EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

পর্ব-৪

শিক্ষা ২০৫০: মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শন

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খান

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

শিক্ষা ২০৫০: মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শন
অ অ

শিক্ষক কি শুধু পাঠদানকারী, নাকি মানুষ গড়ার পথপ্রদর্শক?

২০৫০ সালের শিক্ষা কেমন হবে? এই প্রশ্ন উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, ভার্চুয়াল বাস্তবতা, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল পাঠ্যসামগ্রী কিংবা শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা শেখার ব্যবস্থা। প্রযুক্তি তখন আজকের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে যাবে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই।

তবে এত প্রযুক্তির মধ্যেও একটি কথা মনে রাখা জরুরি—যন্ত্র তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানুষ গড়ে তোলেন শিক্ষক। একজন ভালো শিক্ষক শুধু বই পড়ান না। তিনি বোঝার চেষ্টা করেন, কোন শিক্ষার্থীর কী আগ্রহ, কে কোথায় আটকে আছে, কার আত্মবিশ্বাস কম, আর কে একটু সুযোগ পেলেই ভালো কিছু করতে পারে। তিনি প্রশ্ন করতে শেখান, ভুল করতে ভয় না পেতে শেখান।

ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করার সাহস দেন। এই জায়গাটি প্রযুক্তি দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন।

শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী থাকবেন না : এখন একজন শিক্ষকের কাজের বড় অংশজুড়ে থাকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পাঠ্যসূচি শেষ করা, পরীক্ষা নেওয়া ও খাতা দেখা। ভবিষ্যতে এসব কাজের অনেকটাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তি সহজ করে দিতে পারে।

তাহলে শিক্ষকের প্রয়োজন কী? প্রয়োজন বরং আরো বেশি। ভবিষ্যতের শিক্ষক শুধু পাঠদান করবেন না; তিনি হবেন পথপ্রদর্শক, সহায়ক, অনুপ্রেরণাদাতা এবং চরিত্র গঠনের কারিগর। শিক্ষার্থীকে শুধু উত্তর বলে দেওয়ার বদলে তিনি প্রশ্ন করতে শেখাবেন। ‘এটি মুখস্থ করো’—এর বদলে তিনি হয়তো বলবেন, ‘তুমি কী মনে করো? কেন এমন মনে করো? অন্যভাবে কি সমস্যাটির সমাধান করা যায়?’ শিক্ষার সাফল্যও তাই শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করলে হবে না। একজন শিক্ষার্থী কতটা কৌতূহলী, সৃজনশীল, দায়িত্বশীল, নৈতিক ও সহমর্মী হয়ে উঠছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষা ২০৫০ : মানুষ গড়ার এক নতুন দর্শনশিক্ষককে মর্যাদা না দিলে পরিবর্তন সম্ভব নয় : আমরা প্রায়ই শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত করার কথা বলি। নতুন পাঠ্যক্রম, নতুন প্রযুক্তি, নতুন পদ্ধতি—এসব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু যাঁরা প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করবেন, সেই শিক্ষকদের কথা কতটা ভাবি? একজন শিক্ষক যদি সামাজিক মর্যাদা না পান, আর্থিকভাবে নিরাপদ না থাকেন, নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ না পান এবং নিজের দক্ষতা বাড়ানোর পরিবেশ না পান, তাহলে শুধু নতুন বই বা নতুন প্রযুক্তি দিয়ে শিক্ষার বড় পরিবর্তন আনা কঠিন। তাই ২০৫০ সালের শিক্ষক তৈরির আগে প্রয়োজন ২০৫০ সালের শিক্ষকনীতি নিয়ে ভাবা। শিক্ষকতা পেশায় মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট করতে হবে। নিয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। প্রশিক্ষণ শুধু চাকরির শুরুতে একবার হলেই চলবে না; এটি হতে হবে নিয়মিত, আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক। একই সঙ্গে শিক্ষকের মর্যাদার পাশাপাশি পেশাগত জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শিক্ষকের জায়গা নেবে? সম্ভবত না। বরং এটি একজন ভালো শিক্ষককে আরো কার্যকর করে তুলতে পারে। ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থীর গণিতে কোথায় বারবার ভুল হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তা দ্রুত শনাক্ত করতে পারল। তার জন্য আলাদা অনুশীলনও তৈরি করে দিল। কোনো বিষয় বোঝাতে ছবি, চলমান চিত্র বা শিক্ষামূলক খেলাও তৈরি করে দিল। শিক্ষার্থীর অগ্রগতির একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনও শিক্ষককে দিল। এতে শিক্ষকের কাজ কমবে না, বরং কাজের ধরন বদলাবে। একজন শিক্ষক তখন বেশি সময় দিতে পারবেন আলোচনা, সৃজনশীলতা, গবেষণা, মূল্যবোধ, নেতৃত্ব এবং শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত বিকাশে। রোবটও কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে সহায়তা করতে পারে—ভাষা অনুশীলন, মৌলিক দক্ষতার চর্চা কিংবা নির্দিষ্ট কিছু অনুশীলনে। এতে শিক্ষকের সময় বাঁচবে। কিন্তু একটি শিশুর মন খারাপ কেন, পরীক্ষায় খারাপ করার পর সে কেন চুপ হয়ে গেছে, বন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্ক কেন খারাপ—এসব বোঝার জন্য শুধু তথ্য যথেষ্ট নয়। সেখানে মানুষের প্রয়োজন। সহজ কথায়, প্রযুক্তি রুটিন কাজের জায়গা নিতে পারে, কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গা নিতে পারে না।

