EN ☀️
×

Follow Us

জীবনযাপন

বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে যেতে কত টাকা লাগে?

বরফ, নীরবতা আর অসীম এক আদিম প্রান্তরের এই চিরহিম মহাদেশকে বাংলাদেশ থেকে স্পর্শ করা প্রায় অলৌকিক বলেই মনে হতো

নিলয় কুমার বিশ্বাস

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম

বাংলাদেশ থেকে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানে যেতে কত টাকা লাগে?

ছবি: ডেইলি সান

অ অ

কিছু গন্তব্য মানুষের কল্পনার মানচিত্রে নিজের স্থায়ী আসন গেড়ে নেয় বাস্তবে সেখানে পা রাখার বহুকাল আগেই। আমার অর্জিত ভ্রমণপঞ্জিতে অ্যান্টার্কটিকা ছিল তেমনই এক সুদূর ফ্যান্টাসি। বরফ, নীরবতা আর অসীম এক আদিম প্রান্তরের এই চিরহিম মহাদেশকে বাংলাদেশ থেকে স্পর্শ করা প্রায় অলৌকিক বলেই মনে হতো। 

বছরের পর বছর অ্যান্টার্কটিকার ভৌগোলিক মানচিত্র অধ্যয়ন করা, মেরু অঞ্চলের বন্যপ্রাণীর প্রামাণ্যচিত্র দেখা কিংবা দক্ষিণ মহাসাগর পাড়ি দেওয়া ঐতিহাসিক অভিযাত্রীদের রূপকথা পড়ার পর, বাস্তবে সেই শুভ্র সাম্রাজ্যে গিয়ে দাঁড়ানো কেবল একটা বিমানের টিকিট বুক করার বিষয় ছিল না। এটি ছিল বহু মাসের মানসিক প্রস্তুতি, নিখুঁত কৌশলগত পরিকল্পনা ও অদম্য স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক কঠিন সফর।

এই অভিযানের পিছনে ছিল একটি বৃহত্তর জাতীয় ও পরিবেশগত উদ্দেশ্য। ২০ দিনের এই দীর্ঘ যৌথ অভিযানে আমার সফরসঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশের স্বনামধন্য কনটেন্ট নির্মাতা সালাহউদ্দীন সুমন, যিনি দীর্ঘ দিন ধরে ভ্রমণ, পর্যটন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। 

আমাদের এই যৌথ অভিযাত্রার উদ্দেশ্য কেবল বিশ্বের এই দুর্গমতম প্রান্তটি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা ছিল না; বরং এই বিচ্ছিন্ন মহাদেশের রাজকীয় ভূদৃশ্য, সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবচিত্র এবং বন্যপ্রাণীদের জীবন্ত গল্প ধারণ করে দর্শকদের সামনে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরাও ছিল আমাদের অন্যতম মূল অঙ্গীকার।


অ্যান্টার্কটিকার এই মনস্তাত্ত্বিক ও বৈশ্বিক গুরুত্ব অনুধাবন করার পর, সেই স্বপ্নের যাত্রাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নিখুঁত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ঢাকা থেকে বিগল চ্যানেল পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ আকাশ ও সমুদ্রপথের লজিস্টিক হিসাব মেলানোর মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর দক্ষিণতম প্রান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি নিজের গুণেই একটি পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক অভিযান। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ঢাকা থেকে সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই; ফলে ট্রানজিট মেলানো এবং দীর্ঘ যাত্রাপথের ধকল সামলানোই হয়ে ওঠে যাত্রার প্রথম বড় পরীক্ষা। 

ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথম ধাপে ইস্তাম্বুল, দোহা কিংবা আদ্দিস আবাবার মতো বিশ্বমানের ট্রানজিট হাবগুলোকে ব্যবহার করে পৌঁছাতে হয় আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে। সেখান থেকে পুনর্নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে চড়ে দক্ষিণ দিকে উড়ে গিয়ে নামতে হয় বিশ্বের শেষ প্রান্তের শহর উশুয়াইয়ায়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংযোগ ও অপেক্ষার সময়সূচির ওপর ভিত্তি করে কেবল বুয়েনস আইরেস হয়ে উশুয়াইয়া পৌঁছাতেই ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। 

তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নিয়ম মনে রাখা দরকার—অভিযান জাহাজ ছাড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে উশুয়াইয়ায় পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। দূরপাল্লার কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল হলে জাহাজ মিস করার বড় আশঙ্কা থাকে। মেরু অঞ্চলের এই বিশেষায়িত জাহাজগুলো কোনো একক যাত্রীর জন্য এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না। তাই মূল সমুদ্রযাত্রার অন্তত ১ থেকে ২ দিন আগেই উশুয়াইয়ায় পৌঁছে পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে নিরাপদ বাফার বা অবকাশ রাখা অপরিহার্য।

অ্যান্টার্কটিকা যাত্রায় সঠিক অপারেটর এবং অভিযানের রুট নির্বাচন করা সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। আন্তর্জাতিক অভিযান অপারেটরদের মধ্যে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের 'লিন্ডব্ল্যাড এক্সপেডিশনস' (Lindblad Expeditions) তাদের বিলাসবহুল সেবা ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশনার জন্য খ্যাত। অন্যদিকে 'ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস' (Oceanwide Expeditions)-এর মতো অভিজ্ঞ অপারেটররা রুটের বৈচিত্র্য, জাহাজের সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং খরচের একটি চমৎকার সুষম সমন্বয় অফার করে।

অভিযাত্রীদের সামনে মূলত দুটি রুটের সুযোগ থাকে- সংক্ষিপ্ত অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলা রুট; এটি মূলত স্বল্প সময়ে কেবল অ্যান্টার্কটিকার মূল ভূখণ্ড ও তার সংলগ্ন বরফাবৃত দ্বীপমালা ঘোরার জন্য উপযোগী। আর দ্বিতীয়টি হলো দীর্ঘ ফকল্যান্ড-সাউথ জর্জিয়া-অ্যান্টার্কটিকা রুট; এটি ২০ দিনের একটি পূর্ণাঙ্গ দক্ষিণ মহাসাগরীয় এক্সপেডিশন, যা উশুয়াইয়া থেকে শুরু হয়ে বিগল চ্যানেল পার হয়ে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, সাউথ জর্জিয়া এবং সবশেষে মূল অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ অতিক্রম করে। 

আমরা এই দ্বিতীয় ও দীর্ঘতর রুটটি নির্বাচন করেছিলাম, যা দক্ষিণ মহাসাগরের সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র প্রত্যক্ষ করার অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে দেয়। তবে জাহাজ ও রুট নির্বাচনের এই জটিল হিসাব চূড়ান্ত করতেই সামনে আসে এমন এক বিশাল আর্থিক অঙ্কের সমীকরণ, যা প্রতিটি অভিযাত্রীকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

অ্যান্টার্কটিকা নিঃসন্দেহে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভ্রমণ গন্তব্যগুলোর শীর্ষে অবস্থান করে। এর মূল লজিস্টিক কারণ হলো- চরম প্রতিকূল মেরু সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী বিশেষায়িত বরফ-সহনশীল (Ice-strengthened) জাহাজ পরিচালনা, অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং ভৌগোলিকভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি ও রসদ সরবরাহের বিপুল পরিচালনা ব্যয়। 

