দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে কক্সবাজারের রামু সেনানিবাসকে আধুনিক এবং পূর্ণাঙ্গ সামরিক স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নেওয়ার খবরের মাঝেই ধারণার বাইরের খবর। হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মাটির নিচে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ছয়টি পিস্তল, সাতটি ম্যাগজিন ও ২২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ -বিজিবি।
সীমান্ত পিলার ১৯৭৮ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাতছড়ি রিজার্ভ ফরেস্টের দুর্গম পাহাড়ি ও ঘন জঙ্গল এলাকায় মাটির নিচে বিশেষ কৌশলে এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুকিয়ে রাখা অনেকের কাছেই ধারণাতীত। হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৫ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তানজিলুর রহমান জানালেন দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিস্তার রোধ এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিজিবির দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা। সেন্ট্রাল কমান্ডের সাথে ফিল্ড কমান্ডের সমন্বয়ের নতুন ক্যামেস্ট্রি এর সৈনিকদের মনোবল বাড়িয়ে আরও তেজোদ্দীপ্ত করার জেরে গোটা বাহিনীটিকে আগোয়ান করে তুলেছে।
গত তিন মাসে ৫৫ বিজিবির অভিযানে সাতছড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দুর্গম সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৪১ লাখ টাকা মূল্যের ২৩৮ কেজি ভারতীয় গাঁজা, ২ হাজার ৫৮৫ পিস ইয়াবা, ৫৯ বোতল মদ ও ২১টি গরু আটক করা হয়েছে। অনেকেরই জানার বাইরে ওই এলাকাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েক দফা অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সর্বপ্রথম ২০১৪ সালের ১ জুন থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দফায় সেখান থেকে ৩৩৪টি কামান বিধ্বংসী রকেট, ২৯৬টি রকেট চার্জার, একটি রকেট লঞ্চার, ১৬টি মেশিনগান, একটি ব্রেটা গান, ছয়টি এসএলআর, একটি অটো রাইফেল, পাঁচটি মেশিনগানের অতিরিক্ত খালি ব্যারেল, প্রায় ১৬ হাজার রাউন্ড বুলেটসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। একই বছরের ১৬ অক্টোবর চতুর্থ দফায় উদ্যানের ভেতরে মাটি খুঁড়ে তিনটি মেশিনগান, চারটি ব্যারেল, আটটি ম্যাগাজিন, ২৫০ গুলির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আটটি বেল্ট ও উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন একটি রেডিও উদ্ধার করা হয়। পরে ১৭ অক্টোবর দুপুরে এসএমজি ও এলএমজির ৮ হাজার ৩৬০ রাউন্ড, ত্রি নট ত্রি রাইফেলের ১৫২ রাউন্ড, পিস্তলের ৫১৭ রাউন্ড, মেশিনগানের ৪২৫ রাউন্ডসহ মোট নয় হাজার ৪৫৪ রাউন্ড বুলেট উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাতছড়িতে অভিযান পরিচালনা করে ১০টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ৪০ এমএম অ্যান্টি-ট্যাংক রকেট উদ্ধার হয়।
২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে ১৩টি রকেট লঞ্চারের শেলসহ বেশকিছু বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। ২০২১ সালের ২ মার্চ বিজিবি বিশেষ অভিযান চালিয়ে উদ্যান থেকে ১৮টি ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট লঞ্চার উদ্ধার করে। একই বছরের ১৩ আগস্ট সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে বিজিবি। ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর ১৫টি রকেট প্রপেলড গ্রেনেড (আরপিজি), ২৫টি বুস্টার, ৫১০টি লংরেঞ্জ অটোমেটিক মেশিনগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। বিজিবির কর্মযজ্ঞ ও অভিযানের খবর বরাবরই গণমাধ্যমে কম প্রচারিত। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত বিজিবির সরাইল রিজিয়নের (সিলেট, শ্রীমঙ্গল, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সেক্টর) অধীনে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে প্রায় ৮৩০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা মূল্যের চোরাচালানি পণ্য ও মাদক জব্দ, উখিয়া সীমান্তে মালিকবিহীন ৬ লাখ ৭২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধারের খবরও এসেছে ছোট তথা সীমিত পরিসরে। বিজিবি-কে একটি আধুনিক, দক্ষ ও আরো জনকল্যাণমুখী, সময়োপযোগী জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কথা ক’দিন আগেও গুরুত্বের সাথে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০৪১ সালের মধ্যে এই বাহিনীকে একটি বিশ্বমানের স্মার্ট সীমান্ত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। [প্রশ্ন ঘুরছে, তা কীভাবে করা হবে? কেবল নতুন রিজিয়ন, সেক্টর এবং ইউনিট গঠন করে? না, এর বাইরেও রয়েছে আরো অনেক কিছু।
এরইমধ্যে জল ও স্থলের পাশাপাশি এয়ার উইংয়ে হেলিকপ্টার সংযোজনের মাধ্যমে বিজিবি এখন আকাশপথেও সক্ষমতা অর্জন করেছে। দুর্গম পাহাড়ি ও নদীবেষ্টিত সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে। ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ভিশন-২০৪১’ এর আওতায় আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে। গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করতে আধুনিক সার্ভেইলেন্স সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। সীমান্ত সুরক্ষা, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এ সুপ্রাচীন বাহিনীটি গৌরবের ২৩১ বছর পার করেছে। ১৭৯৫ সালের ২৯ জুন রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন নামে এই বাহিনীর গোড়াপত্তন। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসন সীমান্ত নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে এই বাহিনী গঠন করলেও সময়ের প্রবাহে এটি ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত ও দক্ষ সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে পরিণত হয়। সুদীর্ঘ অভিযাত্রায় বাহিনীটির নাম ও কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে একাধিকবার। ফ্রন্টিয়ার গার্ডস, বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ, ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-ইপিআর, বাংলাদেশ রাইফেলস-বিডিআর হয়ে আজকের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি।
সব নামেই বাহিনীটির সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্বের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাহিনীটি কেবল সীমান্ত পাহারায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে এই বাহিনীর সদস্যরা অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শন করেন। লুসাই বিদ্রোহ দমন, সিকিম ও চাইনিজ আম্বান অভিযান এবং আসালং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারা তাদের পেশাগত দক্ষতা ও সাহসিকতার স্বাক্ষর রাখেন। পরবর্তীকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের অসাধারণ সাহসিকতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ সরকার বাহিনীর সদস্যদের ভাইসররয়’স কমেন্ডেশন, ইন্ডিয়ান অর্ডার অব মেরিট, নিশান-ই-হায়দার এবং তৎকালীন বিভিন্ন সামরিক সম্মাননায় ভূষিত করে। এই অর্জনগুলো শুধু বাহিনীর নয়, সমগ্র উপমহাদেশের সামরিক ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল সম্পদ। সময় ও শাসনের পরিবর্তনের সাথে সাথে এর নাম পরিবর্তিত হয়েছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩ মার্চ নাম হয় 'বাংলাদেশ রাইফেলস' –বিডিআর। ২০০৯ সালের অনভিপ্রেত ঘটনার পর ২০১০-১১ সালে আইন সংশোধন করে এর নাম রাখা হয় 'বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ'-বিজিবি। দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রক্ষা ও চোরাচালান রোধে বাহিনীটি অতন্দ্র প্রহরী। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ তো করছেই। তাদের কোথাও যেতে নেই মানা। আজকের বিজিবি শুধু সশস্ত্র প্রহরী নয়, পাহাড়ের মানুষের বন্ধুও।
দুর্গম অঞ্চলে বই বিতরণ, বিনামূল্যে চিকিৎসাশিবির আয়োজন আর স্থানীয় ভাষায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্র এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার সেতু তৈরি করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৬টি ব্যাটালিয়নের অধীনে ১৫০টি বিওপি এবং অসংখ্য অস্থায়ী ক্যাম্প এখন শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, মানবিক সহায়তা তথা জাতীয় সংকটে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে যেতে অভ্যস্ত বাহিনীটি সীমান্ত ছাড়িয়ে শহুরে জনপদ থেকে দূরে, বহু দূরে- দুর্গম পাহাড়, গহীন অরণ্য, উত্তাল নদী, চরাঞ্চল কিংবা উপকূলের লবণাক্ত জনপদ; যেখানে প্রতিকূলতা সেখানেই নতুন চ্যালেঞ্জেও পারঙ্গম। যে চ্যালেঞ্জের পরতে পরতে অদম্য সাহস, ধৈর্য, জীবনের ঝুঁকি। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এর অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তরে বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নজরদারি উপেক্ষা করে একদল দেশপ্রেমিক জওয়ান স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। সেই পতাকাই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিটি ইপিআর ক্যাম্পে ছড়িয়ে দেয়।
পরবর্তীকালে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা বাহিনীগুলোর অন্যতম ছিল ইপিআর। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে তারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং সম্মুখসমরে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে তোলে অসাধারণ প্রতিরোধ।
এ প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের ধারাপাতে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এই বাহিনীর ৮১৭ জন সদস্য শহীদ হন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই বাহিনীর ২ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৮ জন বীরউত্তম, ৩২ জন বীরবিক্রম এবং ৭৮ জন বীরপ্রতীকসহ মোট ১১৯টি রাষ্ট্রীয় বীরত্বসূচক খেতাব পান। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা নিরসন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, চিকিৎসা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় বিজিবির সিরিজ ভূমিকার সমান্তরালে সাম্প্রতিক সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমন ও পুশ-ইন প্রতিরোধে যোগ হয়েছে নতুন পালক। সময়ের পরিক্রমায় বিজিবি আজ প্রযুক্তিনির্ভর বর্ডার ম্যানেজমেন্ট বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন মানদণ্ড গড়ে তুলেছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী যোগ করেছেন বাহিনীটিকে সময়োপযোগী আরো জনবান্ধব করার অভিপ্রায়। ‘দেশের প্রশ্নে সীমান্ত বাহিনীকে এমন পর্যায়ে আধুনিক ও সুসংহত করতে চান তিনি যেন তারা দেশপ্রেম ও পেশাগত উৎকর্ষতায় সীমান্তে দায়িত্ব পালন করতে পারে। কেবল একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, সেনা পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে, একজন সহযোদ্ধার সন্তানের মতো তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে এ অভিপ্রায়ের জানান দিয়েছেন তিনি। বাকিটা কাজের মাধ্যমে দেখার অপেক্ষা।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন