মক্কা চুক্তি: বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সামরিক বিবেচনা
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
বাংলাদেশের সম্ভাব্য ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে অংশগ্রহণ নেওয়া, না নেওয়া নিয়ে আলোচনা এখন পর্যন্ত মূলত কূটনীতিকেন্দ্রিক। কিন্তু বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দিকও রয়েছে।
বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থায় যুক্ত হলে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর কী ধরনের দায়িত্ব বা প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। ওই চুক্তির প্রকাশ্যে আসা তথ্য অনুযায়ী, এর অন্যতম নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে এ ব্যবস্থার কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠক হয়েছে।
বাংলাদেশ জানিয়েছে, আমন্ত্রণ পেলে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। তবে ঢাকা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পায়নি। ফলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কোনো সামরিক দায় তৈরি হয়েছে—এমন কথা বলার সুযোগ নেই।
বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চুক্তির সামরিক ও আইনগত দিকগুলো পরিষ্কার করা জরুরি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, বাংলাদেশ অন্য দেশে যুদ্ধ করতে যায় না। বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আসছে। আর তা জাতিসংঘের অধীনে।
সহযোগিতা আর যৌথ প্রতিরক্ষা এক নয়
বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, মহড়া ও পেশাগত বিনিময়ে যুক্ত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাধারণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চেয়ে আলাদা।
কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের কাছ থেকে সহায়তার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। সেই সহায়তা গোয়েন্দা তথ্য, রসদ, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ বা নৌ ও বিমান সক্ষমতার মধ্যেও সীমিত থাকতে পারে; আবার পরিস্থিতি ভেদে সামরিক সদস্য মোতায়েনের প্রশ্নও উঠতে পারে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের ওপর ঠিক কী ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকবে? অন্য কোনো দেশের সংঘাতে বাংলাদেশি যুদ্ধসেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না, থাকলে সিদ্ধান্ত নেবে কে—এসব বিষয় আগেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সামরিক সক্ষমতার বাস্তবতা
সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম দায়িত্ব দেশের প্রতিরক্ষা। দেশের ভূখণ্ড, আকাশসীমা ও সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি তাদের আরো নানা দায়িত্ব রয়েছে। তাই বিদেশে কত সেনা পাঠানো সম্ভব, তা নির্ভর করে ইউনিটের প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, রোটেশন, রিজার্ভ, পরিবহন, রসদ ও চিকিৎসা সক্ষমতার ওপর। নতুন কোনো সামরিক অঙ্গীকারের আগে এ বিষয়ে পেশাদার সামরিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন
সম্ভাব্য যৌথ অভিযানে বাংলাদেশি বাহিনীর কমান্ড কার হাতে থাকবে, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। কোনো বহুজাতিক কমান্ডার কি বাংলাদেশের পৃথক অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশি ইউনিটকে যুদ্ধের নির্দেশ দিতে পারবেন? বাংলাদেশ কি নিজের বাহিনী ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাতীয় শর্ত রাখতে পারবে? এসব বিষয় লিখিতভাবে স্পষ্ট থাকা দরকার।
একইভাবে, বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের বাহিনী এ দেশে এলে তাদের আইনি ও সামরিক অবস্থান কী হবে, সেটিও আগে নির্ধারণ করা উচিত। পাকিস্তান চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ায় এই প্রশ্ন বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও সংবেদনশীল।
সংবিধানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৩(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদের সম্মতি ছাড়া যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রে এই বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা আইনগতভাবে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতে বাংলাদেশ অংশ নিলে সংসদের অনুমোদন কীভাবে কার্যকর হবে—এ প্রশ্নের উত্তর চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আগেই জানা উচিত।
সহযোগিতার বিকল্প পথ
চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাওয়া—বাংলাদেশের সামনে শুধু এই দুটি পথই নেই। বরং সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, যৌথ মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা আরো বাড়ানো সম্ভব।
তুরস্কের সঙ্গে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্প, পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে আর্থিক ও কৌশলগত সহযোগিতার সম্ভাবনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এসব সুবিধাকে যৌথ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সম্ভাব্য দায়ের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ার চেয়ে বড়। বাংলাদেশকে আগে জানতে হবে—এই ব্যবস্থা তার নিরাপত্তা কতটা বাড়াবে এবং এর বিনিময়ে কী ধরনের সামরিক দায় তৈরি হবে।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম দায়িত্ব বাংলাদেশকে রক্ষা করা। তাই যে কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন, বাংলাদেশি সেনারা কখন, কোথায় এবং কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন—সেই সিদ্ধান্তের জাতীয় ও সাংবিধানিক কর্তৃত্ব বাংলাদেশের হাতেই থাকে।