মুস্তাফা মনোয়ার
‘জন্মদিন মানেই একটা বছর বেড়ে যাওয়া। ছোটবেলায় খুব ভালো লাগত। একসময় দেখলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।’
সাত বছর আগে নিজের জন্মদিনে কথাগুলো বলা বরেণ্য চিত্রশিল্পী, নির্মাতা ও পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আজ আর নেই।
সোমবার (২৯ জুন) তার মৃত্যুতে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তবে তার প্রস্থান কেবল একজন শিল্পীর বিদায় নয়; এটি বাংলাদেশের সৃজনশীল সংস্কৃতির একটি যুগের অবসান।
মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি ক্যানভাসের গণ্ডি পেরিয়ে শিল্পকে মানুষের জীবনের অংশ করে তুলেছিলেন। তার কাছে শিল্প মানে শুধু প্রদর্শনীর দেয়ালে টাঙানো ছবি নয়; শিল্প ছিল শিক্ষা, বিনোদন, মানবিকতা আর কল্পনাশক্তি জাগিয়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি চিত্রকলা, টেলিভিশন, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, কার্টুন ও পাপেটশিল্প প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখে গেছেন অবদান।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার শ্রীপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম খ্যাতিমান কবি। সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহেই তার শৈশব কেটেছে।
শৈশবে কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে নারায়ণগঞ্জের একটি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষার চেয়ে শিল্পের প্রতিই ছিল তার গভীর টান। তাই কলেজের পড়াশোনা শেষ না করেই ভর্তি হন কলকাতার সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। সেখানে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে নিজের অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
পরবর্তীতে ঢাকা আর্ট কলেজ (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিল্পচর্চা ও শিল্পশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যদিও তিনি সারাজীবন পূর্ণকালীন চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, তবু তার আঁকা প্রতিটি ছবিতেই ছিল নিজস্ব ভাষা, লোকজ ঐতিহ্য, শক্তিশালী রেখা এবং রঙের অনন্য ব্যবহার।
চিত্রকলা ছেড়ে টেলিভিশন
চারুকলায় অসাধারণ ফল করার পরও পেশা হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। এটি ছিল সময়ের তুলনায় ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, টেলিভিশনের মাধ্যমে শিল্প ও সংস্কৃতিকে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি নির্মাণ করেছেন অসংখ্য নাটক ও অনুষ্ঠান। ‘রক্তকরবী’, ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’, ‘নতুন কুঁড়ি’, ‘মনের কথা’সহ নানা অনুষ্ঠান তার সৃজনশীলতার স্বাক্ষর বহন করে। অনুষ্ঠান নির্মাতা হিসেবে তিনি যেমন নন্দনতত্ত্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি সাধারণ মানুষের ভাষা ও অনুভূতিকেও তুলে ধরেছেন।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য তার অবদান ছিল অনন্য। সহজভাবে ছবি আঁকা শেখানো, গল্প, গান, অভিনয় ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিশুদের কল্পনাশক্তি বিকাশে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। তার উপস্থাপনা ছিল প্রাণবন্ত ও শিক্ষামূলক।
শিশুদের শিল্পবন্ধু
মুস্তাফা মনোয়ারের নাম উচ্চারণ করলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে শিশুদের জন্য নির্মিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'মনোজগত'। এই অনুষ্ঠান শুধু বিনোদন নয়, বরং শিল্প, কল্পনা ও সৃজনশীলতার এক উন্মুক্ত বিদ্যালয় হয়ে উঠেছিল।
এ ছাড়া তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন। তার আঁকা ছবিগুলো ছিল সহজ, প্রাণবন্ত এবং শিশুমনের উপযোগী। তিনি বিশ্বাস করতেন, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শিল্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে তারা মানবিক ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে।
পাপেট ছিল আজীবনের ভালোবাসা
চিত্রকলা কিংবা টেলিভিশনের বাইরেও মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে বড় ভালোবাসার জায়গা ছিল পাপেট বা পুতুলনাট্য। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেট নিয়েই কাজ করেছেন।
ধানমন্ডির নিজের বাড়ির দোতলায় গড়ে তুলেছিলেন একটি ছোট্ট পাপেট ওয়ার্কশপ। সেখানেই নতুন নতুন পাপেট তৈরি, নকশা, চরিত্র নির্মাণ এবং প্রশিক্ষণ চলত নিয়মিত। অবসরের পরও দিনের অধিকাংশ সময় তিনি এই কর্মশালাতেই কাটাতেন।
তিনি শুধু নিজে পাপেট তৈরি করেননি; বরং বাংলাদেশে পাপেটশিল্পের একটি শক্তিশালী ধারা গড়ে তুলেছেন। অসংখ্য তরুণ শিল্পীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তৈরি করেছেন নতুন অনুসারী ও গুণগ্রাহী। তার হাত ধরেই পাপেটশিল্প নতুনভাবে পরিচিতি পেয়েছে এবং শিশুদের শিক্ষার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
যে উত্তরাধিকার রেখে গেলেন
মুস্তাফা মনোয়ার হয়তো আর নতুন কোনো ছবি আঁকবেন না, নতুন কোনো পাপেট তৈরি করবেন না কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় নতুন কোনো অনুষ্ঠান উপহার দেবেন না। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সৃষ্টি, তার গড়ে তোলা শিল্পচর্চার ধারা এবং তার হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্পীর মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন।
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি ছিলেন সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। শিল্পকে মানুষের জীবনের অংশ করে তোলার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেটিই তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।