বিশেষ লেখা
জেলার দায়িত্বে মন্ত্রী, ফিরে এলো জবাবদিহিতা
অদিতি করিম
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
২০২১ সাল। করোনায় ক্ষতবিক্ষত গোটা বিশ্ব, বাংলাদেশ। সারা দেশ অচল। মানুষের জীবন বিপন্ন। এ রকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি ঢাকার বাইরে মানুষের অসহায়ত্ব অসহনীয় হয়ে ওঠে। এ সময় তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক জেলার তদারকির জন্য একজন করে সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এটা ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য চরম অবমাননাকর। এর ফলে মুহূর্তের মধ্যে মন্ত্রীরা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন। সংসদ সদস্যরা অসহায় হয়ে যান। সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে দেশে আমলাতন্ত্র কায়েম হয় এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। মানুষের জন্য সামান্য ত্রাণ বরাদ্দের জন্য মন্ত্রী-এমপিদের আমলাদের কাছে ধরনা দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করা হয়। আমলারাও সুযোগ বুঝে জনপ্রতিনিধিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শুরু করেন। আমলারা মন্ত্রী-এমপিদের জ্ঞান দিতে শুরু করেন। মন্ত্রীদের কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় সেই পরামর্শ দেন। এ সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস বনে যান অঘোষিত প্রধানমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের শাসনকালে গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের জন্য ক্ষতিকর যতগুলো কাজ হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ছিল আমলাদের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দেওয়া। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে যায় আমলা ও পুলিশি রাষ্ট্র। সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে এটা ছিল এক তামাশা।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হয়ে জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে তুলে দিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল প্রতি জেলায় একজন করে মন্ত্রীকে দায়িত্ব প্রদান। এটা করা হয়েছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে ও জনগণের সমস্যার সমাধান যেন দ্রুত করা যায় তা নিশ্চিত করতে। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা এককেন্দ্রিক এবং ঢাকাকেন্দ্রিক।
ছোটখাটো সিদ্ধান্তের জন্য ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। একটা হাসপাতালে ছোট যন্ত্রপাতি নষ্ট হলেও তা ঠিক করতে হলে ঢাকার অনুমতি লাগে। নষ্ট হয়ে যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে বছরের পর বছর। উপজেলায় একটি গাড়ি নষ্ট হলেও তা ঠিক করতে ঢাকার অনুমতি প্রয়োজন হয়। এভাবেই সচিবালয়ে বন্দি থাকে দেশের ভাগ্য, জনগণের উন্নয়ন। এরশাদ শাসনামলে রুলস অব বিজনেসে মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী ছিলেন সচিবরা। মন্ত্রীরা ছিলেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাত্র। বেগম জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মন্ত্রীদের মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী করেন আর সচিবদের দেন প্রধান অর্থ কর্মকর্তার দায়িত্ব। তিনি সচিবালয় নির্ভরতা কমাতে প্রত্যেক জেলায় একজন মন্ত্রীকে সামগ্রিক দায়িত্ব প্রদান করেন। ওই মন্ত্রী প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি জেলায় যেতেন। সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভা করতেন। সমন্বয় সভায় উপস্থিত সবাই তাদের বিভাগের স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা এবং চাহিদা তুলে ধরতেন।
মন্ত্রী ঢাকায় এসে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। জেলার মন্ত্রীর দ্বিতীয় কাজ ছিল এলাকার জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়। প্রতি সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে এ মতবিনিময়ের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হতো। হাসপাতালে চিকিৎসক ঠিকমতো আসেন কি না, থানা অপরাধীদের ধরার নামে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করে কি না ইত্যাদি বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হতো। এসব আলোচনার আলোকে মন্ত্রী স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেন। বেগম জিয়ার এ সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের সমস্যা সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মাঠপর্যায়ে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি চালু হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এ সিদ্ধান্তের ফলে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব থেকে দেশ মুক্ত হয়ে জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে শুরু করে। ১৯৯১ সালের পর থেকে ২০২০ পর্যন্ত জবাবদিহিতার পদ্ধতি কিছুটা হলেও মাঠপর্যায়ে আমলাদের খবরদারি কমাতে সাহায্য করেছিল। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
কিন্তু ২০২০ সালে জেলার দায়িত্ব আবার সচিবদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আসলে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল।
দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব আবারও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে সরকার। সরকারের আইনশৃঙ্খলা, অপরাধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা এবং সরকারি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তদারক ও সমন্বয় করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। এবার দায়িত্বের ভাষা কিছুটা আলাদা।
গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপের (তিনজন) মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে। কাউকে একটি, কাউকে দুই থেকে তিনটি জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে বিভিন্ন জেলায় উন্নয়নের বরাদ্দ কাগজে-কলমে থাকলেও ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হয়েছে। লুট করা অর্থের একাংশ বিদেশে পাচার হয়েছে এবং অন্য অংশ মাদকসহ সামাজিক অবক্ষয়, জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। এ অবস্থায় জেলা পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সমন্বয় ও তদারকির এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো এবং অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার আইনি ক্ষমতা খর্ব না করে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে জেলায় মাঠ প্রশাসন যেন সঠিকভাবে কাজ করে তা মনিটরিং করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলার দায়িত্ববিষয়ক প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা, এই সংবিধানের দ্বারা বা অধীন প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বা তাঁহার কর্তৃত্বে প্রযুক্ত হইবে।’ অর্থাৎ রাষ্ট্রের নির্বাহী বা প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তাঁর কর্তৃত্বের অধীন মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্তৃপক্ষ এসব ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
তাই সরকারের এ সিদ্ধান্ত সাহসী, সময়োপযোগী এবং মাঠ প্রশাসনের গতি আনার জন্য কার্যকর। ২০২১ সালের পর থেকে মাঠপর্যায়ে আমলাদের ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তারা জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কোনো মূল্য দেননি। এমনকি জনপ্রতিনিধিদের কাছেও তাদের কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। আওয়ামী লীগ আমলে এমপি এবং জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। তাই তারা আমলাদের কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন, বিনা প্রতিবাদে। কিন্তু এখনকার সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, তাদের প্রতিনিয়ত জনগণের ভালোমন্দ খেয়াল করতে হয়। এজন্যই জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে। তাই জেলার তদারকির দায়িত্ব মন্ত্রীদের হাতে ন্যস্ত করার মাধ্যমে বর্তমান সরকার একদিকে যেমন জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে পদক্ষেপ নিয়েছে তেমনি প্রান্তিক মানুষের সেবা গ্রহণের প্রতিবন্ধকতা দূর করবে। সবচেয়ে বড় কথা এর মাধ্যমে সারা দেশে সমন্বিত উন্নয়নের পথ সুগম হবে।
অদিতি করিম: লেখক ও নাট্যকার