EN ☀️
×

Follow Us

ফিচার

বিপন্ন ‘পাখির অভয়ারণ্য’

জাহাঙ্গীরনগর থেকে কি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পরিযায়ী পাখিরা?

১৯৯০ সালের দিকে এখানে প্রথম পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে।

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:২২ এএম

জাহাঙ্গীরনগর থেকে কি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পরিযায়ী পাখিরা?

লেকের শান্ত জলে ক্ষণিক বিশ্রামে অতিথিরা। ছবি: অরিত্র সাত্তার

অ অ

সুদূর সাইবেরিয়া থেকে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে তারা আসে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। ডানার ঝাপটায় আর কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে জলাশয়।

একসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতের সকাল মানেই ছিল লাল শাপলার ভিড়ে অতিথি পাখিদের জলকেলি।

কিন্তু প্রকৃতির সেই নান্দনিক দৃশ্যপট এখন কেবলই সোনালি অতীত। অব্যবস্থাপনা, দূষণ আর মানুষের অসংবেদনশীলতায় আজ অস্তিত্ব সংকটে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চিরচেনা ঐতিহ্য।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০টি জলাশয় রয়েছে। ১৯৯০ সালের দিকে এখানে প্রথম পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। তবে গত কয়েক বছরে চিত্রটি আশঙ্কাজনকভাবে বদলে গেছে।

তথ্যমতে, ২০১৯-২০ সালেও যেখানে শীতের মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার পাখির দেখা মিলত, গত তিন বছরে তা কমে ২ হাজার ৫০০-এ নেমে এসেছে। চলতি বছর এই সংখ্যা আরও কমে ২ হাজারের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. কামরুল হাসান বর্তমানে এই পরিস্থিতিকে এক ধরনের ‘ইকোলজিক্যাল ডিক্লাইন’ বা বাস্তুতান্ত্রিক অবক্ষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

  ডানা মেলার আনন্দটুকু যেন হারিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা সংকটে

পাখি কমার নেপথ্যে নানামুখী কারণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখিরা নিরাপদ মনে করছে না বলেই জাহাঙ্গীরনগর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো-

অপরিকল্পিত উন্নয়ন: ক্যাম্পাসে যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মাণ ও গাছ কাটার ফলে পাখিদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে।

খাদ্য সংকট ও জলাশয় দূষণ: মাছ চাষের জন্য লেক ইজারা দেওয়া এবং যথাসময়ে লেক সংস্কার না করায় পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আমীর হোসেন ভূইয়া বলেন, ‘লেকের সংযোগ বন্ধ হওয়ায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অণুজীব বা ছোট মাছ জন্মাচ্ছে না, যা পাখিদের প্রধান খাদ্য।’

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও শব্দদূষণ: অতিরিক্ত দর্শনার্থীদের ভিড়, যানবাহনের শব্দ, ছবি তোলার হিড়িক এবং পাখিদের লক্ষ্য করে ঢিল বা খাবার ছোড়া তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। সংরক্ষিত ‘ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার’ (ডব্লিউআরসি) এলাকায় অনুমতি ছাড়া মানুষের প্রবেশও পাখিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাম্পাসের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের চোখে এই পরিবর্তনটি বেশ পীড়াদায়ক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফ আহমেদ তার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা যখন প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলাম, তখন লেকের পাড়ে দাঁড়ালে ডানা ঝাপটানোর শব্দে কান পাতা দায় হতো। এখন লেকের পাড়ে পাখির চেয়ে মানুষের শোরগোল বেশি। পর্যটকদের চিপসের প্যাকেট আর প্লাস্টিক বোতল লেকের পানিতে ভাসছে। এমন পরিবেশে বন্যপ্রাণীরা কতক্ষণ টিকতে পারে?’

বর্তমানে যেটুকু টিকে আছে

এ বছর হাতেগোনা কয়েকটি লেক যেমন- ডব্লিউআরসি এবং সম্প্রতি পরিষ্কার করা জয়পাড়া লেকে কিছু পাখির দেখা মিলছে। সেখানে সরালি, গার্গেনি, খয়রা কাস্তেচরা ছাড়াও কিছু বিরল শিকারি পাখি যেমন- হানি বাজার্ড বা স্পটেড ঈগলের দেখা পাওয়া গেছে। আলোকচিত্রী ও শিক্ষার্থী অরিত্র সাত্তারের মতে, কেবল যে লেকগুলোতে মানুষের কৃত্রিম হস্তক্ষেপ কম এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় আছে, সেখানেই পাখিরা বসছে।

লেক সংস্কার ও পাখির উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার কর্মকর্তা আব্দুর রব বলেন, ‘পাখি কমার দায় আমাদের আছে। পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব এবং নতুন ভবন নির্মাণের ফলে আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, গত কয়েক দিনে কিছু পাখি আসতে শুরু করেছে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করলে হারানো পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

অধ্যাপক আমীর হোসেন ভূইয়া মনে করেন, প্রতিটি লেককে আলাদাভাবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী ‘মনিটরিং প্রোগ্রাম’ চালু করা জরুরি। মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পানির স্বচ্ছতা বজায় রাখার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।

ডানায় ক্লান্তি, চোখে শঙ্কা। ছবি: অরিত্র সাত্তার

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য আর অতিথি পাখি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ক্যাম্পাস কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, বরং কয়েক হাজার মাইলের পরিশ্রান্ত ডানার এক আশ্রস্থলও বটে। যদি এখনই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে জাহাঙ্গীরনগরের লেকগুলো হয়তো কেবলই স্থির পানির আধার হয়ে থাকবে; আর আকাশ হারাবে তার ডানা মেলা সেই রঙিন অতিথিদের।

প্রকৃতির প্রতি আমাদের এই উদাসীনতা কি তবে একটি সুন্দর ঐতিহ্যের সমাপ্তি ঘটাবে? উত্তরটা সময় এবং আমাদের কাজের ওপরই নির্ভর করছে।

চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী সায়মা আক্তার মনে করেন, প্রশাসনের নজরদারির অভাবই এর প্রধান কারণ। তিনি বলেন, ‘প্রশাসন শুধু ‘পাখি শিকার নিষেধ’ ব্যানার টাঙিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। কিন্তু লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন দর্শনার্থীরা উচ্চস্বরে গান বাজায় বা পাখিদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে, তখন তাদের থামানোর মতো কেউ থাকে না। আমরা আমাদের ক্যাম্পাসের এই অনন্য সৌন্দর্যকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি।’

জনশূন্য লেকই এখন পরিযায়ী পাখিদের শেষ আশ্রয়স্থল

গত বছর প্রাণিবিদ্যা বিভাগের নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী ক্যাম্পাসে প্রায় ৩ হাজার পরিযায়ী পাখির দেখা মিলেছিল। যার সিংহভাগেরই বিচরণ ছিল ওয়াইল্ডলাইফ রেস্কিউ সেন্টার (ডব্লিউআরসি) সংলগ্ন লেকে। তবে বিগত সময়ের তুলনায় এ বছর প্রশাসনিক ভবন ও পরিবহন চত্বর সংলগ্ন লেকগুলোর চিত্র ভিন্ন। গত বছর এসব এলাকায় প্রায় ৫০০ পাখির দেখা মিললেও এ বছর তা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। মূলত মানুষের অবাধ যাতায়াত ও কৃত্রিম কোলাহলই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরেজমিনে ডব্লিউআরসি ও সুইমিংপুল সংলগ্ন লেক পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, এখনো বেশ কিছু বিরল ও বৈচিত্র্যময় প্রজাতির পাখির আনাগোনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- গ্লসি আইবিস (খয়রা কাস্তেচরা), রাজ সরালি (ফুলভাজ হুইসলিং ডাক), পাতি সরালি ও গার্গেনি।

দেশীয় প্রজাতির শামুকখোল (এশিয়ান ওপেনবিল), চেঞ্জেবল হক ঈগল ও ওরিয়েন্টাল হানি বাজার্ড। এছাড়া সাময়িকভাবে দেখা মিলেছে গ্রেটার স্পটেড ঈগল, ইন্ডিয়ান স্পটেড ঈগল ও বুটেড ঈগলের মতো দুর্লভ শিকারি পাখির।

ডব্লিউআরসি লেকের প্রাকৃতিক পরিবেশ এখনো ধরে রেখেছে অতিথি পাখিদের। ছবি: অরিত্র সাত্তার

বর্তমানে যে পাখিগুলো দেখা যাচ্ছে, অরিত্রর মতে সেগুলো মূলত তৃতীয় বা চতুর্থ ধাপে (ওয়েভ) আসা পাখি। তিনি বলেন, ‘এসব পাখি এখন কেবল ডব্লিউআরসি লেকেই ভিড় করছে। এর প্রধান কারণ হলো সেখানে মানুষের কৃত্রিম কার্যক্রম নেই এবং পুকুরটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে।’

শিক্ষার্থীদের দাবি, কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়ে লেকগুলোকে পাখিদের জন্য অভয়াশ্রম হিসেবে গড়ে তোলা হোক। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে এবং পরিযায়ী পাখিরা অবস্থানকালীন সময়ে নির্দিষ্ট লেকগুলোতে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের দাবি।

শীত শেষে বসন্তে পাখিরা হয়তো ফিরে যাবে তাদের নিজ আবাসে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- আগামী বছর জাহাঙ্গীরনগরের জলাশয়গুলো কি পারবে তাদের আবার আপন করে নিতে? নাকি চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যাবে অতিথি পাখিদের সেই সুমধুর কলতান?

আরও পড়ুন