রিলস দেখার অভ্যাস ডেকে আনতে পারে যেসব মানসিক সমস্যা
জীবনযাপন ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:২০ এএম
অতিরিক্ত রিলস বা শর্ট ভিডিও দেখার অভ্যাসের সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও ঘুমের সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। প্রতীকী ছবি
কাজের ফাঁকে একটু বিনোদন, একঘেয়েমি কাটানো কিংবা ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট রিলস দেখা—শুরুটা সাধারণত এমনই হয়। কিন্তু একটি ভিডিও দেখার পর আরেকটি, তারপর আরও একটি—এভাবে কখন যে আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়, অনেকেই তা বুঝতে পারেন না।
শর্ট ভিডিও বা রিলস দেখা নিজে থেকেই ক্ষতিকর, বিষয়টি এমন নয়। তবে কতক্ষণ, কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে রিলস দেখা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে শর্ট-ফর্ম ভিডিও দেখার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক থাকার প্রমাণ মিলেছে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত ৫৮টি গবেষণা এবং প্রায় ৯৬ হাজার ৭০০ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, সমস্যাজনক মাত্রায় শর্ট-ফর্ম ভিডিও ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, মানসিক চাপ, একাকিত্ব ও একঘেয়েমির মতো সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। তবে গবেষণাগুলোর বেশিরভাগই পর্যবেক্ষণভিত্তিক। তাই রিলস দেখাই সরাসরি এসব মানসিক সমস্যার কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।
কেন রিলস এত সহজে আটকে রাখে?
রিলসের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, একটি ভিডিও শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে চলে আসে আরেকটি। নতুন ভিডিও খুঁজতে আলাদা করে কোনো চেষ্টা করতে হয় না। তার ওপর ব্যবহারকারীর পছন্দ ও আগ্রহ বুঝে অ্যালগরিদম একের পর এক ভিডিও দেখাতে থাকে।
ফলে শুরুতে বিনোদনের জন্য কয়েক মিনিট রিলস দেখতে বসলেও অনেক সময় তা দীর্ঘ সময়ের অভ্যাসে পরিণত হয়। গবেষণাতেও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী কনটেন্টের সুপারিশ, বিনোদন এবং সামাজিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে অতিরিক্ত শর্ট-ফর্ম ভিডিও ব্যবহারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
মন খারাপ হলেই রিলস দেখেন?
মন খারাপ, একাকিত্ব বা মানসিক চাপের সময় অনেকেই রিলস দেখে সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। কয়েকটি মজার ভিডিও হয়তো মুহূর্তের জন্য মনও ভালো করে দিতে পারে।
কিন্তু সমস্যা থেকে দূরে থাকার প্রধান উপায় হিসেবে রিলসের ওপর নির্ভর করতে থাকলে বিষয়টি অন্যদিকে যেতে পারে। ২০২৪ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে শর্ট-ফর্ম ভিডিও ব্যবহারের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মানসিক প্রেরণার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাস্তবতা বা সমস্যা থেকে পালিয়ে থাকার প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কটি ছিল উল্লেখযোগ্য।
সহজভাবে বললে, মন খারাপ হলে রিলস দেখা, এতে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া, আর পরে আবার মন খারাপ হলে রিলসের দিকে ফিরে যাওয়া—এভাবেই ধীরে ধীরে একটি অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
রাত জেগে রিলস দেখছেন?
ঘুমাতে যাওয়ার আগে মোবাইলে কয়েকটি রিলস দেখার অভ্যাস অনেকেরই আছে। কিন্তু ‘আরেকটা ভিডিও দেখে ঘুমাব’ বলতে বলতে কখন যে রাত অনেকটা গড়িয়ে যায়, তা বোঝা কঠিন।
সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে ২০২৪ সালের একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসেও।
ঘুমের সময় কমে গেলে পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর এর প্রভাব পড়তে পারে সারা দিনের কাজ ও মানসিক স্বস্তির ওপর।
রিলস কি একাকিত্ব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে?
রিলসের মাধ্যমে বিনোদন পাওয়া যায়, অন্যদের সঙ্গে ভার্চুয়ালভাবে যুক্ত থাকাও সম্ভব। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সবসময় ইতিবাচক নাও হতে পারে।
২০২৬ সালের ওই মেটা-অ্যানালাইসিসে সমস্যাজনক শর্ট-ফর্ম ভিডিও ব্যবহারের সঙ্গে একাকিত্ব ও একঘেয়েমির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রিলস দেখলেই কেউ একাকী হয়ে যাবেন। বরং যাঁরা আগে থেকেই একাকিত্ব, মানসিক চাপ বা বিরক্তিতে ভুগছেন, তাঁদের মধ্যে অতিরিক্ত রিলস দেখার প্রবণতা থাকতে পারে। কোনটি কারণ আর কোনটি ফল, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কোন লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হবেন?
নিজের রিলস দেখার অভ্যাস নিয়ে একটু খেয়াল করুন। যদি নিয়মিত এমনটা হয়—
- সময়ের হিসাব না রেখেই দীর্ঘ সময় রিলস দেখছেন
- রিলস দেখতে গিয়ে পড়াশোনা বা কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে
- ঘুমানোর সময় পেরিয়ে গেলেও ফোন ছাড়তে পারছেন না
- মন খারাপ হলেই প্রথমে রিলস খুলছেন
- রিলস না দেখলে অস্থির বা বিরক্ত লাগছে
- পরিবার, বন্ধু কিংবা বাস্তব জীবনের নানা কাজের চেয়ে ফোনেই বেশি সময় কাটছে
- অনেক রিলস দেখার পরও মনে হচ্ছে আরও দেখতে হবে