EN ☀️
×

Follow Us

মতামত

১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা: জাতীয় অর্থনীতির জন্য এখনই সঠিক সময়

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা: জাতীয় অর্থনীতির জন্য এখনই সঠিক সময়
অ অ

জ্বালানি কোনো দেশের অর্থনীতির একটি খাতমাত্র নয়; এটি অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি চাকার চালিকাশক্তি। শিল্পকারখানা চলবে কি না, কৃষির উৎপাদন বাড়বে কি না, বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা নিরবচ্ছিন্ন হবে, পরিবহন খরচ কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমনকি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও অনেকাংশে নির্ভর করে একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন আগামী ১০ বছরের জন্য একটি জ্বালানি পরিকল্পনা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের কথা জানিয়েছেন, তখন এটিকে নিছক আরেকটি সরকারি পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি হওয়া উচিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রূপরেখা।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় বর্তমান বাস্তবতার কারণে। বাংলাদেশ একদিকে দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে চায়; অন্যদিকে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন কমছে এবং আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ২,৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।

এই ঘাটতি কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা নয়। গ্যাসের সংকট মানে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, সার কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্নের ঘটনাও দেখিয়ে দিয়েছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক সংকট কত দ্রুত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। জুলাইয়ে মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডের কারণে বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে ঝুঁকি এলএনজি বাজারেও চাপ তৈরি করে।

আরও বড় উদ্বেগের জায়গা হলো- দেশের নিজস্ব গ্যাসের মজুত। চলতি বছরের শুরুতে জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ছিল ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান হারে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এবং নতুন কোনো বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এই মজুত দিয়ে আনুমানিক ১২ বছর চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনার সময়সীমা এবং দেশের বর্তমান গ্যাস মজুতের সম্ভাব্য স্থায়িত্বের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আগামী দশ বছরকে যদি আমরা পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে এক দশক পর বাংলাদেশকে আরও বেশি আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। আর আমদানিনির্ভরতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মূল্য নয়, অনিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে, এলএনজির দাম বাড়তে পারে, যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংকটে সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, সমুদ্রপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এসব ঝুঁকি একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ কারণেই প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হওয়া উচিত দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। এক্ষেত্রে সরকারের ইতোমধ্যে নেওয়া কিছু পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। পেট্রোবাংলা ২০২৬ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লক- ১১টি অগভীর সমুদ্র এবং ১৫টি গভীর সমুদ্র ব্লক- আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানের জন্য উন্মুক্ত করেছে। লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিকে আকৃষ্ট করে সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো।

এই উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে ১০ বছরের জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনার অংশ করা প্রয়োজন। কোন ব্লকে কখন সিসমিক জরিপ হবে, কখন অনুসন্ধান কূপ খনন হবে, সম্ভাব্য আবিষ্কারের পর কত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়া যাবে- এসবের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। কারণ অনুসন্ধান করে গ্যাস পাওয়া গেলেই কাজ শেষ নয়; গ্যাসকে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনার অবকাঠামোও একই সঙ্গে তৈরি করতে হবে।

শুধু সমুদ্র নয়, স্থলভাগেও অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। বাপেক্সকে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, প্রয়োজনীয় রিগ এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী জাতীয় অনুসন্ধান প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী এরইমধ্যে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন কূপ খননের পাশাপাশি পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রেও নতুন করে অনুসন্ধান চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় রিগ আমদানির প্রক্রিয়াও চলছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য জ্বালানির মজুত বাড়িয়ে জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র মানেই শেষ হয়ে যাওয়া গ্যাসক্ষেত্র নয়। উন্নত ভূকম্পন জরিপ, থ্রিডি সিসমিক প্রযুক্তি, উন্নত কূপ খনন ও রিজারর্ভয়ার ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে পুরোনো ক্ষেত্রের নতুন স্তর বা কাঠামো থেকে অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। ইতোমধ্যে বাপেক্স ব্লক ৭ ও ৯-এ প্রায় ৩,৬০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক জরিপ করেছে। হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনাসহ বিভিন্ন এলাকায় থ্রিডি সিসমিক জরিপের পরিকল্পনাও রয়েছে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি মজুত বা স্ট্রেটেজিক রিজার্ভ। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি তেলের মজুত ৪৫ দিনের বেশি পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে আকস্মিক সংকট, যুদ্ধ, সমুদ্রপথে বিঘ্ন কিংবা মূল্যবৃদ্ধির সময় একটি দেশের হাতে পর্যাপ্ত মজুত থাকা মানে হলো বাজারের ধাক্কা সামাল দেওয়ার সময় পাওয়া। তাই ১০ বছরের পরিকল্পনায় শুধু গ্যাস বা বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, তেল, এলএনজি, এলপিজি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির জন্য পৃথক স্ট্রেটেজিক রিজার্ভ পলিসি থাকা দরকার।

তৃতীয় বিষয় হলো- এলএনজি আমদানিকে প্রয়োজনীয় কিন্তু নিয়ন্ত্রিত বিকল্প হিসেবে রাখা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় আগামী এক দশকে এলএনজি পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। বরং দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি প্রয়োজন হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এমন কোনো ব্যবস্থা করা উচিত নয়, যেখানে দেশীয় অনুসন্ধানের পরিবর্তে এলএনজি আমদানিই প্রধান সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।