একটি সাধারণ অ্যান্টার্কটিক অভিযানের ভিত্তিতে জাহাজ ভাড়া শুরু হয় প্রায় ৮,০০০ মার্কিন ডলার (USD) থেকে। রুট যদি দীর্ঘ হয় কিংবা জাহাজে উন্নত কেবিন বিভাগ নির্বাচন করা হয়, তবে এই খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। তবে শিপিং কোম্পানির বিজ্ঞাপিত এই ভাড়াই চূড়ান্ত ব্যয় নয়। একজন বাংলাদেশি অভিযাত্রীর সামগ্রিক বাজেটে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের চড়া টিকিট, আর্জেন্টিনার ভিসা ফি, উশুয়াইয়ায় প্রাক-অভিযানের হোটেল অবস্থান ও খাবার, বিশেষায়িত থার্মাল পোশাক ও ওয়াটারপ্রুফ গিয়ার কেনাকাটা এবং বাধ্যতামূলক জরুরি ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স যুক্ত করতে হয়। সব মিলিয়ে বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও রুটভেদে একজন বাংলাদেশি পর্যটকের মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা বা তারও বেশি।

কখনো কখনো অবিক্রীত কেবিনের জন্য শেষ মুহূর্তে 'লাস্ট মিনিট ডিল' (Last Minute Deals)-এ বড় ছাড়ের সুযোগ তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য কেবল এই ছাড়ের ওপর ভরসা করে বসে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা থেকে আর্জেন্টিনার ভিসা অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার ফ্লাইটের আসন সুনিশ্চিত করতে যে সময় প্রয়োজন হয়, শেষ মুহূর্তের ছাড়ে সেই সময় পাওয়া যায় না। কম দামে কেবিন পেলেও যদি ভিসা ও ফ্লাইট জটিলতায় সময়মতো উশুয়াইয়া না পৌঁছানো যায়, তবে পুরো বিনিয়োগই পণ্ড হয়ে যায়। তাই আগেভাগে পরিকল্পনা করে বাজেট সুনির্দিষ্ট করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।

অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের সাফল্য নিশ্চিত হয় জাহাজে পা রাখার বহু আগেই—অভিযাত্রীর নিখুঁত প্রাক-অভিযানের প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে। আইনি প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে শরীর ও সংবেদনশীল ক্যামেরা যন্ত্রপাতি রক্ষা করার প্রস্তুতিই এই ধাপের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশি অভিযাত্রীদের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক দিক হলো, ঢাকায় আর্জেন্টিনার নিজস্ব দূতাবাস রয়েছে এবং তারা পর্যটন ভিসা প্রদান করে।

প্রথমে দূতাবাসের কনস্যুলার সেকশনে ই-মেইলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা ভ্রমণের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, ফ্লাইট বুকিং এবং অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের বুকিং নিশ্চিতকরণ নথি পাঠাতে হয়। দূতাবাস থেকে সাক্ষাৎকার ও নথিপত্র জমার তারিখ পাওয়ার পর আবেদনকারীকে সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ট্রাভেল বুকিং-সহ সশরীরে উপস্থিত হয়ে আবেদন জমা দিতে হয়। কোনো থার্ড-পার্টি এজেন্সি আবেদনকারীর হয়ে ভিসা জমা দিতে পারে না; এজেন্সিগুলো বড়জোর নথিপত্র গোছাতে পরামর্শ দিতে পারে। তাই অভিযানের শিপিং সিট বুকিং নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গেই বিলম্ব না করে ভিসা প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত।

মেরু অঞ্চলের চরম আবহাওয়ায় সাধারণ শহরের শীতের পোশাক সম্পূর্ণ অকার্যকর। সেখানে ৩-স্তরবিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক পোশাক পদ্ধতি (Layering System) অনুসরণ করতে হয়। শরীরের ভেতরের আর্দ্রতা দূর করে তাপমাত্রা ধরে রাখার জন্য মেরিনো উল বা সিন্থেটিক থার্মাল কাপড় ব্যবহার করতে হয়। বডি হিট ধরে রাখার জন্য ফ্লিস বা ডাউন জ্যাকেট এবং জোডিয়াক বোটে চড়ে দ্বীপে নামার সময় লোনা পানির তীব্র ছিটা, বরফপাত ও হিমেল বাতাস আটকানোর বিশেষ জ্যাকেট ও প্যান্ট দরকার পড়ে।

এখানে অপারেটরদের নীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈচিত্র্য খেয়াল রাখা দরকার। কোনো কোনো এক্সপেডিশন অপারেটর যাত্রীদের বিশেষ মেরু পারকা জ্যাকেট বা ওয়াটারপ্রুফ বুট বিনামূল্যে ব্যবহার করতে দেয়, আবার অনেক অপারেটর যাত্রীদের নিজেদের সরঞ্জাম কিনে আনার পরামর্শ দেয়। তাই গিয়ার কেনার আগেই নিজ অপারেটরের সরবরাহকৃত সরঞ্জাম তালিকা (Gear Checklist) ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া আবশ্যক।

হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চার্জ কয়েক মিনিটের মধ্যে নিষ্কাশিত হয়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানের কৌশল হলো অতিরিক্ত ব্যাটারি সবসময় শরীরের কাছাকাছি, ভেতরের থার্মাল স্তরের পকেটে বডি-হিটে উষ্ণ রাখা। এছাড়া সমুদ্রের লোনা পানির তীব্র ছিটা থেকে দামি ক্যামেরা ও লেন্স বাঁচাতে বিশেষ ওয়াটারপ্রুফ কভার এবং সিলিকা জেলের ব্যবহার অপরিহার্য।

এই যাত্রার জন্য কোনো অলৌকিক অ্যাথলেটিক ফিটনেসের প্রয়োজন নেই। তবে অসমান পাথুরে বা বরফাবৃত পিচ্ছিল ভূখণ্ডে ভারসাম্য রেখে হাঁটা, উত্তাল সাগরে জোডিয়াক বোট থেকে নিরাপদে দ্বীপে ওঠানামা করা এবং তীব্র বাতাস ও ঠান্ডার মধ্যেও টানা কয়েক ঘণ্টা বাইরে অবস্থান করার মতো স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

ফকল্যান্ড ও সাউথ জর্জিয়া মূল বরফের মহাদেশে পৌঁছানোর আগে দীর্ঘ রুটে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ ও সাউথ জর্জিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা পুরো অভিযানের অভিজ্ঞতার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই দ্বীপগুলো দক্ষিণ মহাসাগরের অতি-সংবেদনশীল ও সমৃদ্ধ প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে অভিযাত্রীদের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয়।


উশুয়াইয়া থেকে জাহাজ ছেড়ে বিগল চ্যানেল পার হওয়ার পর প্রথম প্রধান গন্তব্য ফকল্যান্ড। বাতাস-তাড়িত পাহাড়ি ভূদৃশ্য, দুর্গম উপকূলরেখা এবং ধবধবে সাদা বালুর সৈকত দিয়ে পরিবেষ্টিত এই দ্বীপপুঞ্জ যেন সামুদ্রিক পাখিদের এক স্বর্গরাজ্য। আকাশে বিরামহীন চক্কর দেয় বিশাল ডানার ব্ল্যাক-ব্রাউড অ্যালবাট্রস, খাড়া পাথুরে পাহাড়ের গায়ে বসবাস করে চঞ্চল রকহপার পেঙ্গুইন, আর দ্বীপের ঘাসযুক্ত ভূদৃশ্যে ঘুরে বেড়ায় কারাকারা পাখি। সৈকতে অলস শুয়ে থাকা নানা প্রজাতির সিল এবং উপকূলে তিমির বিশাল লেজের ঝাপটানি ভিডিও বা ছবি ধারণকারীদের জন্য এক অবিশ্বাস্য ক্যানভাস তৈরি করে। অভিযাত্রী ও কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য প্রতিটি ল্যান্ডিং ছিল যাত্রার গল্পের নতুন একটি অধ্যায় ধারণ করার অসামান্য সুযোগ।

ফকল্যান্ড পার হয়ে সমুদ্রের আরও গভীরে এগিয়ে গেলে ভেসে ওঠে সাউথ জর্জিয়া। এর রূপ ও বিপুল প্রাণপ্রাচুর্যের কারণেই একে বলা হয় ‘দক্ষিণ মহাসাগরের সেরেঙ্গেটি’। দুর্গম এই দ্বীপে পা রাখামাত্রই চোখের সামনে উন্মোচিত হয় পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বন্যপ্রাণী সমাবেশ।

