EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

পর্ব-৬

শিক্ষা ২০৫০: মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শন

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খান

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৫ এএম

শিক্ষা ২০৫০: মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শন
অ অ

শিক্ষক ২০৫০: শ্রেণিকক্ষের ‘বক্তা’ নন

মানুষ গড়ার কারিগর

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা আধুনিক, তা শুধু তার পাঠ্যক্রম, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা প্রযুক্তির ব্যবহার দিয়ে বিচার করা যায় না। শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে শেষ পর্যন্ত থাকেন একজন মানুষ—শিক্ষক।

আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, ভার্চুয়াল বাস্তবতা কিংবা ডিজিটাল শিক্ষার যত কথাই বলি না কেন, শিশুর চোখে স্বপ্ন জাগানো, তার ভেতরের সম্ভাবনা আবিষ্কার করা, ভুল করলে সাহস দেওয়া এবং তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব কোনো যন্ত্র একা নিতে পারবে না। তাই শিক্ষা ২০৫০-এর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে শিক্ষকের ওপর।

শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক, শুধু বক্তা নন : আমাদের প্রচলিত শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থী শোনে। শিক্ষক প্রশ্ন করেন, শিক্ষার্থী উত্তর দেয়।

শিক্ষক নম্বর দেন, শিক্ষার্থী সেই নম্বরের পেছনে ছোটে। ২০৫০-এর শ্রেণিকক্ষে এই সম্পর্ক বদলাতে হবে। শিক্ষক সেখানে শুধু তথ্যের সরবরাহকারী থাকবেন না। তিনি হবেন শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা ও সহযাত্রী।

তিনি শিক্ষার্থীকে শুধু বলবেন না, ‘এই উত্তরটি মুখস্থ করো।’ বরং প্রশ্ন করবেন—

‘তুমি কী মনে করো?’

‘কেন এমন হলো?’

‘এর অন্য কোনো সমাধান আছে কি?’

‘তোমার নিজের এলাকার কোনো সমস্যা দিয়ে বিষয়টি বোঝাতে পারবে?’

অর্থাৎ শিক্ষক শুধু উত্তর শেখাবেন না, উত্তর খুঁজে বের করার আনন্দও শেখাবেন। শিক্ষার্থীর মধ্যে কৌতূহল তৈরি করা, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া এবং নিজের মতো করে ভাবতে শেখানো হবে শিক্ষকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

স্থানীয় সমস্যাই হোক শিক্ষার্থীর গবেষণাগার : বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম, শহর ও মহল্লা একেকটি জীবন্ত গবেষণাগার। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও নদীভাঙন, কোথাও কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্যের সংকট, কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট, পরিবেশদূষণ কিংবা বিশুদ্ধ পানির সমস্যা।

শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নিয়ে এসব বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন। গণিত, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও সমাজবিজ্ঞানের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করবে এবং সম্ভাব্য সমাধান খুঁজবে। তখন একটি শিশু বুঝতে পারবে, সে শুধু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য পড়ছে না। তার অর্জিত জ্ঞান নিজের সমাজের কাজে লাগতে পারে। শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের এই সংযোগ শিক্ষার্থীর মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করবে। একই সঙ্গে পড়াশোনার অর্থও তার কাছে আরো স্পষ্ট হবে।

শিক্ষা ২০৫০ : মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শনকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হবে শিক্ষকের সহকারী : ২০৫০ সালের অনেক আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। এটি শিক্ষার্থীর শেখার গতি বিশ্লেষণ করতে পারবে, দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারবে এবং ব্যক্তিভেদে অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে পারবে। রোবট, ভার্চুয়াল বাস্তবতা ও আন্ত ক্রিয়াশীল প্রযুক্তি কঠিন বিষয়কে অনুকরণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানোর সুযোগ তৈরি করবে। একজন শিক্ষক কয়েক ঘণ্টা ব্যয় করে যে পাঠপরিকল্পনা বা অনুশীলনী তৈরি করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো তা কয়েক মিনিটেই তৈরি করে দিতে পারবে। তবে এখানেই শিক্ষক ও প্রযুক্তির ভূমিকার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি মনে রাখতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য দিতে পারে; শিক্ষক অনুপ্রেরণা দিতে পারেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল শনাক্ত করতে পারে; শিক্ষক হতাশ শিশুটির চোখের ভাষা বুঝতে পারেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শেখার গতি বাড়াতে পারে; শিক্ষক শেখাতে পারেন সততা, সহমর্মিতা, সাহস ও দায়িত্ববোধ। তাই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং শিক্ষকের দৈনন্দিন যান্ত্রিক কাজ কমিয়ে তাঁকে শিক্ষার্থীর সঙ্গে আরো বেশি সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়াই হওয়া উচিত।

শিক্ষকের সম্মান চাই, সঙ্গে জবাবদিহিও : আমরা প্রায়ই বলি, শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর। কিন্তু শুধু কথায় কোনো পেশাকে মর্যাদাবান করা যায় না। মেধাবী তরুণ-তরুণীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হলে প্রয়োজন উপযুক্ত বেতন ও আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, উন্নত প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা এবং কর্মজীবনে অগ্রগতির সুস্পষ্ট সুযোগ। একই সঙ্গে থাকতে হবে জবাবদিহি। মর্যাদা ও জবাবদিহি—দুটিকে পাশাপাশি চলতে হবে। প্রতিটি শিক্ষককে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পুনঃপ্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। বিষয়জ্ঞান ছাড়াও শিশুমনোবিজ্ঞান, যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান, ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতি, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষাদানে দক্ষ করে তুলতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও শুধু সনদ বা লিখিত পরীক্ষার ফল যথেষ্ট নয়। একজন প্রার্থী শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন কি না, প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেন কি না এবং শিক্ষার্থীর বিকাশে তাঁর আগ্রহ কতটা—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষকও হবেন আজীবন শিক্ষার্থী : ২০৫০-এর পৃথিবীতে কোনো শিক্ষক বলতে পারবেন না, ‘আমার পড়াশোনা শেষ।’ জ্ঞান ও প্রযুক্তি এত দ্রুত পরিবর্তিত হবে যে আজকের অনেক দক্ষতাই কয়েক বছর পর অপ্রতুল হয়ে যেতে পারে। তাই শিক্ষকদের জন্য প্রতিবছর নির্দিষ্ট শেখার সময় রাখা যেতে পারে। এই সময়ে তাঁরা নতুন বিষয় শেখা, নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করা, গবেষণা, সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখা এবং শ্রেণিকক্ষে নতুন শিক্ষাপদ্ধতি প্রয়োগের জন্য সময় দেবেন। শিক্ষকের নিজের শেখার জন্য প্রতিষ্ঠিত কাঠামো না থাকলে তাঁর কাছ থেকে আজীবন নতুন কিছু শেখার প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। যে শিক্ষক নিজে শিখতে ভালোবাসেন, তিনিই শিক্ষার্থীদের শেখার আনন্দ দিতে পারবেন।

একজন ভালো শিক্ষক বদলে দিতে পারেন একটি জীবন : একটি শিশুর জীবনে কখনো কখনো একজন শিক্ষকই হয়ে ওঠেন মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মানুষ। হয়তো কোনো একদিন তিনি শুধু বলেছিলেন, ‘তুমি পারবে।’ শিশুটি সেই কথাটি সারা জীবন মনে রেখেছে। শিক্ষা ২০৫০ তাই এমন বিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখে, যেখানে শিক্ষক শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করার জন্য শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করবেন না। তিনি প্রবেশ করবেন প্রতিটি শিশুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে। আমাদের লক্ষ্য শুধু ভালো ফল করা শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন এক প্রজন্ম, যারা জ্ঞানী, কিন্তু অহংকারী নয়; প্রযুক্তিতে দক্ষ, কিন্তু মানবিকতা হারায়নি; প্রশ্ন করতে সাহসী, আবার অন্যের মতামতকে সম্মান করে; বিশ্বমানের যোগ্যতা অর্জন করেও নিজের গ্রাম, সমাজ ও দেশকে ভুলে যায় না। এমন মানুষ তৈরিতে প্রযুক্তি সহায়তা করতে পারে। কিন্তু মানুষের চরিত্র, মূল্যবোধ ও স্বপ্ন গড়ে তোলার জায়গাটি মানুষেরই। আর সেই মানুষটি হলেন শিক্ষক।

শিক্ষা ২০৫০-এর মূলমন্ত্র :

বিশ্বকে ভাবো।

আনন্দ নিয়ে শেখো।

নিজের এলাকার সমস্যা সমাধান করো।

মানবতার সেবা করো।

শিক্ষক যদি এই চারটি দর্শন শিশুর মনে জাগিয়ে দিতে পারেন, তাহলে ২০৫০-এর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো প্রযুক্তি, ভবন কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ হবে না। সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে তার মানুষ।

[লেখাটি ‘শিক্ষা ২০৫০ : মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শন’ ধারাবাহিকের অংশ। শিক্ষা নিয়ে পাঠকের মতামত, সমালোচনা ও নতুন ধারণাকে স্বাগত জানাই।]

আরও পড়ুন