ঘোষণা থেকে বাস্তবায়ন: তরুণের বাংলাদেশ কত দূরে?
ডা. উম্মে হানি পৃথ্বী
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি। ঢাকার জাস্টিস শাহাবুদ্দিন পার্ক। মঞ্চ নেই, ব্যারিকেড নেই — খোলা আকাশের নিচে তরুণদের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান। উপলক্ষ্য ছিল ‘মাই ভিশন ফর বাংলাদেশ’ রিল প্রতিযোগিতা। দুই হাজারের বেশি তরুণ ভিডিওতে এঁকে পাঠিয়েছিল নিজের চোখে দেখা আগামীর বাংলাদেশ। বিজয়ীরা সরাসরি প্রশ্ন করেছিল শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ আর দুর্নীতিমুক্ত দেশ নিয়ে।
সেদিন তারেক রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশের তরুণরা জাতীয় নীতিনির্ধারণে অংশ নিতে প্রস্তুত। তখনো তিনি প্রধানমন্ত্রী হননি। কথাটি তাই ছিল প্রতিশ্রুতি— ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দেওয়া। আজ সেই সরকারের বয়স ছয় মাস, আর প্রশ্নটি উল্টে ধরার সময় এসেছে। রাষ্ট্র কি তার তরুণদের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?
প্রেক্ষাপটটি সহজ নয়। চলতি আগস্টেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে তরুণ বেকারত্ব দাঁড়িয়েছে ১২.৪ শতাংশে, আর ২৫ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ— কোনোটিতেই নেই। বাংলাদেশের হিসাবটি আরও চেনা: বিশ্বব্যাংকের তথ্যে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালে কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করেছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ, অথচ চাকরি যুক্ত হয়েছে ৮৭ লাখ। মাঝখানের ঘাটতিটি লাখো পরিবারের দেয়ালে বাঁধানো একেকটি সনদ— যার পাশে নিয়োগপত্র নেই। কারণটিও গোপন নয়: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে সনদ তৈরি করেছে, দক্ষতা নয়। ঠিক এই জায়গা থেকেই বর্তমান সরকারের তরুণনীতির যাত্রা।
গত ৭ জুন শিক্ষকদের এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, চাই দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মমুখী শিক্ষা; চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে পুরোনো পাঠ্যক্রম আঁকড়ে থাকার বিকল্প নেই।
কথাটি বক্তৃতায় থেমে নেই। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে এর কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে: ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত একটি বাজারমুখী দক্ষতা— কৃষি থেকে গ্রাফিক ডিজাইন, স্বাস্থ্যসেবা থেকে নির্মাণ; বাংলা-ইংরেজির পাশে একটি তৃতীয় ভাষা— জাপানি, কোরীয়, ম্যান্ডারিন, আরবি, ফরাসি কিংবা জার্মান; শ্রেণিকক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও কোডিংয়ের সঙ্গে পরিচয়।
আছে সেই সিদ্ধান্তটিও, যা সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ সম্ভবত সবচেয়ে জরুরি— জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’। নিবন্ধিত তরুণের দক্ষতার সঙ্গে মেলানো হবে শূন্য পদ; যার দক্ষতা নেই, তাকে পাঠানো হবে প্রশিক্ষণে। একজন তরুণকে আর একা চাকরির বিজ্ঞাপন খুঁজে বেড়াতে হবে না। তার আর শ্রমবাজারের মাঝখানে দাঁড়াবে একটি প্রতিষ্ঠান। আর উদ্যোগটি উপজেলা পর্যায়ের বলেই এটি নকশাতেই ঢাকা-কেন্দ্রিক নয়, গ্রামের তরুণও এর হিসাবের ভেতরে।