সমুদ্রসৈকত ও উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রাজকীয় কিং পেঙ্গুইনের (King Penguin) বিশালাকার কলোনি কখনো কখনো লাখের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়— যা দিগন্ত পর্যন্ত কেবল সোনালী-হলুদ বুক আর কালো ডানার এক মহাসমুদ্র তৈরি করে। উপকূল জুড়ে কিলবিল করে দানবাকৃতির এলিফ্যান্ট সিল (Elephant Seal), আর মাথার ওপর হিমবাহের গা ঘেঁষে চক্কর দেয় অজস্র সামুদ্রিক পাখি।

একজন আলোকচিত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে সাউথ জর্জিয়া হলো পরিবর্তিত আলো ও বন্যপ্রাণীর জটিল গতিবিদ্যা ফ্রেমবন্দি করার সেরা ক্ষেত্র। আর একজন সাধারণ পর্যটকের কাছে এটি এনে দেয় গভীর আত্মউপলব্ধি— মানুষ এই আদিম প্রকৃতিতে কোনো শাসক নয়, কেবলই এক নিভৃত ও বিনম্র দর্শক মাত্র। সাউথ জর্জিয়ার বিচিত্র ও বিপুল প্রাণস্রোতের মোহ কাটতে না কাটতেই জাহাজ এগিয়ে চলে দক্ষিণ মহাসাগরের আরও গভীরে—সেই কাঙ্ক্ষিত সাদা মহাদেশের দিকে।

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে কখনো ঘন কুয়াশা আর মেঘের পর্দা সরিয়ে দূর দিগন্তে প্রথমে শান্ত হয়ে ভেসে ওঠে এক বিশালাকার নীলচে আইসবার্গ; তারপর ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় বরফে ঢাকা পর্বতমালা এবং আদিগন্ত প্রসারিত সাদা-নীলের এক নীরব সাম্রাজ্য। উপসাগরের কোল ঘেঁষে নেমে আসা বিশাল হিমবাহ, তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ এবং বরফের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসা প্রাগৈতিহাসিক নীল আলো এক অবাস্তব দৃশ্যপট তৈরি করে।

যা একজন মানুষকে সবচেয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করে, তা হলো অ্যান্টার্কটিকার অতিজাগতিক 'নীরবতা'। নগরজীবনের সমস্ত যান্ত্রিক কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই জগতে কেবল বাতাসের মাতম, বরফ ভাঙার গুরুগম্ভীর গর্জন আর পেঙ্গুইনদের হাঁকডাক শব্দতরঙ্গ তৈরি করে। অ্যান্টার্কটিক পেনিনসুলা জুড়ে অবাধ বিচরণ জেন্টু, অ্যাডেলি ও চিনস্ট্র্যাপ পেঙ্গুইনের। ভাসমান বরফের চাঁইয়ে রোদের ওম নেয় চিতা সিল (Leopard Seal), আর শান্ত পানির বুক চিরে রাজকীয় ভঙ্গিমায় ভেসে ওঠে হামব্যাক তিমি ও অরকা।

সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে সাথে পর্বতের ওপর আলোর খেলা বদলাতে থাকে, যার ফলে আইসবার্গগুলোর রং প্রতিনিয়ত রূপ নেয় প্রস্ফুটিত নীল থেকে গভীর ফিরোজায়। বাতাস যখন সম্পূর্ণ থমকে দাঁড়ায়, তখন আয়নার মতো শান্ত উপসাগরের বুকে চারপাশের আকাশ ও বরফ পাহাড়ের অবিকল প্রতিফলন তৈরি হয়— যা পৃথিবীকে রূপান্তর করে এক বিশাল প্রাকৃতিক আয়নায়।

তবে এই অভিযাত্রার সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্তগুলো ক্যামেরা বা লেন্সে ধরা পড়ে না। জাহাজের ঠিক কয়েক ফুট দূরে বিশাল এক তিমির গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা, হাজার হাজার পেঙ্গুইনের কলোনির মাঝে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, কিংবা শান্ত উপসাগরের বুক চিরে শতবর্ষী এক আইসবার্গকে নীরবে ভেসে যেতে দেখার অনুভূতি কেবল হৃদয়েই ধারণ করা যায়।

এই মহাকাব্যিক অভিযানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং একই সাথে ভীতিপ্রদ অংশ হলো ড্রেক প্যাসেজ অতিক্রম করা। দক্ষিণ মহাসাগরের এই জলভাগ কখনো বিস্ময়করভাবে শান্ত ('Drake Lake'), আবার কখনো ভয়ংকর উত্তাল ('Drake Shake') রূপ ধারণ করে। বিশালাকার তরঙ্গ এবং জাহাজের তীব্র দুলুনি যাত্রীদের মারাত্মক 'সি-সিকনেস' বা সমুদ্রযাত্রাজনিত অসুস্থতায় ফেলতে পারে, যার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি ও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ রাখা জরুরি।

তবে ড্রেক প্যাসেজ অভিযাত্রীকে এক চিরন্তন পরম সত্য শিক্ষা দেয়—মেরু অঞ্চলে মানুষ নয়, চরম ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কেবল প্রকৃতি। তীব্র বাতাস, ঘন কুয়াশা বা সমুদ্রে বরফের ঘনত্বের কারণে পূর্বনির্ধারিত দ্বীপে ল্যান্ডিং তাৎক্ষণিক বাতিল হতে পারে কিংবা সম্পূর্ণ রুটের গতিপথ বদলে যেতে পারে। প্রকৃতি কখন কী রূপ ধারণ করবে, তার কোনো ভবিষ্যদ্বাণী এখানে চলে না। নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় জাহাজের এক্সপেডিশন লিডাররা মুহূর্তের মধ্যে যে সিদ্ধান্ত নেন, তাকে মাথা পেতে নেওয়াই একজন সত্যিকারের অভিযাত্রীর আসল মানসিকতা।

অ্যান্টার্কটিকায় ভ্রমণের নির্ধারিত মৌসুম মূলত দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল—অর্থাৎ অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে মার্চ মাস পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়ের মধ্যে প্রতিটি মাসেই ভূদৃশ্য ও বন্যপ্রাণীর আচরণের ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। শীতের আমেজ থেকে সদ্য জাগ্রত হওয়া নির্মল ও অক্ষত বরফের ভূদৃশ্য, বিশালাকার সামুদ্রিক বরফের চাঁই এবং দীর্ঘ শীতের ঘুম ভাঙিয়ে প্রজননস্থলে পেঙ্গুইনদের প্রাথমিক প্রত্যাবর্তনের রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখার সেরা সময় হলো নভেম্বর মাস। চব্বিশ ঘণ্টার দীর্ঘতম দিনের আলো, সামুদ্রিক বরফ গলতে শুরু করার মনোরম দৃশ্য এবং কলোনিগুলোতে ডিম ফুটে প্রথম পেঙ্গুইন ছানাদের জন্ম নেওয়ার প্রারম্ভিক সময় হলো ডিসেম্বর।

প্রথমবার ভ্রমণকারীদের জন্য জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসই সবচেয়ে আদর্শ সময়। আবহাওয়া তুলনামূলক অনুকূল ও সহনশীল থাকে, পেঙ্গুইন ছানারা চরম সক্রিয় ও চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং ছবি ও ভিডিওগ্রাফারদের জন্য সেরা দৃশ্যপট তৈরি হয় (আমাদের ২০ দিনের মূল অভিযানটি জানুয়ারির শেষ থেকে শুরু হয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছিল)।

মার্চ মাস হলো তিমি দর্শনের পিক-সিজন। সমুদ্রে ক্রিল ও পুষ্টির প্রাচুর্যের কারণে এই সময়ে সাগরে রেকর্ড সংখ্যক তিমি (Humpback, Orca, Minke Whale) দেখা যায়। একই সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা পেঙ্গুইন ছানারা কলোনি ছেড়ে প্রথমবারের মতো সমুদ্রে নামার প্রস্তুতি নেয়। উপযুক্ত মৌসুম ও সময় নির্বাচন করে যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করার পর এই বিপুল ব্যয় ও লজিস্টিক সংগ্রামের চূড়ান্ত সার্থকতা মূল্যায়ন করা জরুরি।

১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকার বিপুল অঙ্ক ব্যয় করা, কাজের সূচি থেকে এক মাসের বিরতি নেওয়া এবং একাধিক মহাদেশ পার হওয়ার জটিল লজিস্টিক চাপ সামলানোর পর একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়—অ্যান্টার্কটিকা অভিযান কি সত্যিই অর্থবহ ও সার্থক? এর উত্তর রয়েছে এই সফরের গভীর আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতায়।

অ্যান্টার্কটিকা কোনো সাধারণ বিনোদনমূলক রিসোর্ট বা গতানুগতিক ট্যুরিস্ট গন্তব্য নয়। এর চরম দুর্গমতা, কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং আধুনিক জীবনের কৃত্রিমতা থেকে শতভাগ বিচ্ছিন্নতাই একে অমূল্য করে তুলেছে। যখন পকেটের স্মার্টফোন নিস্তেজ হয়ে পড়ে, ডিজিটাল নোটিফিকেশনের কোলাহল থেমে যায় এবং চারপাশের পিচঢালা নগরের ব্যস্ততা হারিয়ে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকে শুধুই আদিম নীল বরফ, গর্জনরত বাতাস আর হাজার হাজার স্বাধীন বন্যপ্রাণী—তখন জীবনের প্রতি মানুষের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আন্তর্জাতিক অভিযানের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের চরম হুমকিতে থাকা একটি উপকূলীয় দেশের নাগরিক হিসেবে, মেরু অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনের চিত্র দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া একটি জাতীয় ও বিশ্বজনীন দায়িত্ব। সালাহউদ্দীন সুমনের সুনিপুণ দৃশ্যধারণ এবং এই বিবরণীর মূল উদ্দেশ্য কেবল একটি ব্যক্তিগত ভ্রমণকাহিনী তৈরি করা ছিল না; বরং ছিল সাধারণ মানুষের দূরবর্তী কল্পনার সেই অচেনা বরফের মহাদেশকে তাদের ভাবনার মানচিত্রে আরও খানিকটা কাছাকাছি নিয়ে আসা।

ভবিষ্যতের যেকোনো বাংলাদেশি অভিযাত্রীর জন্য আমার চূড়ান্ত বার্তা হলো—প্রস্তুতি শুরু করুন অনেক আগে থেকে। বিস্তারিত লজিস্টিক গবেষণা, সঠিক অপারেটর ও রুট নির্বাচন, উশুয়াইয়ায় যথেষ্ট বাফার সময় রেখে ফ্লাইট বুকিং, সময়মতো ভিসা প্রসেসিং, আন্তর্জাতিক মানের সঠিক গিয়ার সংগ্রহ এবং সর্বোপরি বৈরী প্রকৃতির সামনে নিজের মানবিক অহংকার বিসর্জন দেওয়ার মানসিকতাই একটি সফল অভিযানের মূল চালিকাশক্তি।

যেদিন দূরবর্তী এক অলৌকিক স্বপ্ন আপনার সামনে একটি সুস্পষ্ট লজিস্টিক পরিকল্পনায় রূপ নেয়—মূলত সেদিনই পৃথিবীর শেষ প্রান্তে আপনার পদচিহ্ন আঁকার আসল যাত্রাপথ শুরু হয়ে যায়।

নিলয় কুমার বিশ্বাস

বাংলাদেশি অভিযাত্রী ও ভ্রমণ লেখক

আরও পড়ুন