স্থানীয় সমস্যাই হোক শেখার উপকরণ : ভবিষ্যতের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শেখাবেন না। তাদের চারপাশের সমস্যাগুলো নিয়েও ভাবতে শেখাবেন। কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতা কেন হচ্ছে? বৃষ্টির পানি কিভাবে সংরক্ষণ করা যায়? কৃষকের উৎপাদন খরচ কিভাবে কমানো সম্ভব? স্থানীয় বর্জ্য দিয়ে নতুন কী তৈরি করা যায়? নদী ও পরিবেশ রক্ষায় কী করা যায়? গ্রামের একটি ছোট উদ্যোগকে প্রযুক্তির সাহায্যে আরো বড় বাজারে নেওয়া সম্ভব কি না? এসব প্রশ্নই হতে পারে শিক্ষার্থীদের প্রকল্প বা গবেষণার বিষয়।

তখন বিদ্যালয় শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির জায়গা থাকবে না। স্থানীয় সমস্যার সমাধান খোঁজার একটি ছোট গবেষণাগার হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ব থেকে শিখব, নিজের বাস্তবতায় : ভবিষ্যতের শিক্ষা নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা, দলগত কাজ, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতা এবং জীবনভর শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমাদেরও এসব থেকে শিখতে হবে। তবে অন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করলে হবে না।

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং মানুষের বাস্তব জীবনকে সামনে রেখেই আমাদের শিক্ষার নিজস্ব পথ তৈরি করতে হবে। বিশ্ব থেকে আমরা শিখব, কিন্তু সমস্যার সমাধান খুঁজব নিজেদের বাস্তবতা থেকে।

শিক্ষক আসলে মানুষ গড়েন : একজন স্থপতি ইট, বালু ও পাথর দিয়ে একটি ভবন তৈরি করেন। শিক্ষকও অনেকটা তেমন—তবে তাঁর উপকরণ হলো জ্ঞান, কৌতূহল, সাহস, মূল্যবোধ ও মানবিকতা। ২০৫০ সালের বাংলাদেশে আমাদের শুধু দক্ষ কর্মী দরকার হবে না। দরকার হবে সৎ, দায়িত্বশীল, সৃজনশীল, সহমর্মী ও উদ্ভাবনী মানুষ। এমন মানুষ, যারা নিজের সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের কথাও ভাববে। আর এই মানুষ তৈরির কাজে শিক্ষকই থাকবেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষক নিয়ে আমাদের প্রশ্নটিও বদলানো দরকার। শুধু এই প্রশ্ন নয়—‘একজন শিক্ষক কত ভালো পড়াতে পারেন?’ বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনাটুকু কতটা জাগিয়ে তুলতে পারেন?’

হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে ২০৫০ সালের শিক্ষকের আসল সাফল্য।

লেখক: মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খান, এনডিসি পিএসসি (অব.)

আরও পড়ুন