১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস
স্বেচ্ছায় রক্তদান: জীবনের অদৃশ্য সেতুবন্ধন
তুহিন দাস টিটো
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম
মানবসভ্যতা বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, রোবোটিক সার্জারি কিংবা জিন থেরাপির মতো প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু এত উন্নতির পরও এমন একটি উপাদান রয়েছে যার কোনো কৃত্রিম বিকল্প এখনো আবিষ্কৃত হয়নি—তা হলো মানব রক্ত।
একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে আজও প্রয়োজন আরেকজন সুস্থ মানুষের স্বেচ্ছায় দান করা রক্ত। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে ক্যান্সার ইউনিট, থ্যালাসেমিয়া সেন্টার, ডায়ালাইসিস ইউনিট কিংবা অপারেশন থিয়েটার—সবখানেই রক্তের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় নিরাপদ রক্তের সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
প্রতি বছর ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস পালিত হয়। দিবসটি শুধু রক্তদাতাদের সম্মান জানানোর জন্য নয়; বরং নিরাপদ রক্তের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১০ লক্ষ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। রাজধানী ঢাকায় দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা সুবিধা থাকায় বিভিন্ন জেলা থেকে জটিল রোগীরা চিকিৎসার জন্য এখানে আসেন। ফলে ঢাকায় রক্তের চাহিদা দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।
রক্তের জন্য অপেক্ষমাণ হাজারো রোগী
রক্তের প্রয়োজন শুধু দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের জন্য নয়। দেশের অসংখ্য ক্যান্সার রোগী, থ্যালাসেমিয়া রোগী, কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী, প্রসূতি মা, শিশু রোগী এবং বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করা রোগীরা প্রতিনিয়ত রক্তের ওপর নির্ভরশীল।
অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় দুর্ঘটনায় আহতদের রক্তের প্রয়োজনীয়তার আহবান পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। তখন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক অনেক বেশি মানুষ রক্ত দানের জন্যে এগিয়ে আসেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন অসংখ্য রোগী নীরবে রক্তের জন্য অপেক্ষা করেন। তাদের প্রয়োজন নিয়মিত এবং দীর্ঘমেয়াদি। একজন রোগীর জন্য একদিন রক্ত জোগাড় করা যতটা সহজ, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর রক্ত সংগ্রহ করা ততটাই কঠিন।
ক্যান্সার রোগীদের নীরব সংগ্রাম
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ১.৫ থেকে ২ লক্ষ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ক্যান্সার চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং অস্ত্রোপচার। কিন্তু কেমোথেরাপি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার পাশাপাশি অস্থিমজ্জার স্বাভাবিক কোষগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে নতুন রক্তকণিকা তৈরির হার কমে যায়। এর ফলে রোগীদের মধ্যে তীব্র রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, শ্বাসকষ্ট হয়, মাথা ঘোরে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। অনেক সময় হিমোগ্লোবিন বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে রোগীকে রক্ত দিতে হয়।
আবার রক্তের ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে প্লাটিলেটের মাত্রা এতো কমে যেতে পারে যে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তখন প্লাটিলেট ট্রান্সফিউশন ছাড়া রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওষুধের পাশাপাশি নিরাপদ রক্তও একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
থ্যালাসেমিয়া: জন্ম থেকেই রক্তের ওপর নির্ভরশীল জীবন
থ্যালাসেমিয়া বাংলাদেশের একটি বড় কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি একটি বংশগত রক্তরোগ, যা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানের মধ্যে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করেন। বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার থ্যালাসেমিয়া রোগী রয়েছে এবং প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু এই রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের শরীরে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না। ফলে তারা দীর্ঘস্থায়ী রক্তশূন্যতায় ভোগে। স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা করা কিংবা খেলাধুলা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রতি মাসে একাধিক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ একজন শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি মাসে নতুন নতুন রক্তদাতার প্রয়োজন হয়। অনেক পরিবার মাসের পর মাস রক্তদাতা খুঁজে বেড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেদন করে, আত্মীয়-স্বজনের কাছে অনুরোধ করে কিংবা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাহায্য নেয়। বাস্তবতা হলো, একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর জীবন অনেকাংশে নির্ভর করে সমাজের স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী মানুষের ওপর।
কিডনি রোগ ও ডায়ালাইসিস রোগীদের রক্তের প্রয়োজন
বাংলাদেশে কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং সচেতনতার অভাবে লাখ লাখ মানুষ কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কিডনি শুধু শরীরের বর্জ্য অপসারণ করে না; এটি এরিথ্রোপয়েটিন নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোনও তৈরি করে। এই হরমোন নতুন লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে। যখন কিডনি বিকল হতে শুরু করে, তখন এই হরমোনের উৎপাদন কমে যায়। ফলে রোগীরা রক্তশূন্যতায় ভোগেন। নিয়মিত ডায়ালাইসিসের সময়ও কিছু রক্তকণিকা নষ্ট হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতা এতটাই মারাত্মক হয় যে রক্ত সঞ্চালন প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত রক্ত না পেলে হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। তাই কিডনি রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নিরাপদ রক্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপদ রক্তের গুরুত্ব
রক্ত শুধু সংগ্রহ করলেই হবে না, সেটি হতে হবে নিরাপদ। অপরীক্ষিত রক্তের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, এইচআইভি, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে হবে। নিরাপদ রক্ত শুধু রোগীকে জীবন দেয় না, তাকে নতুন কোনো রোগের ঝুঁকি থেকেও রক্ষা করে।
বাংলাদেশে নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কোয়ান্টাম ব্লাড ল্যাব। ২০০০ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বছরে প্রায় এক লক্ষ থেকে এক লক্ষ বিশ হাজার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পূরণে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। এখানে রক্তদাতাদের বিভিন্ন সংক্রামক রোগের স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঈদ, পূজা, জাতীয় ছুটি কিংবা গভীর রাত—যখনই প্রয়োজন হয়েছে, স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতারা মানবতার সেবায় এগিয়ে আসছেন।
প্রয়োজন ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পের আয়োজন
অনেক মানুষ রক্ত দিতে আগ্রহী থাকলেও কর্মব্যস্ততা, দূরত্ব এবং যানজটের কারণে হাসপাতালে বা রক্তদান কেন্দ্রে যেতে পারেন না। এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলো নিয়মিত ব্লাড ক্যাম্প আয়োজন করলে বিপুল পরিমাণ নিরাপদ রক্ত সংগ্রহ করা সম্ভব। মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় ব্যয় করে একজন কর্মী বা শিক্ষার্থী একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর সুযোগ পান। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধও বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—মানবতার সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হলো অন্যের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসা। একজন রক্তদাতার কয়েক মিনিট সময় একজন ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। একজন থ্যালাসেমিয়া শিশুর মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে পারে। একজন ডায়ালাইসিস রোগীকে নতুন জীবন দিতে পারে। তাই আসুন, আমরা স্বেচ্ছায় রক্তদান করি, অন্যকে উদ্বুদ্ধ করি এবং আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প আয়োজন করি। কারণ নিরাপদ রক্তের প্রতিটি ব্যাগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি নতুন আশার গল্প।
লেখক: সংগঠক, কোয়ান্টাম স্বেচ্ছা রক্তদান কার্যক্রম