এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড়ের ফর্মুলায় ওআরএস যেভাবে বাঁচাল পাঁচ কোটির বেশি প্রাণ
কলকাতা থেকে মতলব, তারপর সারা বিশ্ব—খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএস উদ্ভাবনের দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে এর সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী দেশ
জীবনযাপন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি—এই সহজ ফর্মুলাতেই বাংলাদেশে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে জীবনরক্ষাকারী ওআরএস।
একটি ওষুধ, যার দাম কয়েক টাকা মাত্র। কোনো একক বিজ্ঞানী বা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং কলকাতা থেকে মতলব, ম্যানিলা থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থীশিবির—কয়েক দশক ধরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গবেষণার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল এই ফর্মুলা।
লবণ, গুড় আর পানির এই সাধারণ মিশ্রণকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বলে অভিহিত করেছিল ল্যানসেট।
আজ বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে, রাস্তার পাশের দোকানে কিংবা রাজধানীর অভিজাত হাসপাতালে সমান জনপ্রিয় খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএস—এই একটিমাত্র আবিষ্কার বিশ্বজুড়ে বাঁচিয়েছে পাঁচ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ।
কীভাবে এই সহজ ফর্মুলা হয়ে উঠল জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্যে?
এই যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে। তরল খাইয়ে কলেরা রোগীর অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, তা নিয়ে ১৯৫২ সালের দিকে কলকাতায় একটি গবেষণা হয়েছিল। ওই গবেষণার ফলাফল নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট-এর ১৯৫৩ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হেমেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি।
প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে কলেরায় আক্রান্ত কিছু রোগীর বমি বন্ধ ও পানিশূন্যতা দূর করার জন্য অ্যাভোমিন ট্যাবলেটের সঙ্গে পাথরকুচি পাতার রস খাওয়ানো হয়েছিল, যাতে ফলও পাওয়া গিয়েছিল।
গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে বা তারও কিছু আগে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কলেরা নিয়ন্ত্রণে কিছু গবেষণা হয়েছিল, যার প্রায় প্রতিটিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল। বাংলাদেশে এই গবেষণা করেছিল পাক-সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি, যা বর্তমানে আইসিডিডিআরবি নামে পরিচিত।
মতলবের মাঠপর্যায়ের গবেষণা
মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় আইসিডিডিআরবির চাঁদপুরের মতলব ও ঢাকা হাসপাতালে। এই পর্যায়ের গবেষণায় মূল গবেষক ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড ক্যাস। তাঁদের সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম ও মজিদ মোল্লা। অনেকে এই বিজ্ঞানীদের ওআরএসের উদ্ভাবক বলে মনে করেন।
১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে। প্রবন্ধের মূল কথা ছিল, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানোর পর ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, দ্রবণের এই উপাদানগুলো সস্তা ও সহজলভ্য, সংরক্ষণ বা মজুত করা সম্ভব, আর পানি দিয়েই এই দ্রবণ তৈরি করা যায়।
ঢাকা ও কলকাতায় কতটা সমান্তরালভাবে ওআরএস নিয়ে গবেষণা চলেছিল এবং দুই শহরের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল, তার বিবরণ ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টভিউ প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘কলেরা: দ্য আমেরিকান সায়েন্টিফিক এক্সপেরিয়েন্স ১৯৪৭-১৯৮০’ বইয়ে পাওয়া যায়। ওই গ্রন্থে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ওআরএসের ব্যবহার নিয়েও বিশদ বর্ণনা আছে।
সে বছরের জুন নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীশিবিরে কলেরা দেখা দিলে বনগাঁও এলাকার শরণার্থীদের প্রথম ওআরএস খাওয়ানো হয়—এটাই ছিল ওআরএসের প্রথম ব্যাপক ব্যবহার। ভারতে এই কাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিলীপ মহলানবিশ।
তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞানী বা দল খাওয়ার স্যালাইন উদ্ভাবন করেনি। ওআরএসের গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক ধরনের কাজ করেছেন—কিছু ম্যানিলায়, কিছু ঢাকায়, কিছু কলকাতায়। ওআরএসের চূড়ান্ত রূপ এসেছে ১৯৬৭ বা ১৯৬৮ সালের দিকে।
পানি-লবণ-গুড়ের ঘুঁটা
স্বাধীনতার পর দেশে ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ ছিল প্রবল, শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও ছিল এটি। তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি ওআরএসের প্যাকেট পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। ওই পটভূমিতে খাওয়ার স্যালাইনকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, বিশ্বের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনে তা বিরল।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা। ১৯৮০ সালে ডায়রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা ও বাড়িতে স্যালাইন তৈরির প্রকল্প শুরু করে ব্র্যাক। ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি’—এই ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নামে সংস্থাটি।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্র্যাকের কর্মীরা শেখাতেন— প্রথমে ফুটিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে, তারপর আধা সের পানিতে এক চিমটি লবণ ও এক মুঠ গুড় নিয়ে ভালো করে গুলে ডায়রিয়ার রোগীকে খাওয়াতে হবে। ব্র্যাকের লক্ষ্য ছিল প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনকে এই দ্রবণ তৈরি শেখানো, আর এই কাজে ব্র্যাকের পাশে ছিল সরকার।
বেঁচেছে পাঁচ কোটির বেশি প্রাণ
ল্যানসেট-এর ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ওআরএসের উদ্ভাবন চিকিৎসাক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ২৮ বছর পর, ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে টাইম ম্যাগাজিন।
এসব ঘটনা বিশ্বের কাছে ওআরএসের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার উদাহরণ। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ওআরএসের ব্যবহার বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হয় এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনা ও ওআরএস প্রয়োগের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষকেরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়, ওআরএসের মাধ্যমে সেই পানি প্রতিস্থাপন করা হয়। ওআরএস ব্যবহার করে এ পর্যন্ত পাঁচ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে।
বছরে বিক্রি ১৫০ কোটি প্যাকেট
এখন রক্তচাপ কমে গেলেও খাওয়ার স্যালাইন খেয়ে নিচ্ছেন মানুষ। প্রখর রোদে ক্লান্ত-ঘর্মাক্ত রিকশাচালক রাস্তার পাশের দোকান থেকে আধা লিটার পানির বোতল কিনে তাতে এক প্যাকেট স্যালাইন গুলে খেয়ে নিচ্ছেন। বহু মানুষের বাড়িতেই ওরস্যালাইন এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।
কেউ বেড়াতে গেলে বাক্স-পেটরা গোছানোর সময় দেখে নেন স্যালাইনের প্যাকেট নেওয়া হয়েছে কি না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত হাসপাতাল—সবখানেই মেলে ওরস্যালাইন। দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, নিরক্ষর, শিক্ষিত—সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এটি।
বিশ্বের যেসব দেশে ওআরএসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। এই ওষুধ উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীদের বড় ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে ওআরএস পৌঁছানো এবং বাড়িতে তৈরির কৌশল উদ্ভাবনেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে এ দেশের মানুষ। সারা দেশে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ওআরএসের একক আধিপত্য।
এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, ‘সারা বছর এসএমসির প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট ওরস্যালাইন বিক্রি হয়। বাজারের ৯৫ শতাংশ ওরস্যালাইন এসএমসির।’
এসএমসি ছাড়া আরও কয়েকটি কোম্পানির ওআরএস প্যাকেট বাজারে বিক্রি হয়, যারা বছরে প্রায় আট কোটি প্যাকেট বিক্রি করে। এ ছাড়া অনেক মানুষ নিজেই ঘরে পানির সঙ্গে লবণ ও চিনি বা গুড় গুলিয়ে খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো উদ্ভাবন মানুষের জীবনের সঙ্গে এতটা মিশে যাওয়ার উদাহরণ সত্যিই বিরল।
[সৌজন্যে প্রথম আলো]