EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

অস্ট্রিয়ার পাহাড়ে থাকা এক গরু বদলে দিল প্রাণীর বুদ্ধি নিয়ে ধারণা

ভেরোনিকা শুধু যন্ত্র ব্যবহারই করে না, পরিস্থিতি বুঝে যন্ত্রের কোন অংশ ব্যবহার করতে হবে, সেটাও জানে

ডেইলি সান রিপোর্ট, ঢাকা

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১১ পিএম

অস্ট্রিয়ার পাহাড়ে থাকা এক গরু বদলে দিল প্রাণীর বুদ্ধি নিয়ে ধারণা
অ অ

অস্ট্রিয়ার পাহাড়ঘেরা, ছবির মতো সুন্দর এক শহরে থাকে ভেরোনিকা নামের এক গরু। চারপাশে তুষারঢাকা পাহাড়, নীল হ্রদ আর সবুজ মাঠ—এমন পরিবেশে যে কোনো প্রাণীরই আরামে থাকার কথা। ভেরোনিকা অবশ্য সাধারণ কোনো গরু নয়। সে কোনো খামারের উৎপাদনমুখী প্রাণী নয়, পরিবারের একজন পোষা সদস্য।

ভেরোনিকাকে বিশেষ করে তুলেছে তার এক অদ্ভুত অভ্যাস। গায়ে চুলকানি উঠলে সে মানুষের মতোই সমস্যার সমাধান খুঁজে নেয়। একটি ঝাঁটা দিয়ে নিজের পিঠ নিজেই চুলকায় ভেরোনিকা। শুনতে অবাক লাগলেও, এটিই এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে নথিভুক্ত প্রথম ঘটনা—যেখানে দেখা গেছে একটি গরু সচেতনভাবে যন্ত্র ব্যবহার করছে।

চলতি জানুয়ারিতে বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল কারেন্ট বায়োলজি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ভেরোনিকা শুধু যন্ত্র ব্যবহারই করে না, পরিস্থিতি বুঝে যন্ত্রের কোন অংশ ব্যবহার করতে হবে, সেটাও জানে।

১৩ বছর বয়সী ভেরোনিকা অস্ট্রিয়ার কৃষক উইটগার উইগেলের বাড়িতে থাকে। খোলা পরিবেশে অবাধে ঘোরাফেরা করে। এই বয়স পর্যন্ত বেশির ভাগ গরুই পৌঁছাতে পারে না। গবেষকদের মতে, এমন মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশই হয়তো ভেরোনিকার বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে।

ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের কগনিটিভ বায়োলজিস্ট অ্যালিস আউয়ার্সপার্গ বলেন, ‘আমরা সাধারণত গরুকে বোকামির প্রতীক হিসেবে দেখি। এমনকি জনপ্রিয় কার্টুনেও গরুর যন্ত্র বানানোর ধারণাকে হাস্যকরভাবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু ভেরোনিকার আচরণ সেই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।’

ভেরোনিকার গল্পটি প্রথম সামনে আসে একটি ভিডিও থেকে। লোকেশন খুঁজতে গিয়ে এক চিত্রনির্মাতা তার ভিডিও ধারণ করেন। সেখানে দেখা যায়, ভেরোনিকা একটি পুরোনো রেক দিয়ে নিজের পিঠ চুলকাচ্ছে। গবেষকদের চোখে বিষয়টি আলাদা মনে হয়, কারণ এটি ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক আচরণ।

গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ভেরোনিকার সামনে রাখেন কাঠের হাতলওয়ালা একটি ডেক পরিষ্কারের ঝাঁটা। ঝাঁটার এক পাশে শক্ত ব্রিসল, অন্য পাশে মসৃণ কাঠের হাতল। পরীক্ষায় দেখা যায়, ভেরোনিকা জিব ও দাঁত দিয়ে ঝাঁটা তুলে শরীরের পেছনের দিকে নিয়ে যায় এবং চুলকাতে শুরু করে।

কয়েক দিনের মধ্যে ৭০টি পরীক্ষায় সে মোট ৭৬ বার ঝাঁটা ব্যবহার করে। গ্রীষ্মকালে ঘোড়ামাছি বা হর্স-ফ্লির কারণে চুলকানি কমাতেই এই কাজ করছিল সে।

শুরুতে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, পিঠের শক্ত ও মোটা চামড়ার অংশে ভেরোনিকা ব্যবহার করছে শক্ত ব্রিসল। আর পেটের নরম অংশ—যেমন ওলান বা ঝুলে থাকা ত্বকে—সে ব্যবহার করছে ঝাঁটার কাঠের হাতল। অর্থাৎ, কোন জায়গায় কেমন স্পর্শ দরকার, সেটা সে বুঝেই কাজ করছিল।

গবেষকদের মতে, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, সম্পূর্ণ সচেতন আচরণ। প্রাণিজগতে এমন দক্ষতা শিম্পাঞ্জি, হাতি, কাক বা ডলফিনের মধ্যে দেখা গেলেও গরুর ক্ষেত্রে এটি প্রথম নথিভুক্ত উদাহরণ।

গবেষণায় যুক্ত না থাকলেও জার্মানির রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর ফার্ম অ্যানিমেল বায়োলজির গবেষক ক্রিশ্চিয়ান নাওরথ বলেন, ‘খামারের প্রাণীদের সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা এখনো খুব সীমিত। আমরা জানি, তারা অনুভব করতে পারে, সমস্যা সমাধান করতে পারে। কিন্তু তবু আমরা তাদের অবমূল্যায়ন করি।’

গবেষকদের মতে, ভেরোনিকার ঘটনা ব্যতিক্রম হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে আরও কিছু গরু ও ষাঁড়ের মধ্যে এমন আচরণের ভিডিও পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ব্রাহমা জাতের গরুর মধ্যে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এই সক্ষমতা গরুর স্বভাবের গভীর কোথাও লুকিয়ে আছে।

গবেষণার শেষে অ্যালিস আউয়ার্সপার্গ প্রশ্ন তুলেছেন—হাজার হাজার বছর ধরে গরুর সঙ্গে বসবাস করেও, আমরা কি সত্যিই তাদের চিনতে পেরেছি?

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন