুন মাসে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের চীন সফরের সময় দুই দেশ আবারও অর্থনৈতিক করিডর ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা তাই চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যায় না। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল সীমান্ত, কার্যকর স্থানীয় অর্থনীতি, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি এর বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি করে।

বাস্তবে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি পুরো অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় তৈরি করতে পারে।

সুতরাং রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটি অর্থবহ রাজনৈতিক সমঝোতা চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করার বদলে বরং তা এগিয়ে নিতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ বছরের চীন সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, বন্দর, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক করিডর নিয়েও দুই দেশ কাজ করছে। চলতি মাসেও ঢাকা ও বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা এ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এখানেই রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনীতির সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্ত করা কোনো অর্থনৈতিক করিডর এমন একটি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে, যার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তাই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে আঞ্চলিক উন্নয়ন থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর সমাধান আরও গভীর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তোলার ভিত্তি হতে পারে।

মানবিক সংকট ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আলাদা নয়

মানবিক সংকট ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রায়ই আলাদা নীতিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি পুরো অঞ্চলের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশ বিপুল চাপের মধ্যেও ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। এতে সরকারি সেবা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক চাপ পড়েছে। ঢাকা বারবার স্পষ্ট করেছে, অনির্দিষ্টকাল ধরে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

চীন এর আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের মধ্যকার সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটির আগের ত্রিপক্ষীয় কাঠামোতে প্রত্যাবাসন ও সংলাপের পাশাপাশি রাখাইন সংকট সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উন্নয়নকেও চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে।

শুধু সীমান্ত পার করে শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিলেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না। ফিরে যাওয়া মানুষের জন্য জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো ও নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে। অর্থনৈতিক পুনর্গঠন তাই রাজনৈতিক অধিকারের বিকল্প নয়। বরং সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা হলে এটি রাজনৈতিক সমঝোতাকে টেকসই করার প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে চীনের বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বৃহৎ অবকাঠামো ও উন্নয়ন বিনিয়োগের সক্ষমতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ চীনের রয়েছে। শুধু কূটনৈতিক চাপ বা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল অন্য পক্ষগুলোর তুলনায় এটি বেইজিংকে আলাদা অবস্থান দিয়েছে।

চীনের আরেকটি সুবিধা হলো মিয়ানমারে তার প্রবেশাধিকার। নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে মিয়ানমারে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পৃক্ততা সীমিত হয়েছে। বিপরীতে বেইজিং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং একই সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

এতে কূটনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০১৯ সালে ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সময় যে পরিস্থিতি ছিল, বর্তমান বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। তবে ধারাবাহিক যোগাযোগ এমন কিছু অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা প্রকাশ্য সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থানের মাধ্যমে সম্ভব নাও হতে পারে।

চীনের জন্য একটি কূটনৈতিক সুযোগ

বেইজিংয়ের জন্য সফলভাবে এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়া তার বৃহত্তর কূটনৈতিক লক্ষ্যও এগিয়ে নিতে পারে। চীন ক্রমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক সংলাপকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরস্পরসম্পূরক উপাদান হিসেবে তুলে ধরছে। রোহিঙ্গা সংকট সেই মডেল বাস্তবে কতটা কার্যকর হতে পারে, তা দেখানোর একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

যদি এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করা যায়, যা ধীরে ধীরে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও রাখাইনে স্থিতিশীলতার পরিবেশ সৃষ্টি করে, তাহলে এর সুফল শুধু রোহিঙ্গাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাবে। মিয়ানমার তার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে বেশি স্থিতিশীলতা পাবে। চীন আরও নিরাপদ অবকাঠামো, শক্তিশালী আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমার—উভয় দেশের সঙ্গে গভীরতর অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে লাভবান হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়তে পারে। বঙ্গোপসাগরও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে আরও বেশি অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত হতে পারে।

এতে নিরাপত্তাগত সুবিধাও রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট খুব কম ক্ষেত্রেই শুধু মানবিক শিবিরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, মানবপাচার, অনিয়মিত অভিবাসন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়োগ ধীরে ধীরে বাস্তুচ্যুতিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত করতে পারে। এসব চাপ কমানো তাই অঞ্চলের সব বড় পক্ষের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সহজ হবে না। রাখাইনের পরিস্থিতি এখনও কঠিন। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। যেকোনো টেকসই সমাধানে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং রোহিঙ্গারা যেসব এলাকায় ফিরে যাবে, সেসব এলাকার প্রশাসন—এসব প্রশ্নের সমাধান করতে হবে।

এসব সমস্যা কোনো একক দেশের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে চীনের অবস্থান প্রয়োজনীয় পক্ষগুলোকে একটি বাস্তব ফলাফলকেন্দ্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ দেয়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের সম্পৃক্ততাকে মানবিক দায়িত্ব ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। দুটি বিষয় পরস্পরকে শক্তিশালী করতে পারে।

একটি স্থিতিশীল রাখাইন চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে। আরও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে শক্তিশালী করে। নিরাপদ আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা বাণিজ্যকে সহায়তা করে। বাস্তুচ্যুতি কমলে অস্থিতিশীলতাও কমে। আর সফল কূটনীতি চীনের বৃহত্তর প্রতিবেশে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নে অবদান রাখার সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে।

নয় বছর পর রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আরেকটি প্রচেষ্টার চেয়ে বেশি কিছু দাবি করে। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো, যা একটি টেকসই সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এমন কাঠামোয় অবদান রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক উপকরণের অনেকটাই চীনের হাতে রয়েছে।

বেইজিংয়ের জন্য রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে সহায়তা করা শুধু এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটগুলোর একটি মোকাবিলা করা নয়; এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, যোগাযোগ ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থও এগিয়ে নিতে পারে।

ড. আজিম ইব্রাহিম ওয়াশিংটনভিত্তিক নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির বিশেষ উদ্যোগবিষয়ক পরিচালক।

এক্স: @AzeemIbrahim

সূত্র: আরব নিউজ

আরও পড়ুন