EN ☀️
×

Follow Us

জীবনযাপন

রাত জেগে কাজ করার অভ্যাস কি শরীরের ক্ষতি করছে?

ইমন ইসলাম

ইমন ইসলাম

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম

রাত জেগে কাজ করার অভ্যাস কি শরীরের ক্ষতি করছে?
অ অ

আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতি, ফ্রিল্যান্সিং, আর ওটিটি প্ল্যাটফর্মের যুগে রাত জাগাটা অনেকের কাছেই এক নতুন জীবনধারা। কেউ ভাবেন শান্ত পরিবেশে রাতে মনোযোগ বেশি বসে, আবার কেউ এটাকে শুধুই বদঅভ্যাস মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব কী বলছে? রাত জেগে কাজ করা কি সত্যিই কোনো সুফল এনে দেয়, নাকি এটি আপনার শরীরের বারোটা বাজাচ্ছে?

রাত তখন একটা। চারপাশ নিঝুম। সবাই যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন একদল তরুণের ঘরের বাতি জ্বলছে। ল্যাপটপের আলোয় উজ্জ্বল তাদের মুখ, দ্রুত চলছে কিবোর্ডের বোতাম। কেউ ফ্রিল্যান্সিং প্রজেক্ট শেষ করছেন, কেউ আবার কর্পোরেট প্রেজেন্টেশন বানাচ্ছেন। আধুনিক যুগে এই দৃশ্য খুবই চেনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে এই যে রাত জেগে কাজ করা, এটি আমাদের জন্য কতটা ভালো আর কতটা খারাপ?

যারা রাতে কাজ করতে পছন্দ করেন, তাদের বলা হয় ‘নাইট আউল’। তাদের মতে, রাতের বেলা কাজের উৎপাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণও রয়েছে—

• কোলাহলমুক্ত পরিবেশ: দিনের বেলার ফোনের রিংটোন, যানবাহনের হর্ন কিংবা সহকর্মীদের হট্টগোল রাতে থাকে না। এই নিস্তব্ধতা গভীর মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।

• সৃজনশীলতার বিকাশ: অনেক লেখক, ডিজাইনার বা কোডার মনে করেন, রাতের শান্ত পরিবেশে তাদের মাথায় নতুন এবং সৃজনশীল আইডিয়া বেশি আসে।

• কাজের স্বাধীনতা: রাতে কোনো তাড়া থাকে না। নিজের গতিতে কাজ শেষ করার একটা মানসিক স্বস্তি পাওয়া যায়।

রাত জাগার সাময়িক সুবিধা যতই থাকুক না কেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান কিন্তু একে খুব একটা ভালো চোখে দেখে না। মানবদেহে ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা একটি প্রাকৃতিক ঘড়ি রয়েছে, যা আলোর ওপর নির্ভর করে ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটালে শরীরে যেসব মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে—

• মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি: পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। এতে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, মনোযোগের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে।

• হৃদরোগ ও স্থূলতার ঝুঁকি: গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রাত জাগেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া রাতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা ওজন দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।

• রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস: ঘুমের সময় আমাদের শরীর কোষ মেরামত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে। রাত জাগলে শরীর সেই সুযোগ পায় না, ফলে ঘন ঘন অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

ভালো নাকি খারাপ: রায় কী?

এককথায় বলতে গেলে, জরুরি প্রয়োজনে মাঝেমধ্যে রাত জাগা ঠিক আছে, তবে একে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করা শরীরের জন্য চরম ক্ষতিকর।

দিনের আট ঘণ্টার কাজ আর রাতের আট ঘণ্টার কাজের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। রাতে ঘুমানোর পর যে গভীর ঘুম হয়, তা দিনের আলোয় ঘুমালে পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই আপাতদৃষ্টিতে রাতে বেশি কাজ হচ্ছে মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি শরীরের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

নিরুপায় হয়ে যারা রাতে কাজ করেন, তাদের জন্য পরামর্শ

অনেকের পেশাই এমন (যেমন: শিফটিং ডিউটি, কল সেন্টার বা গ্লোবাল ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ) যেখানে রাত জাগা ছাড়া উপায় নেই। তারা নিজেদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারেন এই নিয়মগুলো মেনে—

দিনের ঘুম হোক অন্ধকার ঘরে: রাতে কাজ শেষ করে দিনে যখন ঘুমাবেন, ঘরের জানালা ভারী পর্দা দিয়ে ঢেকে দিন যেন ঘরের ভেতরটা রাতের মতোই অন্ধকার ও শান্ত থাকে।

কফি পানের সময় ঠিক করুন: রাত জাগার জন্য ঘন ঘন কফি বা এনার্জি ড্রিংকস খাওয়া বন্ধ করুন। কাজ শেষ করার অন্তত ৪ ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করুন, যাতে পরে সহজে ঘুম আসে।

খাবারে নিয়ন্ত্রণ: রাতের বেলা ভারী বা চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। ফল, বাদাম বা হালকা ও পুষ্টিকর খাবার খান।

স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ: ঘুমানোর অন্তত আধা ঘণ্টা আগে ল্যাপটপ বা মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকানো বন্ধ করুন। স্ক্রিনের নীল আলো ঘুমের হরমোন ‘মেলাটোনিন’ উৎপাদনে বাধা দেয়।

সাফল্যের খোঁজে বা ক্যারিয়ারের প্রয়োজনে আমরা অনেক সময়ই ঘুমকে বিসর্জন দিই। কিন্তু মনে রাখা জরুরি, সুস্থ শরীর ছাড়া কোনো সাফল্যই উপভোগ করা সম্ভব নয়। তাই শরীরকে প্রকৃতির নিয়মে চলতে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

আরও পড়ুন