EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

নীরবতা নয়, সুরক্ষা: শিশুর যৌন নির্যাতনের সতর্কসংকেত ও সহায়তার পথ

ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৫ পিএম

নীরবতা নয়, সুরক্ষা: শিশুর যৌন নির্যাতনের সতর্কসংকেত ও সহায়তার পথ

ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী। ছবি: সংগৃহীত

অ অ

একটা শিশু যখন হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, কোনো পরিচিত মানুষের কাছে যেতে ভয় পায়, ঘুম ভেঙে কাঁদে কিংবা আগে যে জায়গায় আনন্দে যেত সেখানে যেতে অস্বস্তি বোধ করে— আমরা অনেক সময় বলি, ‘বয়সের পরিবর্তন’। কিন্তু সব পরিবর্তনকে স্বাভাবিক বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া নিরাপদ নয়। শিশুর আচরণের ভাষা কখনো কখনো এমন কিছু বলে, যা সে মুখে বলতে পারে না।

শিশু যৌন নির্যাতন নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো— বিপদ কেবল অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে। বাস্তবতা অনেক কঠিন। ইউনিসেফের তথ্য বলছে, যৌন সহিংসতার বড় অংশই ঘটে এমন কারও হাতে, যাকে শিশু আগে থেকেই চেনে বা বিশ্বাস করে। ফলে শিশুকে শুধু ‘অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না’ শেখানো যথেষ্ট নয়; তাকে নিজের শরীর, ব্যক্তিগত সীমা এবং অস্বস্তিকর আচরণ চেনার ভাষাও দিতে হবে।

সমস্যাটির ব্যাপ্তিও উপেক্ষা করার মতো নয়। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের প্রথম বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে জীবিত প্রতি আটজন নারী ও কিশোরীর একজন ১৮ বছরের আগে ধর্ষণ বা যৌন হামলার শিকার হয়েছে। অনলাইন বা মৌখিক যৌন হয়রানির মতো স্পর্শবিহীন নির্যাতন ধরলে সংখ্যাটি আরও বড়। ছেলেরাও ঝুঁকির বাইরে নয়। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ‘খারাপ ঘটনার’ গল্প নয়; এটি শিশুস্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

শিশু সুরক্ষার প্রথম স্তর পরিবার। ছোটবেলা থেকেই শিশুকে সহজ ভাষায় শেখাতে হবে—তার শরীর তার নিজের; ব্যক্তিগত অঙ্গ ব্যক্তিগত; কোনো স্পর্শ, কথা, ছবি তোলা, ছবি চাওয়া বা গোপন রাখতে বলা যদি তাকে অস্বস্তি দেয়, তবে সে ‘না’ বলতে পারে এবং সরে যেতে পারে। আরও জরুরি হলো, ‘বড়রা যা বলবে মানতেই হবে’—এই সংস্কৃতির বদলে শিশুকে নিরাপদ সীমা নির্ধারণের অধিকার দেওয়া। পরিচিত আত্মীয়, শিক্ষক বা অন্য কোনো কর্তৃত্বশীল ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

এখানে একটা পার্থক্য মনে রাখা দরকার: শিশুকে নিরাপত্তার দায় একা বহন করতে বলা যাবে না। ‘না বলবে’, ‘সরে যাবে’, ‘বিশ্বাসযোগ্য বড় কাউকে জানাবে’—এসব শেখানো উপকারী; কিন্তু নির্যাতন ঠেকানোর মূল দায় প্রাপ্তবয়স্কদের। পরিবার, স্কুল, মাদ্রাসা, কোচিং, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর স্পষ্ট শিশু সুরক্ষা (child safeguarding) নীতি থাকা দরকার— কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, একান্ত সাক্ষাৎ কীভাবে হবে, অভিযোগ কোথায় যাবে, কর্মীদের যাচাই ও প্রশিক্ষণ কীভাবে হবে— এসব আগেই নির্ধারিত থাকতে হবে।

ডিজিটাল জগতকেও আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আজকের শিশুর স্কুল, বন্ধুত্ব, বিনোদন— সবকিছুর একটা অংশ অনলাইনে। তাই ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কল, গোপন চ্যাট, অনলাইন পরিচিত কারও চাপ বা ব্ল্যাকমেইল নিয়ে বয়সভিত্তিক আলোচনা করতে হবে। শিশুর ফোন কেড়ে নেওয়ার ভয় দেখালে সে বিপদের কথা লুকাতে পারে; বরং তাকে জানাতে হবে— সমস্যায় পড়লে শাস্তি নয়, আগে নিরাপত্তা ও সহায়তা পাবে।

