EN ☀️
×

Follow Us

জীবনযাপন

যে কারণে ফলমূল-শাকসবজির পুষ্টিগুণ কমে যাচ্ছে

গত ৭০ বছরে ফলমূল, শাকসবজি ও শস্যে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও ভিটামিন সি-এর পরিমাণ কমেছে বলে দেখা গেছে গবেষণায়

জীবনযাপন ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

যে কারণে ফলমূল-শাকসবজির পুষ্টিগুণ কমে যাচ্ছে

গত ৭০ বছরে ফলমূল ও শাকসবজিতে পুষ্টির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমেছে বলে দেখা গেছে গবেষণায়।

অ অ

দোকানে সাজানো উজ্জ্বল রঙের ফলমূল ও শাকসবজি দেখে বোঝার উপায় নেই যে গত ৭০ বছরে এসব ফসলে পুষ্টির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমে গেছে। একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক দশক আগের তুলনায় বর্তমানে উৎপাদিত ফল, শাকসবজি ও শস্যে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, রিবোফ্লাভিন এবং ভিটামিন সি-এর পরিমাণ অনেক কম।

‘ফুডস’ সাময়িকীর ২০২৪ সালের একটি পর্যালোচনায় এই পুষ্টি হ্রাসকে উদ্বেগজনক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় গবেষকদের পরামর্শে দিন দিন বেশি মানুষ উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসে ঝুঁকছেন।

সিয়াটলের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওমরফোলজির অধ্যাপক ডেভিড আর. মন্তগোমারি বলেন, পুষ্টির এই হ্রাস আমাদের শরীরকে দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে সক্ষম উপাদান থেকে বঞ্চিত করবে, যা খাবারের প্রতিরোধমূলক ভূমিকাকে দুর্বল করে দেবে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টি এবি বলেন, এমনকি যাঁরা প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলেন এবং তাজা শাকসবজি-ফল বেশি খান, তাঁদের জন্যও এর অর্থ দাঁড়ায়—আমাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিরা যা খেতেন, তা আজকের খাবারের চেয়ে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর ছিল।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই সমস্যার মূলে রয়েছে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, যা ফলন বাড়ালেও মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট করছে। সেচ, সার প্রয়োগ ও ফসল তোলার পদ্ধতি উদ্ভিদ ও মাটির ছত্রাকের মধ্যকার প্রয়োজনীয় মিথস্ক্রিয়া ব্যাহত করছে, ফলে মাটি থেকে পুষ্টি শোষণের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও বাড়তে থাকা কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রাও ফসলের পুষ্টি উপাদান আরও কমিয়ে দিচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্য শুনে ফলমূল, শাকসবজি ও শস্য খাওয়া কমানো উচিত হবে না। বরং তাঁরা আশা করছেন, এই গবেষণা মানুষকে খাবার কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে সে বিষয়ে সচেতন করবে। মন্তগোমারি বলেন, আমরা কী খাচ্ছি তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কীভাবে উৎপাদিত হচ্ছে তাও গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাদযোগ্য জমি হারানোর সুযোগ নেই, তাই মাটির ক্ষতি ঠেকানো ও তার উর্বরতা ফিরিয়ে আনার কাজ এখনই করতে হবে।

২০০৪ সালের গবেষণায় যা মিলেছে

পুষ্টি হ্রাস নিয়ে সবচেয়ে বড় গবেষণাগুলোর একটি প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ‘জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব নিউট্রিশন’-এ। অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১৯৫০ ও ১৯৯৯ সালের ইউএসডিএ তথ্য ব্যবহার করে ৪৩টি ফসলে ১৩টি পুষ্টি উপাদানের পরিবর্তন পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা কমেছে, যা হাড় ও দাঁতের গঠন এবং স্নায়ুর কার্যকারিতার জন্য জরুরি। রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ আয়রন, ফ্যাট বিপাকে ভূমিকা রাখা রিবোফ্লেভিন এবং রোগ প্রতিরোধে জরুরি ভিটামিন সি-ও কমেছে।

এই হ্রাসের হার ছিল প্রোটিনে ৬ শতাংশ থেকে রিবোফ্লেভিনে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত। ব্রকলি, কেইল ও সরিষা শাকে ক্যালসিয়াম সবচেয়ে বেশি কমেছে, আর বিট শাক, শসা ও শালগম শাকে আয়রন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। অ্যাসপারাগাস, ওলকপি শাক, সরিষা শাক ও শালগম শাক থেকে ভিটামিন সি-ও অনেকটা কমে গেছে।

পরবর্তী গবেষণাগুলোও একই প্রবণতা দেখিয়েছে। ‘ফুডস’ সাময়িকীর ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় উৎপাদিত মিষ্টি ভুট্টা, লাল আলু, ফুলকপি, বরবটি, সবুজ মটরশুঁটি ও ছোলায় আয়রনের মাত্রা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে, তবে হাস অ্যাভোকাডো, মাশরুম ও সিলভারবিটে তা বেড়েছে। দানাদার শস্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে—‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীর ২০২০ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে গমে প্রোটিন কমেছে ২৩ শতাংশ, সঙ্গে কমেছে ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, জিংক ও ম্যাগনেসিয়ামও।

মন্তগোমারির মতে, এই পুষ্টি হ্রাস মাংসভোজীদেরও প্রভাবিত করছে, কারণ গরু, শুকর, ছাগল ও ভেড়া এখন কম পুষ্টিসমৃদ্ধ ঘাস ও শস্য খাচ্ছে, যা মাংস ও অন্যান্য প্রাণিজ পণ্যকে আগের চেয়ে কম পুষ্টিকর করে তুলছে।

পুষ্টি হ্রাসের কারণ

এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, আধুনিক কৃষি পদ্ধতি তৈরিই করা হয়েছে ফলন বাড়ানোর জন্য। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত রসায়নবিদ ও ২০০৪ সালের গবেষণার মূল লেখক ডোনাল্ড আর. ডেভিস বলেন, উদ্ভিদকে বড় ও দ্রুত বাড়ানোর কৌশল শেখার কারণে সেগুলো মাটি থেকে পুষ্টি শোষণ বা নিজেদের ভেতর পুষ্টি তৈরির গতি ধরে রাখতে পারছে না।

বেশি ফলনের অর্থ হলো, মাটির নির্দিষ্ট পরিমাণ পুষ্টি এখন অনেক বেশি ফসলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে পুষ্টির ঘনত্ব কমে যাচ্ছে। ডেভিস বলেন, কৃষকেরা ফসলের ওজনের ভিত্তিতে দাম পান, তাই তাঁরা এমন কিছু করতে উৎসাহিত হন যা পুষ্টির জন্য ভালো নয়।

আরেকটি কারণ, উচ্চফলনশীল ফসলের কারণে মাটির ক্ষতি। গম, ভুট্টা, ধান, সয়াবিন, আলু, কলা, মিষ্টি আলু ও তিসির মতো ফসল নির্দিষ্ট কিছু উপকারী ছত্রাকের সহযোগিতায় মাটি থেকে পুষ্টি ও পানি শোষণের ক্ষমতা বাড়ায়। মন্তগোমারির মতে, এই ছত্রাক উদ্ভিদের শিকড়ের সম্প্রসারিত অংশের মতো কাজ করে। কিন্তু উচ্চফলনশীল চাষাবাদ মাটির পুষ্টি নিঃশেষ করে দেয়, যা মাটির ছত্রাকের সঙ্গে উদ্ভিদের এই উপকারী সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রাও খাবারের পুষ্টিমান কমিয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন