হকিতে সেই মানুষগুলো দরকার, যাঁরা এই খেলায় পরিবর্তন চান
ইকরামউজ্জমান
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫০ এএম
ইকরামউজ্জমান। ছবি: সংগৃহীত
কিছুদিন আগে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ২৫টির বেশি খেলার ফেডারেশনের পুরনো অ্যাডহক কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে দিয়েছে। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই অ্যাডহক বডি ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্বভার হস্তান্তর করবে। ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সংগঠকদের দ্বারা।
বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের (বিএইচএফ) অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ইশতিয়াক সাদেক। তরুণ ও উদ্যমী ক্রীড়া সংগঠক। ক্লাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে ক্রিকেট, হকি ছাড়াও অন্যান্য খেলার আয়োজনে তাঁর সাংগঠনিক কর্মদক্ষতা প্রমাণিত।
ইশতিয়াক সাদেকের আরেকটি পরিচয় হলো তিনি দেশের কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় এবং সব্যসাচী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেকের বড় ছেলে। চিন্তা-চেতনায় প্রগতিতে বিশ্বাসী ইশতিয়াকের রক্তের মধ্যে মিশে আছে হকি খেলাটি। তাঁর চাচা দেশের বৃহত্তর শিল্পগোষ্ঠী এবং করপোরেট হাউস বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান একসময় নিয়মিতভাবে হকি খেলেছেন। তাঁর পজিশন ছিল রাইট হাফ।
আহমেদ আকবর সোবহান তৎকালীন পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান যুব দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছেন কুমিল্লা জেলা দলের হয়ে। আবদুস সাদেক ও আহমেদ আকবর সোবহানের বাবা আলহাজ আবদুস সোবহান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র এবং আইনজীবী। ছিলেন মনেপ্রাণে ক্রীড়াবিদ। খুব ভালো সাঁতারু ছিলেন।নিয়মিতভাবে ব্যাডমিন্টন খেলতেন।
বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ আকবর সোবহানের চার পুত্রসন্তান। তাঁরা হলেন সাদাত সোবহান, সাফিয়াত সোবহান, সায়েম সোবহান ও সাফওয়ান সোবহান। প্রত্যেকেই নিজেদের কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। এখানে উল্লেখ করার বিষয় হলো, এই চারজনই খাঁটি খেলাপ্রেমী এবং অনুরাগী। পিতা ও পুত্রদের খেলার প্রতি ভালোবাসা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রুপ বছরের পর বছর ধরে ক্লাব, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন খেলার ক্ষেত্রে (ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, গলফ, স্কোয়াশ, টেনিস, ব্যাডমিন্টনসহ আরো অন্যান্য খেলায়) পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। পাশাপাশি অত্যাধুনিক কাঠামো নির্মাণ করে ক্রীড়া পরিবেশকে (বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি) আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দিয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে ক্রীড়াঙ্গনে এত বড় বিনিয়োগ শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশে নেই। ক্রীড়াবান্ধব পরিবারের জন্যই ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটি সরকার কর্তৃক জানান দেওয়ার পর ইতিবাচক যে বিষয়টি সচেতন হকি অনুরাগীদের দৃষ্টি কেড়েছে, সেটি হলো সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক সাদেকের সঙ্গে তাঁর সহকর্মীদের সম্মিলিতভাবে বিষয়টি ঘিরে উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া। হকির জন্য সবাই মিলেমিশে কিছু করার তাড়না আর উৎসাহ—সবাই বিশ্বাস করতে চাইছেন, হকিতে সম্ভাবনা আছে, আন্তরিক হলে যেটি কাজে লাগানো সম্ভব।
কয়েক বছর ধরে দেশে হকিচর্চার পরিবেশ অনুকূলে ছিল না। অরাজকতা, অর্থনৈতিক কার্যকলাপ, বিশৃঙ্খলা, ব্যক্তি ও সমষ্টির স্বার্থে সংগঠকদের মধ্যে বিরোধ আর দ্বন্দ্ব খেলার চত্বরকে সব সময় অস্থির করে রেখেছে। দ্বিচারিতা আর সংগঠকদের মধ্যে স্বার্থের লড়াই সম্ভাবনাময় খেলাটিকে সুষ্ঠু অবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত করেছে বারবার। ক্লাব রাজনীতি হকির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। কর্মকর্তারা ভেবেছেন, তাঁরা ছাড়া উপায় নেই। খেলা মাঠে নামবে না। তাঁদের স্বার্থ বাধাগ্রস্ত হলে অসুস্থ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে না নিতে পেরে নিবেদিত হকি সংগঠকদের কেউ কেউ স্বেচ্ছায় এই চত্বর থেকে বিদায় নিয়েছেন। অতীতে নির্বাচনের নামে রীতিমতো নোংরামির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। সত্যিকারের যোগ্য সংগঠকদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে কৌশল অবলম্বন করে। মকসুদ পূর্ণ হয়েছে একত্ববাদী একদল সংগঠকের, যাঁরা সব সময় খেলা থেকে নিজেদের বড় ভেবেছেন।
হকিতে এত নৈরাজ্য, এত হৈচৈ থাকা সত্ত্বেও কিন্তু খেলোয়াড়রা বাতিটা জ্বালিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছেন তাঁদের সামর্থ্য ও আত্মনিবেদনের মাধ্যমে, এটাই বড় ভরসা। সচেতন মহল সব সময় বলেছে, হকিতে সেই মানুষগুলো দরকার, যাঁরা নিজের থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে সবাই মিলে কাজ করার জন্য উৎসাহী হবেন। যাঁরা ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করতে আগ্রহী। পরিহার করবেন পুরনো ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। কাগজে-কলমে নয়, মাঠের বাস্তবতায় সবার সম্মতিক্রমে উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এটি স্পষ্ট যে তিন-চারজন হকিপাগল মানুষ কখনো পারবেন না হকির অবস্থা পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। প্রয়োজন বড় একটি ঐক্যবদ্ধ টিমের, যারা কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে বড় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। যারা চায় ঢাকার বাইরে হকিকে নিয়ে যেতে; চায় হকির পরিবেশ ও সংস্কৃতি বদলাতে। লক্ষ্য তো একটি হকির ভবিষ্যৎ বদলানো। এর জন্য কিন্তু সহজেই ঘাসের টার্ফে ফাইভ এ-সাইড হকি জেলায় জেলায় টুর্নামেন্ট শুরু করা সম্ভব। এই উদ্যোগ নতুন কমিটি নেবে।
নিয়মিতভাবে লীগের খেলা অনুষ্ঠিত হয় না। একমাত্র স্টেডিয়ামে ২০২৪ সালের পর ফ্লাডলাইটের বাতি আর জ্বলেনি। জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপের খবর নেই। হকি অবকাঠামোর দুরবস্থা। হকি স্টেডিয়ামের অ্যাস্ট্রোটার্ফ নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বসানো ছাড়া উপায় নেই। এখন আছে মাত্র একটি টার্ফ। বসুন্ধরা গ্রুপ তাদের স্পোর্টস সিটিতে নতুন অ্যাস্ট্রোটার্ফ স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ করেছে বলে জানা গেছে। তবে এটি খেলার জন্য পুরোপুরি উপযোগী হতে আরো দু-তিন মাস লাগবে। বসুন্ধরা গ্রুপ ‘কিংস অ্যারেনা’ তৈরি করেছে বলে এখন ঘরোয়া ফুটবলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ এই অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হকি মাঠে অ্যাস্ট্রোটার্ফ স্থাপনের সব কাজ শেষ হলে এই মাঠে এর পর থেকে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক হকি টুর্নামেন্টের খেলা অনুষ্ঠিত হবে স্বাচ্ছন্দ্যে। বসুন্ধরার নতুন অ্যাস্ট্রোটার্ফ নিয়ে দেশে এর সংখ্যা হবে তিন। বসুন্ধরা গ্রুপ দেশের হকির স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নতুন অ্যাস্ট্রোটার্ফ স্থাপন করেছে।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে হকি এমন এক বাস্তবতায় আছে, যেখানে খেলাটি গত সাড়ে পাঁচ যুগের পরও সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবদ্ধ আছে। খেলাটি ঘিরে সব সময় সম্ভাবনার কথা বলা হয়। তবে এটি তো ঠিক যে সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে আবদ্ধ রেখে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়া হকিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব একটি বিষয়। বিগত বছরগুলোতে হকি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমষ্টিগত প্রক্রিয়ার মুখ দেশের মানুষ দেখেনি। দেখেনি বিগত দিনগুলোতে রাজনৈতিক সরকারের হকির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা। রাজনৈতিক কর্মীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে ফেডারেশনকে ব্যবহার করা হয়েছে।
চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হকি ফেডারেশনের (অ্যাডহক কমিটির) প্রথম পরিচিতি এবং প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সভায় সভাপতিত্ব করেছেন ফেডারেশনের সভাপতি এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। সভায় বেশ কয়েকটি উপকমিটি গঠন ছাড়াও এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণের জন্য বাজেট অনুমোদন, ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, হকি স্টেডিয়ামে নতুন অ্যাস্ট্রোটার্ফ স্থাপন, এশিয়ান গেমসের আগে জার্মানি সফর এবং সেখানে অনুশীলন ম্যাচ খেলার বিষয়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে এশিয়ান গেমসের লক্ষ্য নিয়ে। হাতে সময় খুব কম। জার্মান অভিজ্ঞ প্রবীণ কোচ ‘পিটার গেরহার্ড’কে আবার বাংলাদেশে আনা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, পিটার গেরহার্ড যেহেতু এ দেশের হকির সঙ্গে ভীষণভাবে পরিচিত, তাঁর পক্ষে চেষ্টা করা সম্ভব হবে দেশের হকিকে আবার আসল স্রোতে ফিরিয়ে আনা। বাংলাদেশ যদি এশিয়ান গেমসে ছয়টি দলের মধ্যে থাকতে পারে, তাহলে আগামী দিনের জন্য এটি হবে বড় প্রেরণা। আন্তর্জাতিক হকি দর্শন এবং খেলার কৌশল পুরোপুরি পাল্টে গেছে। এই কমিটি চাচ্ছে, যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হকি স্টেডিয়ামে নতুন অ্যাস্ট্রোটার্ফ বসানোর কাজ শেষ হয়, আর বসুন্ধরায় নতুন টার্ফের ‘ফাংশন’ শুরু হয়ে যায়, তাহলে ডিসেম্বরের শেষে পাঁচ-ছয়টি দেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক হকি টুর্নামেন্ট আয়োজন নিয়ে প্রথম সভায় আলোচনা হয়েছে। এদিকে ঘরোয়া হকি লীগ আগামী মাসে শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই লীগ দেশের হকির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া