তাহলে সতর্কসংকেত কী? কোনো একটি লক্ষণ দেখেই যৌন নির্যাতনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না, কারণ একই আচরণের অন্য কারণও থাকতে পারে। তবে হঠাৎ অতিরিক্ত ভয় বা গুটিয়ে যাওয়া, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জায়গা এড়িয়ে চলা, ঘুমের সমস্যা বা দুঃস্বপ্ন, পড়াশোনায় আকস্মিক অবনতি, বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক যৌন জ্ঞান বা আচরণ, বিছানা ভেজানো বা পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়া, অকারণ রাগ, বিষণ্নতা বা আত্মক্ষতির আচরণ— এগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। শারীরিক ব্যথা, আঘাত বা যৌনাঙ্গে অস্বস্তি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত কখনো কখনো শিশুর নিজের কথাই। সে যদি বলে, ‘ওর কাছে যেতে চাই না’, ‘আমাকে একটা গোপন কথা রাখতে বলেছে’, ‘আমার খারাপ লাগে’—তাকে থামিয়ে দেওয়া বা সঙ্গে সঙ্গে জেরা করা ঠিক নয়। শান্তভাবে শুনতে হবে, বিশ্বাসের পরিবেশ দিতে হবে এবং বলতে হবে—‘তুমি আমাকে বলেছ, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ’, ‘তোমাকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করব’। বারবার বিস্তারিত জানতে চাওয়া, দোষ দেওয়া বা অভিযুক্ত ব্যক্তির সামনে শিশুকে মুখোমুখি করা পরিস্থিতি আরও ক্ষতিকর করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌন নির্যাতনের কথা জানানো শিশু-কিশোরের ক্ষেত্রে সম্মানজনক, সহানুভূতিশীল ও শিশু-কেন্দ্রিক প্রথম প্রতিক্রিয়ার ওপর জোর দেয়। প্রথম কাজ হলো মনোযোগ দিয়ে শোনা, শিশুর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তার শারীরিক ও মানসিক প্রয়োজন বুঝে পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা। চিকিৎসা শুধু দৃশ্যমান আঘাতের জন্য নয়; প্রয়োজনে সংক্রমণ প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের অংশও হতে পারে।

বাংলাদেশে সহায়তার পথও জানা থাকা দরকার। শিশু নিজে, অভিভাবক বা উদ্‌বিগ্ন যে কোনো ব্যক্তি চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ যোগাযোগ করতে পারেন। ইউনিসেফ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহযোগিতায় পরিচালিত এই দেশব্যাপী টোল-ফ্রি সেবা কাউন্সেলিং দেয় এবং প্রয়োজনে সুরক্ষা, আইনি সহায়তা, আশ্রয়, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবায় রেফার করতে পারে। নম্বরটি শুধু দেয়ালে পোস্টার হয়ে থাকলে হবে না— বাড়ি, স্কুল ও প্রতিষ্ঠানে শিশুদের ভাষায় এর ব্যবহার শেখাতে হবে।

আরেকটি সামাজিক বাধা হলো লজ্জা। নির্যাতনের পর প্রশ্ন ওঠে—‘কেন আগে বলেনি?’, ‘ওখানে গিয়েছিল কেন?’, ‘পরিবারের সম্মান কী হবে?’ এই প্রশ্নগুলো আসলে শিশুর ওপরই দায় চাপায়। শিশু ভয়, হুমকি, সম্পর্কের নির্ভরতা, অপরাধবোধ বা নিজের সঙ্গে কী ঘটছে তা বুঝতে না পারার কারণে দীর্ঘদিন চুপ থাকতে পারে। দেরিতে বলা মানে ঘটনা মিথ্যা নয়; বরং নিরাপদ মানুষ ও নিরাপদ ব্যবস্থা না পাওয়ার চিহ্ন হতে পারে।

শিশু সুরক্ষা তাই কেবল একটি অপরাধ ঘটার পর বিচার চাওয়ার বিষয় নয়; তার আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলার নাম। বাড়িতে খোলামেলা যোগাযোগ, স্কুলে শিশু সুরক্ষা বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, অভিযোগের গোপন ও শিশু-বান্ধব ব্যবস্থা, কর্মীদের আচরণবিধি, অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য-মনোসামাজিক সেবায় দ্রুত সংযোগ— এই ছোট ছোট কাঠামোই বড় দুর্ঘটনা ঠেকাতে পারে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ, যেখানে শিশুকে ‘চুপ থাকো’ শেখানো হয় না; শেখানো হয়—অস্বস্তি হলে বলা নিরাপদ, সাহায্য চাওয়া লজ্জার নয়, এবং কোনো নির্যাতনের দায় কখনো শিশুর নয়। একটি শিশু যখন বিশ্বাস করে যে তার কথা শোনা হবে, তখনই সুরক্ষার প্রথম দরজাটি খুলে যায়।

শেষ পর্যন্ত শিশুকে নিরাপদ রাখার হিসাবটি খুব জটিল নয়। সতর্ক থাকতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা নিতে হবে। শিশুর নীরবতাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার চেয়ে তার নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অনেক বেশি জরুরি।

একটা সমাজের সভ্যতা বোঝা যায় সে তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটিকে কতটা নিরাপদ রাখতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সেই দায় পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র— সবার। নীরবতা নির্যাতনকে আড়াল করে; সচেতনতা, সুরক্ষা আর সময়মতো সহায়তাই পারে সেই আড়াল ভাঙতে।


স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল

সহ-সভাপতি, ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ

আরও পড়ুন