৩০ সেকেন্ডের যে অভ্যাসে মন ভালো হয়
হাসি, শ্বাস-প্রশ্বাস আর হালকা স্ট্রেচের মতো ছোট ছোট অভ্যাসেই কমতে পারে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ
জীবনযাপন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মন খারাপ বা মানসিক চাপ কমাতে সবসময় ঘণ্টাখানেক সময় দেওয়ার দরকার নেই। গবেষকরা বলছেন, দিনে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের কিছু ছোট অভ্যাসেই মন ভালো হতে পারে, বেড়ে যেতে পারে কাজের শক্তিও। এসব ছোট অভ্যাসকে বলা হয় ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’। ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বইয়ের লেখক এলি সাসম্যান বলেন, এর কিছু অভ্যাস মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই করা যায়।
লাফটার ইয়োগা
লাফটার ইয়োগায় কোনো কৌতুক বা মজার কিছু ছাড়াই ইচ্ছা করে হাসতে হয়। প্রথমে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিতে হয়, এরপর কৃত্রিমভাবে হাসতে শুরু করতে হয়। নেদারল্যান্ডসের ডেলফট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক ন্যাটালি ভ্যান ডার ওয়াল বলেন, কিছুক্ষণ পর এই কৃত্রিম হাসিই অনেক সময় সত্যিকারের হাসিতে বদলে যায়।
শুরুতে কৃত্রিম হাসি একটু অস্বস্তিকর লাগতে পারে। কিন্তু হাসি শেষ হওয়ার পর মন অনেক বেশি প্রফুল্ল লাগে। ভ্যান ডার ওয়ালের একটি বড় মেটা-অ্যানালাইসিসে (একাধিক গবেষণার ফলাফল একত্র করে করা গবেষণা) দেখা গেছে, কৌতুক ছাড়া হাসি বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে কৌতুকযুক্ত হাসির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ কার্যকর।
মাইক্রো ইয়োগা
একা হাসতে না পারলে একটু শরীর টানটান করে বা স্ট্রেচ করে দেখা যায়, একেই সাসম্যান বলেন ‘মাইক্রো ইয়োগা’। যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকেন, তাদের জন্য এই ব্যায়াম বিশেষভাবে কাজে দেয়। এতে দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব কমে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৫ মিনিট পরপর মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড শরীর স্ট্রেচ করলে কাজের দক্ষতা প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অন্য গবেষণা বলছে, স্ট্রেচের সঙ্গে গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস ও পূর্ণ মনোযোগ যোগ হলে মানসিক চাপ কমাতে তা আরও বেশি কাজে দেয়। এমন স্ট্রেচিং বিরতি কাজের ক্লান্তি ও চিকিৎসকদের ভুলের হারও কমায় বলে দেখা গেছে।
পদ্ধতি: পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুল একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে ধরুন। শ্বাস নেওয়ার সময় হাত দুটি নিচের দিকে টানুন এবং বুক আলতো করে উপরে তুলুন। শ্বাস ছাড়ার সময় শরীর শিথিল করুন। এভাবে দুই থেকে তিনটি ধীর শ্বাস নিন।
নতুন কোনো ব্যায়াম শুরু করার আগে সন্দেহ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। যেকোনো স্ট্রেচেই কিছুটা শারীরিক ঝুঁকি থাকতে পারে।
ধীরগতির শ্বাস-প্রশ্বাস
মানসিক চাপ বা উদ্বেগ কমাতে ধীরে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে, এমন প্রমাণ অনেক গবেষণায় পাওয়া গেছে। দীর্ঘ ও ধীর শ্বাস নিলে শরীরের ‘লড়ো নয়তো পালাও’ প্রতিক্রিয়া কমে যায়, কারণ তখন শরীরের ‘বিশ্রাম ও হজম’-সংক্রান্ত স্নায়ুতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ কারণে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে কার্যকর।
ইতালির নেপলস ফেদেরিকো টু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অমিত কুমারের নেতৃত্বে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র তিনটি ধীর ও গভীর শ্বাস নিলে মস্তিষ্কের ‘আলফা তরঙ্গ’ বেড়ে যায়, যা মনকে শান্ত ও মনোযোগী করে। একই সঙ্গে বাড়ে ‘থিটা তরঙ্গ’, যা গভীর প্রশান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
অমিত কুমার বলেন, বড় কোনো মিটিংয়ের আগে বা মন খুব অস্থির হয়ে উঠলে যে কোনো সময় এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। সারা দিন নিয়মিত এটি করলে মানসিক চাপ জমতে পারে না। যারা বেশি চাপে থাকেন, তারা ৩০ সেকেন্ডের চেয়ে একটু বেশি সময় নিয়েও এই অভ্যাস করতে পারেন।
পদ্ধতি: আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসে চোখ বন্ধ করুন। প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনটি ধীর ও গভীর শ্বাস নিন, যেখানে শ্বাস ছাড়ার সময়টা শ্বাস নেওয়ার চেয়ে একটু দীর্ঘ হবে। বাতাস ফুসফুসে ঢোকা ও বেরিয়ে যাওয়ার অনুভূতিতে মনোযোগ দিন। দিনে যতবার ইচ্ছা এটি করা যায়।
নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল স্পর্শ
স্পর্শ যে উপকারী, তা অনেক আগে থেকেই জানা। এলি সাসম্যান ও তার সহকর্মীদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২০ সেকেন্ডের একটি সহজ ‘নিজেকে শান্ত করার স্পর্শ’ অনুশীলনেও দীর্ঘস্থায়ী উপকার পাওয়া যায়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের প্রতি সদয় চিন্তা করার পাশাপাশি হাত বুক ও পেটের ওপর রাখলে তাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
সাসম্যান বলেন, নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার গুরুত্ব সমাজে অবমূল্যায়িত। এই সপ্তাহে প্রকাশিত এক ফলো-আপ গবেষণায় তিনি দেখেছেন, এই অভ্যাস বেশি করলে ছয় মাস পর নিজের প্রতি সহানুভূতির অনুভূতি আরও বাড়ে।
পদ্ধতি: এক বা দুই হাত বুকের ওপর বা বাহুর ওপরের অংশে রাখুন। গভীর শ্বাস নিন এবং নিজের প্রতি সদয় চিন্তা করার সময় হাতের উষ্ণতা ও হালকা চাপ অনুভব করুন।
সচেতন জীবনযাপন
সব অভ্যাস একসঙ্গে করার দরকার নেই। নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই একটি উপায় বেছে নিলেই যথেষ্ট। ভ্যান ডার ওয়াল বলেন, বিভিন্ন পদ্ধতি পরখ করে দেখে যেটা নিজের জন্য কাজ করে সেটাই বেছে নেওয়া উচিত, কারণ প্রয়োজনীয় মাত্রা একেকজনের জন্য একেক রকম।
হাঁটার সময় বা থালাবাসন ধোয়ার সময় গভীর শ্বাস নিলেও দৈনন্দিন জীবনে সচেতনতার ছোট বিরতি যোগ করা যায়। এতে মানসিক চাপ কমে এবং সার্বিক সুস্থতা বাড়ে।
ইমন/ডেইলি সান