চাকরি খোঁজার পাশাপাশি আছে চাকরি তৈরির পথ। ক্যাম্পাস থেকে উদ্যোক্তা তুলে আনতে শিক্ষার্থীদের ব্যবসার আইডিয়ায় সিড ফান্ডিং ও উদ্ভাবনী অনুদানের সিদ্ধান্ত হয়েছে; এবারের বাজেটে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য রাখা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ ফান্ড; ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তহবিলগুলোকে এক করে গড়া হচ্ছে একীভূত স্টার্টআপ অর্থায়ন কাঠামো, প্রণয়ন হচ্ছে আধুনিক স্টার্টআপ নীতিমালা। সঙ্গে ঘোষিত লক্ষ্য — প্রযুক্তি খাতে বছরে দুই লাখ কর্মসংস্থান, ফ্রিল্যান্সিং ও সৃজনশীল খাতে আরও আট লাখ। উদ্দেশ্যটি এক বাক্যের: তরুণ চাকরির পেছনে ছুটবে না, চাকরি তৈরি করবে।
পথটি পরীক্ষিতও। জার্মানি তরুণকে একই সঙ্গে কারখানায় আর ভোকেশনাল স্কুলে শিখিয়ে বেকারত্ব কমিয়েছে; সিঙ্গাপুর ‘স্কিলসফিউচার’ দিয়ে শেখাকে করেছে আজীবনের অভ্যাস; ভারতে গত বছরই শিক্ষানবিশি কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে ১৭ লাখের বেশি তরুণ। সবার গল্পে মিল একটাই— শিক্ষা আর কর্মজীবনের মাঝখানের দেয়ালটি ভাঙা। আর এই মডেল যে বাংলাদেশের মাটিতেও কাজ করে, তার প্রমাণ আছে: বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত এক কর্মসূচিতে এ দেশের ১৭ হাজারের বেশি তরুণ শিক্ষানবিশি শেষ করে প্রায় ৯০ শতাংশই এখন চাকরিতে বা নিজের ব্যবসায়।
সত্য কথাটিও বলা দরকার। এসবের বড় অংশ এখনো ঘোষণার স্তরে — সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস, আর পাঠ্যক্রম বদলাতে বছর লাগে, প্রতিষ্ঠান গড়তে আরও বেশি। কিন্তু আশার জায়গাটি হলো, কঠিন প্রশ্নগুলো— পরিকল্পনা কি ঢাকার বাইরে পৌঁছাবে, নারী ও প্রান্তিক তরুণ কি অন্তর্ভুক্ত হবে, প্রশিক্ষণ কি সত্যিকারের চাকরিতে গিয়ে শেষ হবে— সরকার নিজেই চিহ্নিত করেছে এবং সেগুলোকেই রেখেছে পরিকল্পনার কেন্দ্রে। উপজেলা পর্যায়ের এক্সচেঞ্জ ঢাকার বাইরের উত্তর; নারী উদ্যোক্তার জন্য নির্ধারিত তহবিল আর মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তির উত্তর; দক্ষতা-মিলকরণ আর শিল্প-সংযুক্ত শিক্ষানবিশি প্রশিক্ষণ-থেকে-চাকরির উত্তর। তারেক রহমানের তরুণনীতির শক্তির জায়গাটি এখানেই— সমস্যাগুলো তালিকার শেষে নয়, নকশার শুরুতে।
তাহলে তরুণের বাংলাদেশ কত দূরে? দূরত্বটি ঘোষণায় কমে না, কমে বাস্তবায়নে। আর বাস্তবায়নের সেই কাজটিই এখন চলছে, তহবিল বরাদ্দ হয়েছে, নীতিমালা তৈরি হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের নকশা আঁকা হয়ে গেছে।
এ দেশ জানে, একটি সঠিক সিদ্ধান্ত এক প্রজন্ম পরে কী ফেরত দেয়। তিন দশক আগে মেয়েদের অবৈতনিক পড়া আর উপবৃত্তির সিদ্ধান্ত হয়েছিল— সেই উপবৃত্তির টাকায় স্কুলে যাওয়া মেয়েটিই আজকের কর্মজীবী নারী, আজকের উদ্যোক্তা। আজকের সিদ্ধান্তগুলো ঠিকঠাক বাস্তবায়িত হলে তিন দশক পরের বাংলাদেশ ফসল তুলবে আজকের ঘোষণাগুলো থেকে।
সেদিন পার্কে তারেক রহমান বলেছিলেন, তরুণরা প্রস্তুত। কথাটি তাঁর; প্রমাণটি আমাদের— দুই হাজার রিল, হাত তুলে প্রশ্ন করা কণ্ঠগুলো, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজের ভবিষ্যতের নকশা আঁকতে থাকা একটি প্রজন্ম। প্রস্তুত তরুণ আর প্রস্তুত হতে থাকা রাষ্ট্র— এই দুইয়ের সাক্ষাতের নামই ‘তরুণে বাংলাদেশ’। কারণ শেষ পর্যন্ত হিসাবটি খুব সরল। তরুণের ভবিষ্যৎই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তরুণ দাঁড়িয়ে গেলে বাংলাদেশও দাঁড়িয়ে যাবে।
লেখক, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক, বগুড়া জেলা ছাত্রদল
সহ-সভাপতি, ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ
