কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিশুসুরক্ষা: আমরা কি প্রস্তুত?
মৌমিতা আনোয়ার
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম
কয়েক মাস আগে ঢাকাভিত্তিক একজন স্কুলশিক্ষক একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন। সাধারণত হাসিখুশি স্বভাবের ১২ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী হঠাৎ করে চুপচাপ, উদ্বিগ্ন ও অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। শিক্ষক হিসেবে তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের আচরণের সঙ্গে খুবই পরিচিত ছিলেন, তাই বুঝতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি যে শিশুটির সঙ্গে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। এরপর তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন এবং অনুসন্ধান চালান। কয়েক সপ্তাহের অনুসন্ধানের পর সত্যটি সামনে আসে।
সহপাঠীদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ভুয়া ছবির মাধ্যমে শিশুটিকে অনলাইনে টার্গেট করা হয়েছিল। ছবিটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে, তা যে কাউকে অপমানিত ও আতঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল, বিশেষ করে একটি শিশুর ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনার বৃদ্ধি প্রমাণ করছে যে শিশুদের ব্যবহৃত ডিভাইসগুলোর আড়ালে আরও বড় এক বিপদ লুকিয়ে আছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ইতোমধ্যেই শিশুদের শেখা, খেলা, যোগাযোগ এবং নিজেদের প্রকাশ করার ধরন বদলে দিচ্ছে। শিক্ষামূলক অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং জেনারেটিভ এআই টুল—প্রযুক্তি এখন শিশুদের জীবনের গভীরে প্রবেশ করেছে এবং তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে উঠেছে। যদিও এআই শেখা ও সুরক্ষার জন্য অসাধারণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তবুও এটি শিশুসুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুতর এবং প্রায়ই অবমূল্যায়িত ঝুঁকিও তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন নীরবে আমাদের ফোন, শ্রেণিকক্ষ এবং ঘরে প্রবেশ করছে, তখন একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে আসছে: এই নতুন ডিজিটাল বাস্তবতায় আমরা কি আমাদের শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে প্রস্তুত?
ডিজিটাল সংযোগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ৭ কোটিরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তারের ফলে শিশুরা এখন আগের চেয়ে কম বয়সে অনলাইনে আসছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইনে থাকছে। তারা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে খেলতে যাওয়ার চেয়ে ঘরে থেকে অনলাইনে থাকতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে উপকারী। এটি অল্প বয়স থেকেই শেখার অসংখ্য সুযোগ সৃষ্টি করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো শক্তিশালী প্রযুক্তির ব্যবহার সম্ভব করে তোলে। তবে এর সঙ্গে নতুন মাত্রার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এআই-চালিত প্রোগ্রামের সাহায্যে অপরাধীরা এখন একজন ব্যক্তি, শিশু কিংবা পুরো পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ভয়ংকর সব উপাদান তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এসব প্রযুক্তি মানুষের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করতে পারে এবং ভীতিকর নির্ভুলতায় ভুয়া ছবি তৈরি করতে সক্ষম।
বাংলাদেশি শিশুরা ইতোমধ্যেই অনলাইন যৌন নির্যাতন, ইন্টারনেটভিত্তিক যৌন শোষণ এবং সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, শিশুরা অনলাইন নির্যাতনের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সচেতনতা এবং অভিযোগ জানানোর হার এখনো কম। এআই অপব্যবহারকারীদের জন্য শিশুদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে গোপনে টার্গেট করা, পরিচয় গোপন রাখা এবং নির্যাতন ছড়িয়ে দেওয়া আরও সহজ করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অভিভাবক এবং বিদ্যালয়গুলোর জন্য এআই-জনিত ক্ষতি শনাক্ত করা বা মোকাবিলা করা কঠিন, কারণ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান শিশুসুরক্ষা ব্যবস্থা মূলত বাস্তব জগতের জন্য তৈরি, অ্যালগরিদম-নির্ভর ডিজিটাল পরিবেশের জন্য নয়। ফলে শিশুরা এমন এক গতিতে অনলাইনে ঝুঁকির মুখে পড়ছে, যার সঙ্গে সুরক্ষা ব্যবস্থা তাল মেলাতে পারছে না।
এআইয়ের যুগে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর। অনলাইন নির্যাতন সামাজিক আস্থা নষ্ট করে, শিশুদের বিচ্ছিন্ন করে তোলে এবং সাইবার সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। যখন একটি সমাজ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করে কিন্তু শিশুদের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করে না, তখন সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তিই ঝুঁকির মুখে পড়ে। এআই-নির্ভর মানসিক শোষণ দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং এমনকি আত্মক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রচলিত বুলিংয়ের মতো নয়, এআই-সৃষ্ট কনটেন্টের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের জন্য কোনো মুক্তির পথ থাকে না, কারণ এসব কনটেন্ট অনন্তকাল ধরে ছড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন, যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং শিশুসুরক্ষা কাঠামো, দ্রুত পরিবর্তিত এআই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতা, কর্মী এবং অভিভাবক। যদি একটি প্রজন্ম ডিজিটাল নিরাপত্তা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষা না পায়, তবে তারা হয় প্রযুক্তিকে ভয় পাবে, নয়তো এর অপব্যবহারের প্রতি অসংবেদনশীল হয়ে উঠবে।
আমরা যদি এখনই পদক্ষেপ না নিই, তবে এআই জ্ঞানসম্পন্নদের আরও সুরক্ষিত করবে এবং দুর্বলদের আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। শিশুসুরক্ষা মানে প্রযুক্তিবিরোধী হওয়া নয়; বরং এটি সফল ডিজিটাল উন্নয়নের একটি অপরিহার্য অংশ।
প্রথমত, নীতিগত সংস্কার জরুরি। বাংলাদেশকে অবশ্যই তার সাইবার এবং শিশুসুরক্ষা আইন হালনাগাদ করতে হবে, যাতে অ্যালগরিদমিক শোষণ, ভুয়া ছবি তৈরি এবং এআই-নির্ভর নির্যাতনের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। জবাবদিহিতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে সরকার, ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান এবং শিশুর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে শিশু-কেন্দ্রিক এআই নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে প্রতিটি প্রযুক্তিগত ও ডিজিটাল সিদ্ধান্তে শিশুদের অধিকার, মর্যাদা এবং সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বিশেষ করে সুরক্ষা, গোপনীয়তা এবং অংশগ্রহণের অধিকারকে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি)-এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোকে পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিশুদের বয়স উপযোগীভাবে সম্মতি, ভুয়া তথ্য, অনলাইন নিরাপত্তা এবং এআই সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষকদেরও ডিজিটাল ক্ষতির সতর্কসংকেত চিহ্নিত করা এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এআই-সংক্রান্ত ঝুঁকি বোঝা এবং সঠিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো বিষয়ে প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। ইন্টারনেট নিরাপত্তার পাশাপাশি শিশুদের ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচিতে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সম্মতি, গোপনীয়তা এবং প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শিশুদেরও এই আলোচনার অংশ হতে হবে। নীতি ও সমাধানগুলোতে শিশুদের মতামত, অভিজ্ঞতা এবং উদ্বেগ প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। শিশুদের শুধু নিয়ন্ত্রণ না করে যখন সচেতন, সক্ষম ও সহযোগিতাপূর্ণ করে তোলা হয়, তখনই সুরক্ষা সবচেয়ে কার্যকর হয়।
সবশেষে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তাদের দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে। শিশু-কেন্দ্রিক ডিজাইন, শক্তিশালী কনটেন্ট ফিল্টারিং, স্বচ্ছ অ্যালগরিদম এবং সহজ অভিযোগ ব্যবস্থা নিয়ে কোনো আপস করা যাবে না। প্ল্যাটফর্মগুলোতে পরবর্তীতে নয়, শুরু থেকেই সুরক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আমরা প্রস্তুত থাকি বা না থাকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আমাদের বাস্তবতা এবং এটি আরও উন্নত হতে থাকবে। আজ আমরা শিশুসুরক্ষা নিয়ে কীভাবে কাজ করছি, সেটিই আমাদের প্রকৃত প্রস্তুতির মানদণ্ড। বাংলাদেশ যদি এখনই আইন শক্তিশালী করে, সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের কেন্দ্রে শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে আমরা নিশ্চিত করতে পারব যে এআই ক্ষতির পরিবর্তে ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠবে। আমাদের শিশুদের ভবিষ্যৎ এর ওপরই নির্ভর করছে।
লেখক: শিক্ষার্থী, রিত্সুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটি (জাপান)