অফিসে ছুটি নিতে ভয়, প্রেজেন্টিইজমে ভুগছেন না তো?
স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম
শরীর খারাপ থাকা সত্ত্বেও প্রেজেন্টিইজম বা কাজের তাগিদ থেকে কর্মস্থলে উপস্থিত হচ্ছেন অনেক কর্মী। ছবি: সংগৃহীত
সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীর ভালো না লাগলেও অনেকে ছুটি না নিয়ে অফিসে যান। গবেষণায় একে বলা হয় ‘প্রেজেন্টিইজম’—অর্থাৎ অসুস্থ শরীরেও কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার প্রবণতা। যুক্তরাজ্যে এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক মানুষ অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও কাজ করেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
তরুণ প্রজন্মকে প্রায়ই ‘স্নোফ্লেক’ বা সহজেই ভেঙে পড়া দুর্বল মানুষ বলে আখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু এটি সত্যি নয় বলে মন্তব্য করেছেন ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্যার ক্যারি কুপার। তিনি কর্মক্ষেত্রের সুস্থতা বিষয়ক বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিশেষজ্ঞ এবং কর্মসংস্থান নীতি নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের পরামর্শদাতা।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যও তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন করে। গত বছর ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীরা গড়ে ৬.২ দিন অসুস্থতার ছুটি নিয়েছিলেন। সেখানে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ কর্মীরা ছুটি নিয়েছেন গড়ে মাত্র ২.৪ দিন।
চাকরির অনিশ্চয়তাই বড় কারণ
স্যার ক্যারি কুপার এর পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তরুণ কর্মীরা প্রায়ই এমন চাকরিতে থাকেন যেখানে স্থায়িত্ব বা নিরাপত্তা কম। যেমন ‘জিরো-আওয়ার্স কন্ট্রাক্ট’, অর্থাৎ কাজের সময়ের কোনো গ্যারান্টি নেই এমন চুক্তি। এ ছাড়া তরুণদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যা বা জয়েন্টের সমস্যা থাকার সম্ভাবনাও কম থাকে, যা সাধারণত অসুস্থতার ছুটির বড় কারণ হয়।
স্যার ক্যারি আরও বলেন, তরুণ প্রজন্ম নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে ভালো আচরণ ও যত্ন বেশি প্রত্যাশা করে। পুরোনো প্রজন্ম হয়তো অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে, তবে তার মানে এই নয় যে সেই পদ্ধতি স্বাস্থ্যকর ছিল। তরুণ কর্মীরা মানসিক সুস্থতাকে জোর করে চেপে রাখার বিষয় না ভেবে, নিজের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে দেখতে বেশি আগ্রহী।
কাজই যখন পরিচয়ের ভিত্তি
অসুস্থতার ছুটি নেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে বিভিন্ন বিষয় কাজ করে। অনেকের কাছে কাজ তাঁদের পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পেশাগত মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ওয়ার্ক সেন্ট্রালিটি’, অর্থাৎ জীবনের কেন্দ্রে কাজকে রাখা। গবেষণা দেখায়, এর সঙ্গে কাজের প্রতি গভীর মনোযোগ, প্রতিশ্রুতি এবং অতিরিক্ত খাটার মানসিকতার সম্পর্ক আছে। কাজই যদি কারও পরিচয়ের মূল ভিত্তি হয়, তবে অনুপস্থিত থাকা মানে সাময়িকভাবে নিজের একটি অংশ হারিয়ে ফেলার মতো মনে হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রের সুস্থতা নিয়ে লেখক ও মনোবিজ্ঞানী ড. অড্রে ট্যাং বলেন, এই ধরনের মানুষেরা যেকোনো মূল্যে কাজে হাজির থাকার তীব্র তাগিদ অনুভব করেন। চিকিৎসা, নার্সিং ও শিক্ষকতার মতো সেবামূলক পেশায় যুক্ত মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তাঁরা প্রায়ই বলেন, এমনি এমনি ছুটি নেওয়ার চেয়ে বরং কোনো শারীরিক দুর্ঘটনা ঘটুক, যাতে কাজে না যাওয়ার একটা উপযুক্ত কারণ পাওয়া যায়।
দুর্বল ভাবার ভয়
অনেকে আবার দুর্বল বা অলস হিসেবে গণ্য হওয়ার ভয়ে থাকেন। ট্যাং বলেন, তরুণ কর্মীরা এই ভয়ের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, কারণ তাঁরা ক্যারিয়ারের শুরুতে থাকেন এবং কোনো নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে চান না।
কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতিই বড় প্রভাবক
ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী ড. ট্যারা কুইন সিরিলোর মতে, কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি ও আচরণ মানুষের অসুস্থতার ছুটি নেওয়ার সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে। টিমে কর্মীর অভাব এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে, কর্মীরা জানেন তাঁদের অনুপস্থিতি সহকর্মীদের কাজের চাপ বাড়াবে। যেসব সংস্থায় স্বাস্থ্যের চেয়ে উৎপাদনশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে অপরাধবোধ ও লোকলজ্জার প্রভাব থাকে ব্যাপক।
কুইন সিরিলো বলেন, কিছু কর্মক্ষেত্রে যেকোনো অবস্থাতেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থাকে, যা ‘প্রেজেন্টিইজম’কে পুরস্কৃত করে। ব্যবস্থাপকরা অসুস্থতার মধ্যেও কাজ করার জন্য প্রশংসা করলে কর্মীরাও দ্রুত সেই মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, একটি স্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশে অসুস্থতার ছুটি নিয়ে খোলামেলা ও সৎভাবে কথা বলার সুযোগ থাকা উচিত এবং সহকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস থাকা জরুরি। ছুটি নেওয়াকে বারবার সন্দেহ বা নেতিবাচকভাবে দেখা হলে কর্মীরা ন্যায্য ছুটি নিতেও দ্বিধা করেন—এটিকে কর্মক্ষেত্রের ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বলে চিহ্নিত করেন কুইন সিরিলো।
কখন বুঝবেন কাজের জন্য বেশি অসুস্থ
সব সময় বোঝা সহজ নয় যে আপনি কাজের জন্য বেশি অসুস্থ কি না। ড. অড্রে ট্যাং কিছু প্রচলিত নিয়মের কথা বলেন—বমি ও ডায়রিয়া হলে লক্ষণ চলে যাওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টা এবং জ্বর হলে ২৪ ঘণ্টা বাড়িতে থাকা উচিত, কারণ এই সময়ে কার্যকরভাবে কাজ করা সম্ভব নয়।
আরেকটি সতর্কসংকেত হলো, কাজ যখন নিজের যত্নের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। নিজের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা বদলে যাচ্ছে কি না, কাজের চাপ থেকে মুক্ত হওয়া যাচ্ছে কি না, ঘুম ঠিকঠাক হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ‘না’ হলে বুঝতে হবে বিশ্রামই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
মানসিক স্বাস্থ্যকে শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কাজ করার ক্ষমতা না থাকলে তা শারীরিক হোক বা মানসিক—দুই ক্ষেত্রেই তা সমান গুরুত্বপূর্ণ।