এখানে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি, স্পট মার্কেট থেকে কেনা, টার্মিনাল সক্ষমতা এবং সংরক্ষণ ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকলে কেনা, দাম বেশি থাকলে ঝুঁকি কমানো এবং সরবরাহের উৎস বহুমুখী করার কৌশল থাকতে হবে। একটি উৎস বা একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

চতুর্থ এবং ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা বিষয় হলো- নবায়নযোগ্য জ্বালানি। বাংলাদেশের জন্য এটি এখন আর কেবল পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও। সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা যথেষ্ট। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানার রুটটপ সোলার, সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে ও অন্যান্য অব্যবহৃত জমি, জলাশয়ভিত্তিক ফ্লোটিং সোলার- এসব ক্ষেত্রে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে কম, যদিও ইনস্টলড রিনিউঅ্যাবল ক্যাপাসিটি প্রায় ১,৬৯৫ মেগাওয়াট পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আরও ৮০৯.৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য জানিয়েছে।

তবে শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না। এর সঙ্গে ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড, ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি এবং গ্রিড ব্যালেন্সিংয়ের পরিকল্পনাও থাকতে হবে। কারণ, সূর্য যখন নেই, তখন সৌরবিদ্যুৎও নেই। ফলে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎব্যবস্থা হতে হবে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা- গ্যাস, সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, ব্যাটারি স্টোরেজ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য উৎসের সমন্বয়ে।

পঞ্চম বিষয় হলো জ্বালানি দক্ষতা। আমরা প্রায়ই জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে দেখি। কিন্তু যে জ্বালানি অপচয় হচ্ছে, সেটি বাঁচানোও এক ধরনের নতুন জ্বালানি উৎপাদন। শিল্পকারখানায় ইনার্জি ইফেশিয়েন্ট মেশিনারি, ভবনে ইনার্জি-ইফেশিয়েন্ট কুলিং সিস্টেম, পরিবহণে ফুয়েল ইফেশিয়েন্সি, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং গণপরিবহন উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহারের চাপ কমানো সম্ভব।

ষষ্ঠ বিষয় হলো- বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা। জ্বালানি পরিকল্পনা সফল করতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা, প্রকৃত চাহিদা, ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি এবং ডিস্ট্রিবিউশন ইফিশিয়েন্সি- সবকিছুকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। শুধু ইনস্টলড ক্যাপাসিিটি বাড়িয়ে গেলে হবে না; কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং কোন জ্বালানি দিয়ে উৎপাদন করলে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত হবে-তার ওপর ভিত্তি করে ক্যাপাসিটি প্ল্যানিং করতে হবে।

একই সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণেও দীর্ঘমেয়াদি ও স্বচ্ছ নীতি প্রয়োজন। ভর্তুকি কোথায় থাকবে, কোথায় থাকবে না, শিল্পের জন্য জ্বালানির মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ কীভাবে কমানো হবে- এসব প্রশ্নের উত্তরও ১০ বছরের পরিকল্পনায় থাকা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই পরিকল্পনা যেন কেবল কাগজে-কলমে একটি মহাপরিকল্পনা হয়ে না থাকে। এর সঙ্গে থাকতে হবে সময়ভিত্তিক বাস্তবায়ন সূচি, অর্থায়নের উৎস, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য এবং সংসদীয় জবাবদিহি। প্রতি বছর সংসদে পরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা যেতে পারে। এতে সরকার পরিবর্তন হলেও জাতীয় জ্বালানি নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বিরল সুযোগও তৈরি হয়েছে। দেশের জ্বালানি সংকট আমাদের দুর্বলতা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি আমাদের করণীয়ও স্পষ্ট করে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এলএনজি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দেখিয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি ভূরাজনীতিরও বিষয়। যে দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎস যত শক্তিশালী, বৈশ্বিক সংকটে তার দর-কষাকষির ক্ষমতাও তত বেশি।

সুতরাং আগামী ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনার মূল দর্শন হওয়া উচিত- আমদানি বন্ধ করা নয়, আমদানিনির্ভরতা কমানো; জীবাশ্ম জ্বালানি একদিনে বাদ দেওয়া নয়, বরং ধীরে ধীরে একটি বৈচিত্র্যময় ও নিরাপদ ইনার্জি মিক্স তৈরি করা; শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে পারে, বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে, বাপেক্সকে আধুনিক ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে, ৯০ দিনের স্ট্রেটেজিক ফুয়েল রিজার্ভ গড়ে তুলতে পারে, এলএনজি আমদানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করতে পারে এবং একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইনার্জি ইফিশিয়েন্সিতে বড় বিনিয়োগ করতে পারে- তাহলে এই দশ বছরের পরিকল্পনা কেবল জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা থাকবে না। এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে যে পরিকল্পনা উপস্থাপনের কথা বলেছেন, তাই সেটিকে একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক নথি হিসেবে না দেখে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দলিল হিসেবে দেখা দরকার। কারণ আগামী দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কত বিদ্যুৎ আমরা উৎপাদন করতে পারব- তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমাদের শিল্প, কৃষি ও অর্থনীতি চালানোর জ্বালানি আমরা কোথা থেকে পাব, কতটা নিশ্চিতভাবে পাব এবং কতটা সাশ্রয়ী মূল্যে পাব।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন